করোনাভাইরাসের সাইটোকাইন ঝড় এবং তার পরিণতি

আমাদের নতুন সময় : 20/05/2020

ডা. আরমান রহমান ও যায়নুদ্দিন সানী : আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেমের কাজ হলো আমাদেরকে বিভিন্ন জীবাণু যেমন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ইত্যাদির হাত থেকে রক্ষা করা। এই যুদ্ধ প্রতিনিয়ত চলছে, আমরা টের পাই না। কারণ এই যুদ্ধে সাধারণত জয়ী হয় আমাদের ইমিউন সিস্টেম। কিন্তু ইমিউন সিস্টেম যদি এই যুদ্ধে হেরে যায়, তাহলেই আমরা সেই জীবাণুবাহী রোগে আক্রান্ত হই এবং টের পাই।
ব্যাপারটা একটু খুলে বলি। আমাদের এই ডিফেন্স সিস্টেম বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ইমিউন সিস্টেম নানা ধরনের সেল দিয়ে তার ডিফেন্স কার্যক্রম চালায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সেল হচ্ছে টি সেল, বি সেল, ম্যাক্রোফেইজ ইত্যাদি। এইসব সেল একধরনের ছোট ছোট প্রোটিন নিঃসরণ করে, যার কাজ হচ্ছে এক কোষ থেকে আরেক কোষে সংবাদ আদান-প্রদান করা। শুধু তাই না, কোন জীবাণুর বিরুদ্ধে আমাদের শরীরের ইম্যুন রিয়াক্সন কেমন হবে তা নির্ধারণ করে এই ছোট ছোট প্রোটিনগুলিই। এদেরকে বলা হয় সাইটোকাইন।
এই সাইটোকাইন সিস্টেম দারুণ সুনিয়ন্ত্রিত একটি সিস্টেম। এদেরকে যদি সৈনিকের সাথে তুলনা করা হয়, তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, তারা একটি অত্যন্ত সুগঠিত সাঁজোয়া বাহিনী। শুধু তাই না, তাদের প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে এবং সাধারণ অবস্থায় এই দায়িত্বের বাইরে তারা যেতে পারে না। এর একদল থাকে ইনফ্লামেশন (প্রদাহ ) বাড়িয়ে ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার হাত থেকে আমাদের রক্ষা করা (প্রো-ইনফ্লামেটরি সাইটোকাইন, যেমন ইন্টারফেরন গামা, টি এন এফ আল্ফা, আই এল-৬ ইত্যাদি), আরেক দল আছে তারা এই প্রথম দলকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখে যেন তারা বাড়াবাড়ি না করে অর্থাৎ প্রদাহ সৃষ্টিকারী সাইটোকাইন যেন ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া মারতে গিয়ে আমাদের শরীরের অতিরিক্ত ক্ষতি করে না ফেলে। (এন্টি-ইফ্ল্যামেটরি সাইটোকাইন, যেমন ইন্টারলিউকিন-৪, ইন্টারলিউকিন-১০ ইত্যাদি)।
যদি কখনো এই সাম্য অবস্থার ব্যতিক্রম হয়, তাহলে প্রথম দলের সাইটোকাইনগুলো অনিয়ন্ত্রিত উশৃঙ্খল আচরণ করতে থাকে এবং তাদের বাধা দেয়ার জন্য উপস্থিত দ্বিতীয় দলের সাইটোকাইনগুলো তখন প্রথম দলের এই বেয়াড়া আচরণ সহনীয় সীমার ভেতরে বেঁধে রাখতে পেরে উঠে না। যার পরিণাম আমাদের শরীরের জন্যে হয় ভয়াবহ।
এবার বলি, এতোসব গল্প কেন বললাম। হ্যাঁ, এর কারণ নতুন আসা ভাইরাস করোনা। করোনা ফ্যামিলির এই নতুন ভাইরাস যখন ফুসফুসে পৌঁছে, তখন যথারীতি একে নির্মূলের জন্যে আমাদের ইমিউন কোষগুলো কাজে নেমে পড়ে। আক্রান্ত স্থানে ছুটে যায়। ভাইরাসকে গিলে ফেলে। এরপরে প্রশিক্ষিত সৈনিকের মতো সেখানে ইনফ্লামেশন তৈরি করে। উদ্দেশ্য একটাই, ভাইরাস নির্মূল করা।
এরপরের কাজ, অর্থাৎ তথ্য আদান প্রদানের মাধ্যমে এই ইমুন রিয়্যাকশন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পড়ে এই সাইটোকাইনগুলোর উপর। এরা অর্কেস্ট্রার মতো করে, কোন কোন কোষকে সেখানে ডেকে নিয়ে আসবে, কোন কোষ কি সাইটোকাইন তৈরি করবে এর প্রত্যেকটা কাজ হতে থাকে সুনিয়ন্ত্রিত নিয়মে। এর ফলে বেশিরভাগ মানুষ কিছুদিন জ্বর এবং কাশি নিয়ে ভুগলেও দুই সপ্তাহের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেন। কিন্তু কিছু করোনা আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হয়। তাদের বেলায় এই ইমিউন কোষগুলো উন্মাদের মতো সাইটোকাইন তৈরি করতে থাকে, এই সাইটোকাইন আরো বিভিন্ন ধরনের ইমিউন কোষকে ফুসফুসে ডেকে নিয়ে আসে, তারাও পাগলের মতো সাইটোকাইন নিঃসরণ করতে থাকে। এদের মধ্যে অন্যতম সাইটোকাইন হচ্ছে আই এল-৬ নামের একটি সাইটোকাইন। আর এই পাগলাটে প্রতিক্রিয়ার নাম হচ্ছে সাইটোকাইন ঝড়।
করোনা আক্রান্ত রোগীর শরীরে যদি আই এল-৬ নামক সাইটোকাইনের পরিমাণ বেশি দেখা যায়, তাহলে বুঝে নিতে হবে তার সাইটোকাইন ঝড় শুরু হয়ে গেছে। হিতে-বিপরীত হয়ে যাওয়া এই প্রতিক্রিয়ায় ফুসফুসের অবস্থা তখন ত্রাহি ত্রাহি। এই নানান ধরনের কোষ এবং সাইটোকাইন তখন ফুসফুসের মেমব্রেনকে নষ্ট করে ফেলে, সেখানে এমন ইনফ্লামেশন তৈরি হয় যার ফলে ফুসফুসে ‘প্রদাহজনিত তরল/ইনফ্লামেশনজনিত পানি’ তৈরি হয়। তখন ফুসফুস আর কাজ করতে পারে না। অক্সিজেনের আদান প্রদানের কাজাটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এই ইনফ্লামেশনজনিত পানিই চিকিৎসকরা এক্সরের মাধ্যমে দেখতে পান। দুটো ফুসফুসই এই ইনফ্লামেশনজনিত পানির কারণে অকেজো হয়ে যেতে থাকে। তারা চরম শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, বাতাস থেকে অক্সিজেন টেনে নেয়ার ফুসফুসের ক্ষমতা দ্রুত কমে যেতে থাকে তাদের। এই অবস্থাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলে ‘একিউট রেসপিরেটরি ডিস্ট্রেস সিনড্রোম’। একবার এই অবস্থা তৈরী হলে ৪০ শতাংশ রোগীকে আর ফেরানো সম্ভব হয় না।
এই সাইটোকাইন ঝড় শুধু করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেই নয়, এরকম আরো দেখা গিয়েছিলো সার্স কোভ, মার্স কোভ এবং এভিয়ান এইচ ৫ এন-১ ভাইরাসজনিত অসুখের ক্ষেত্রেও। কিন্তু এইসব ভাইরাসের জন্যে আমাদের ইমিউন সিস্টেম কেন এই রকম উন্মাদনা দেখাচ্ছে তার কোনো সুরাহা বিজ্ঞানীরা এখনো করতে পারেননি। সারা বিশ্বে এই নিয়ে জোর গবেষণা চলছে। উন্নত বিশ্বে এই সাইটোকাইন আই এল-৬ এর কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়ার একটি এন্টিবডি চিকিৎসা তারা ব্যবহার করছে (টসিলিজুমাব) যেটা আগে রিউমেটয়েড আর্থাইটিস চিকিৎসায় ব্যবহৃত হত। করোনাভাইরাসের মোকাবেলায়, ভ্যাক্সিন তৈরির প্রচেষ্টার সাথে সাথে, কীভাবে এই সাইটোকাইন ঝড়ের মোকাবেলা করা হবে, তা নিয়েও চলছে গবেষণা।
লেখক : ডা. আরমান রহমান, এমবিবিএস, এমপিএইচ, পিএইচডি এবং যায়নুদ্দিন সানী, চিকিৎসক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]