শুভ্রতায় আবৃত কামাল লোহানী

আমাদের নতুন সময় : 21/06/2020

হারুন হাবীব

উনিশ’ আশি সালের কথা । জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হয়ে প্রবল প্রতাবে দেশ শাসন করছেন। স্বাধীনতা বিরোধীরা রাতারাতি পুনর্বাসিত হতে শুরু করেছে তার নতুন রাজনীতির কল্যাণে। সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশের সবকিছু পাল্টে যেতে শুরু করেছে। রাজাকাররা প্রবল প্রতাবে গর্ত থেকে বেরিয়ে আসছে। রাজনীতিতে কেনাবেঁচা শুরু হয়েছে। একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের পরাজিতেরা ছাড়া সে পাল্টে যাওয়া কেউই আশা করে নি। কিন্তু এরপরও জীবন থেমে থাকেনি। অফিস-আদালত চলেছে। যানবাহন চলছে। সরকারি আদেশ-নির্দেশের বাইরে কিছু লিখতে না পারলেও পত্রপত্রিকা প্রকাশ পাচ্ছে। আমরা সেদিনের নবীন সাংবাদিকরাও কাজ করছি। প্রতিরাতে কারফিউর মধ্যে রিকসায় বাড়ি ফেরার সময় রাইফেল উঁচিয়ে পুলিশ-মিলিটারি থামিয়ে দিচ্ছে, পরিচয় জানাতে হচ্ছে। আমরা না হয় উৎড়ে গেছি ‘কারফিউ পাস’ আছে বলে, বিপন্ন হয়েছেন সাধারণ মানুষ। বলাই বাহুল্য, জেনারেল জিয়ার আমলের ‘নৈশ কারফিউ’ যেন শেষ হবার ছিলো না ! বছরের পর বছর চলেছে !
আমি তখন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রায়-নবীন রিপোর্টার। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে ফিরে যোগ দিয়েছিলাম ‘বিপিআই’ বা বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনাল নামের ছোট্ট একটি বার্তা সংস্থায়। ১৯৭৫ সালে যোগ দিয়েছি বাসস-এ। প্রথাগত ভাবেই বাসস থেকে দুজন রিপোর্টারকে প্রেসিডেন্ট ভবনের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। একজন আমার বয়োজেষ্ঠ সৈয়দ মোজাম্মেল হক, অন্যজন আমি। সামরিক শাসক- তথা প্রেসিডেন্ট জিয়া মাঝে মধ্যেই বিদেশ সফর করেন। বেশির ভাগ সময়েই মোজাম্মেল ভাই বা আমার অন্য সব জেষ্ঠরা, হয়তো যোগ্যতার কারণেই, রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গি হন। বিদেশ যেতে আমার যে লোভ হয় না তা নয়, কিন্তু পেরে উঠিনা। সেবার ভাগ্যে ছিকে ছিড়বে বলে মনে হল। প্রেসিডেন্ট হাউস সফরসঙ্গিদের তালিকা তৈরি করেছে। শুনলাম, জেষ্ঠ সাংবাদিকের এবারকার তালিকায় আছেন শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানী, ফজলে রশিদ এবং কনিষ্ঠদের মধ্যে আমিসহ বিভিন্ন পত্রিকার কয়েকজন। কিন্তু আমার বেলায় ভালোকিছু সহজে হয় না, হলোও না। শুনলাম, ‘ড্রেস রিহারসেল’ দিতে হবে, এবং পরীক্ষা নেবেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট। প্রেস সেক্রেটারি কাফি খান ফোনে জানালেন, মনে রেখ, যেনতেন পোশাক পরে রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গি হওয়া যায়না। সুট-টাই চাই। ভাবলাম হয়তো তাই । কিন্তু মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরার জোগাড়। গরমকালে আমি হাফ শার্ট ও সেন্ডেল পরি। কনকনে শীতের সময়, খুব বিপদে পড়লে, সুয়েটার-জুতা পরি । কিন্তু এখন শুনছি, বিদেশ যেতে হলে স্যুট-টাই লাগবেই। ওটা ছাড়া নাকি চলবে না।
স্যুট-টাই যে একেবারে ছিলোনা – তা নয়। কয়েক বছর আগেই বিয়ে করেছি, কাজেই আছে একটা বাক্সবন্দি হয়ে। মাস কয়েক আগে দৈনিক সংবাদের উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি মোনাজাতউদ্দিন গভীর রাতে হন্তদন্ত হয়ে আমার সেন্ট্রাল রোডের বাড়িতে এসে হাজির হল। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সাথে তারও থাইল্যান্ডে যাবার ডাক এসেছে । সে খুব খুসি। খবর পেয়েই রংপুর থেকে ঢাকায় এসেছে । কিন্তু দুদিনের মধ্যে স্যুট-টাই বানাবে কিভাবে? টাকাই বা কোথায়? লম্বায় আমরা প্রায় সমান বলে আমার দ্বারস্থ হয়েছে বিপন্ন বন্ধুবর ! বাক্সপেটারায় বেশ খোঁজাখুজির পর দুমরানো-মোচরানো স্যুট-টাই পাওয়া গেল। বন্ধুবর ভাবলো, বাঁচা গেল। অতি-যতনে সেই স্যুট-টাই সে গায়ে চাপালো এবং আয়নার সামনে দাঁড়ালো। বলা বাহুল্য, পোশাকটা যে না পরলেই ভাল হতো, মোনাজাতের দিকে তাকালেই তা বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু মোনাজাত সেই স্যুট-টাই নিয়ে সানন্দে বেরিয়ে গেল। যাই হোক, যথা সময়ে বঙ্গভবনে সফরসঙ্গিদের ‘ড্রেস রিহারসেল’ শুরু হল। আমি ছিলাম ১১ নম্বর সেক্টর-এর একজন গেরিলা যোদ্ধা, বাড়তি দায়িত্ব ‘জয়বাংলা’ পত্রিকা ও ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ এর রণাঙ্গন সংবাদদাতার। সেই সুবাদেই নিজ অঞ্চল ছেড়ে অনেক জায়গায় যাবার সুযোগ হয় মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে। আসামের মানকারচরের কাছে তেলঢালার পাহাড়েও গিয়েছি বার কয়েক, সেখানে ছিল মেজর জিয়ার ‘জেড ফোর্স’ । এরপর, সম্ভবত সেপ্টেম্বর কি অক্টোবরের দিকে, নানা সন্দেহজনক কাজকর্মের অভিযোগ এবং যুদ্ধের বিশেষ কৌশলগত প্রয়োজনে ‘জেড ফোর্স’কে সিলেটের দিকে পাঠিয়ে দিল মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী মুজিবনগর সরকার। অনুমান করি, হয়তো সেদিনকার মুখ চেনার সুবাদেই তেমন কিছু প্রশ্ন না করলেন না ক্ষমতাশীন জেনারেল। বললেন, স্যুট-টাই পরতে হবে, ওসব ছাড়া চলবে না, যলদি বানিয়ে ফেলুন, যান। কিন্তু আমি উৎড়ে গেলেও বড় সংকট বাধলো কামাল লোহানীকে নিয়ে। তিনি কিছুতেই তাঁর চিরায়ত সাদা পাজামাপাঞ্জাবি ছাড়বেন না, স্যুট টাই পরবেন না। যেতে হলে ওভাবেই যাবেন। বলতে গেলে খানিকটা তর্কই হল জেনারেল জিয়ার সাথে লোহানী ভাইয়ের । কিন্তু তাঁর এক কথা, পাজামাপাঞ্জাবি ছাড়বেন না, সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে। অন্যদিকে মিলিটারি প্রেসিডেন্টও জানিয়ে দিলেন তার সফরসঙ্গি হতে হলে পাজামাপাঞ্জাবি পরা চলবেনা, স্যুট-টাই পরতে হবে। কিন্তু যে কামাল লোহানী নিজের পোশাক ও জীবনধর্ম নিজেই নির্বাচন করেন, তিনি একজন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাধরের কথায় মত বদলাবেন কোন্ দু:খে ? শেষ পর্যন্ত লোহানী ভাই জেনারেল জিয়ার সফরসঙ্গি হন নি, তাঁকে নেয়া যায়নি।
কারও রাজনৈতিক বিশ্বাস ও জীবনচর্চা সবাই সমান ভাবে সম সময় মেনে নিতে পারে বা মানবে – এমনটা নয়। গণতান্ত্রিক জীবনধারায় এই বৈপরিত্ব থাকবেই। কিন্তু একজন মানুষ তার নিজের বিশ্বাস ও পছন্দ-অপছন্দের সাথে কতটা সৎ থাকতে পারেন,কতটা দৃঢ থাকতে পারেন, কীর্তিমান সাংবাদিক ও বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী তার বড় প্রমান। লোহানী ভাইয়ের সাথে আমার বয়সের ফারাক অনেক। মনে পড়ে, ২০০১ সালে লোহানী ভাই, আমি এবং আরও কিছু বন্ধুর সাথে মিলে মুক্তিযুদ্ধের পর আগরতলায় প্রথমবারের মতো আয়োজন করেছিলাম ‘মুক্তিযুদ্ধ উৎসব’, যেখানে এক ঐতিহাসিক মিলনমেলা ঘটেছিল দুই ভূখন্ডের মানুষদের। ত্রিপুরার সরকার এবং গণমানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিল বাংলাদেশের মানুষ, আবারও নতুন করে ১৯৭১ সালের পর। আমি জানি, লোহানী ভাইয়ের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ থাক না থাক মনের দেখাসাক্ষাৎ আছে। এই মানুষটির প্রতি আমার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা । দৃঢ়তা সমৃদ্ধ মানুষ তিনি, আদর্শের গৌরবে আজও, এই বয়সেও, দৃঢ়পায়ে দাঁিড়য়ে থাকেন।
মুক্তিযুদ্ধের সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদান রাখেন লোহানী ভাই। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও ঐতিহাসিক ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার বার্তা সম্পাদক তিনি। শ্রদ্ধেয় আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, এম আর আখতার মুকুল, সন্তোস গুপ্ত, সিকান্দার আবু জাফর, কামাল লোহানী, ফয়েজ আহমদ, আমিনুল হক বাদশা, সলিমুল্লাহ সহ আরও কিছু নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিকে আমি দেখেছি কলকাতার বালুহক্কাক লেনের অফিসে দিনরাত কাজ করতে। মুক্তিযুদ্ধের সাংবাদিকতায় এঁদের কারও অবদান খাটো করে দেখবার সুযোগ নেই। মুক্তিযুদ্ধের এই দুই গণমাধ্যমের সঙ্গে রণাঙ্গন থেকে যুক্ত থাকার সুবাদে এঁদের সকলকে বেশি করে জানার সুযোগ ঘটেছিল আমার। স্বাধীনতা-উত্তর কালের সাংবাদিকতারও একনিষ্ঠ মানুষ লোহানী ভাই। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তিকালের সামরিক শাসন কিংবা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি সামাজিক,রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহন ছিল অবধারিত। কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আজও,এই পঁচাশি বছরেও নিজের চিন্তা ও চেতনাকে প্রকাশ করেন তাঁর খুরধার কলমে। সংক্ষিপ্ত। দ্রষ্টব্য: লেখাটি শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানীর ৮৫তম জন্মবার্ষিকীতে আয়োজিত সম্মিলন উৎসব স্মরণীকায় প্রকাশিত। দুই বছর পর, আজকের এই বেদনাবিধুর দিনে, লেখাটি আবারও তাঁকে সমর্পণ করছি।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]