মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী এবং তাদের সন্তানদের নিয়ে ভাবনা

আমাদের নতুন সময় : 26/06/2020

নাঈমুল ইসলাম খান: [১] বাংলাদেশের জন্ম কারও দান নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আলাপ-আলোচনা আর গোলটেবিল বৈঠক করেও আসেনি। ২৩ বছরের আন্দোলন সংগ্রামের পর রক্তক্ষয়ী ও নির্মম যুদ্ধে, এক নদী রক্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ উপহার দিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ।

[২] বিশ্বের ইতিহাসে এত মূল্য, এত বলিদানের মধ্য দিয়ে খুব বেশী দেশকে স্বাধীনতা পেতে হয়নি।

[৩] এমনই যুদ্ধে যারা বিরোধী পক্ষে ছিল, হানাদার বাহিনীর পক্ষে ছিল, তেমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তাদের ভূমিকাকে কেবল ‘সাধারণ স্বাধীনতা বিরোধী’ বা মুক্তিযুদ্ধের ‘রাজনৈতিক বিরোধিতা’ ব্যাখ্যা দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওই বিরোধিতাকারীদের ভূমিকা হালকা করে বিবেচনা করার সুযোগ কোনোভাবেই নেই ।

 

[৪] মুক্তিযুদ্ধের সময়ে, একদিকে ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ হয়ে যাওয়া এবং অন্যদিকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ আর মুক্তিযোদ্ধার মরণপন লড়াই, প্রতিরোধ যুদ্ধের ৯ মাসে যারা দখলদার বাহিনীর পক্ষাবলম্বন করেছেন তাদের প্রত্যেকেরই বাংলাদেশে বিচার হতে হবে।

[৫] মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের জন্য, তাদের ভূমিকার gravity ও impact এর পার্থক্য বিবেচনা করে বিচার ও শাস্তির রকমফের হতে পারে। কিন্তু কৃতকর্মের দায় সবাইকে নিতে হবে। বিচার প্রক্রিয়ায় অনেকেই হয়তো নির্দোষ প্রমানিত হয়ে মুক্তি পাবেন।

[৬] স্বাধীনতা বিরোধীদের মধ্যে যারা মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছেন তাদের কেমন বিচার ও সাজা হবে সেটা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে সুতরাং আমরা অনেকখানি বুঝতে পারি।

[৬.১] এই ক্যাটাগরীর মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের সন্তানরা নিজের পিতার বিচার প্রক্রিয়ায় পিতার পক্ষে আইনি লড়াই চালাবেন এবং সন্তান হিসেবে অন্য সকল পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব অবশ্যই পালন করতে পারবেন।

[৬.২] তবে সন্তান হিসেবে তিনি বাবার ৭১ এর ভূমিকা ‘সমর্থন করেন না, সঠিক মনে করেন না এবং তার ভূমিকার জন্য লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী’ মর্মে অবশ্যই ঘোষণা দিতে হবে, যদি তিনি নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে প্রভাব রাখে এমন যে কোনো ভূমিকা রাখতে চান।

[৬.৩] যদি সন্তান সাধারণ চাকুরে হন, ছোট ব্যবসায়ী হন, গ্রামের কৃষক হন, রাজনৈতিক ভূমিকা না নেন তাহলে হয়তো এমন ঘোষণা দেওয়া অত জরুরী না।

[৭] যারা মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেননি, স্বাধীনতাবিরোধী সাংগঠনিক ভূমিকা রেখেছেন, তাদেরও বিচার হতে হবে। সেই বিচারে সাজা অন্য কিছুর সঙ্গে হতে পারে কিছু নাগরিক অধিকার সীমিত করা। যেমন নির্বাচন করা, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, মিডিয়া প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি ধরনের সমাজ জীবনে প্রভাব সৃষ্টি করার মতো যে কোনো কাজে তার অধিকার রহিত করা হবে নূন্যতম সাজা।

[৭.১] এই ক্যাটাগরীর মুক্তিযুদ্ধবিরোধীর সন্তানরা বাবার ভূমিকা ‘সমর্থন করেন না, সঠিক মনে করেন না’ এতটুকু ঘোষণা দিতেই হবে। তার নিজের ক্ষমা চাইতে হয়তো হবে না । এটুকু ঘোষণা লাগবে যদি সন্তান জাতীয় জীবনে পূর্বোল্লিখিত (দ্রষ্টব্য এই লেখার ৬.২,৬.৩,৭,৮,১০ এবং ১১ ) প্রভাব বিস্তারী কোনো ভূমিকা রাখতে চান।

[৮] উপরোক্ত প্রস্তাবনায় পিতার অপরাধের দায় সন্তানকে নিতে হচ্ছে না, তাকে একটি ঘোষণা দিয়ে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তার বিশ্বাস স্বচ্ছ ও স্পষ্টই করতে হচ্ছে শুধু। সেটাও যদি সন্তান জাতীয় জীবনে শীর্ষস্থানীয় কোনো ভূমিকা রাখতে চান।

[৯] মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষের অবসানে এটা হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া।

[১০] মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস এবং স্বাধীনতাকে সম্মান না দেখালে সন্দেহ থাকবেই যে সন্তানরা পিতার ৭১ এর ভূমিকা সমর্থক। আর তার হাতে দেশের কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হবে বিপজ্জনক।

[১১] অনেকে Reconciliation এর কথা বলে থাকেন। সেই Reconciliation এর জন্যেও বিচারিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন হয়। বিচারহীনতা বিভক্ত জাতিকে এক করতে পারবে না।

[১২] এই প্রস্তাবনায় আমি বিজ্ঞজনের মতামত চাই যাতে প্রস্তাবগুচ্ছ আরও শক্তিশালী করতে পারি। অনুলেখক : ফাহমিদা তিশা




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]