• প্রচ্ছদ » » ঈদের দিন বাসায় কেউ এলে, তাদের সালাম করতে ডাকতেন বাবা


ঈদের দিন বাসায় কেউ এলে, তাদের সালাম করতে ডাকতেন বাবা

আমাদের নতুন সময় : 29/07/2020

ড. এম এ হাসান

আমার বাবা ছিলেন, পাকিস্তান আমলের শীর্ষতম ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষক। ১৯৫০-৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা মেডিকেলের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। তখন আমরা পুরনো ঢাকার দক্ষিণ মুসুন্দিতে থাকতাম। আমার বয়স তখন আড়াই বছর। আমি দেখতাম, ঈদের আগে মানুষ প্রচুর দোয়া-দুরুদ পাঠ করতো। মিছিল বের হতো। অর্থাৎ আগে থেকেই সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হতো যে, ঈদ আসছে। যখন আমি বুঝতে শিখলাম, তখন ঈদের আগে দর্জি বাড়িতে এসে জামার মাপ নিয়ে যেতো। কেমন জামা লাগবে, কী কাপড় হবে, কী কালার হবে, ফলে ভাইবোনদের মধ্যে ঈদের উৎসব উত্তেজনা লেগে থাকতো। ঈদের দিন জামাটা না পরা পর্যন্ত সেই আমেজ বহাল থাকতো। ঈদের নতুন কাপড় পরে। সবাইকে সালাম করে, সালামি গ্রহণ করতাম। দাদা-দাদি, নানা-নানি, বাবা-মা, চাচারা ঈদের সালামি দিতেন। ফলে ঈদের আনন্দটা উৎসবমুখর ওয়ে উঠতো।
ঈদের দিন বিকালে বন্ধুবান্ধব আসতো। কেউ আবার ঈদের পরের দিনও আসতো। বাবা আমাকে বারবার ডাকতেন, সাবাইকে সালাম করতে বলতেন। কিন্তু এটা আমার কাছে অনেক বিরক্ত লাগতো। সব সময় ভয়ে থাকতাম, এই বুঝি কেউ আসছেন। বাবা সালাম করতে ডাক দেবেন। ফলে কাচুমাচু হয়ে বসে থাকতাম। তারপরেও বাবাকে অনেক শ্রদ্ধা করতাম, ভালোবাসতাম। তার আদেশ কখনো অমান্য করিনি। তখন রেডিও, টেলিভিশন ছিলো না। বাসায় মার্সি রেডিও ছিলো, মাঝে মাঝে শুনতাম। তবে তাতে খুব একটা আগ্রহ ছিলো না। বাবার চাকরির সুবাদে বিভিন্ন জায়গা ঘুরেছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ’র বাড়ির পাশেই আমাদের বাসা ছিলো। জেলখানার পাশে বড় একটা পুকুর ছিলো। প্রচুর ঘাস ছিলো, আমরা সেখানে ফড়িং এবং পাখি শিকার করতাম। ঈদের দিন ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠতাম। গোসল সেরে, নতুন জামা পরে, বাবার হাত ধরে নামাজে যেতাম। নামাজ শেষে সকলের সঙ্গে কোলাকুলি করে, আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে দেখা শেষ করে, বাড়িতে এসে মিষ্টি মুখ করতাম। শুধু খাওয়া দাওয়া আর ঘোরাঘুরির মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখিনি। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক, নৈকট্য সবকিছুর মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রেখে, ঈদের আনন্দটাকে উপভোগ করেছি। মানুষের বাসায় যাওয়া বেশি পছন্দ করতাম না। একাকী থাকতে বেশি পছন্দ করতাম। সময়টাকে নষ্ট না করে কাজে লাগাতাম। এখন মানুষের মধ্যে কাপড়ের চাহিদা বেড়েছে। যা আমাদের মধ্যে ছিলো না। বাবা বড় চাকরিজীবী হওয়া সত্তে¡ও একটা কাপড় কিনতে হিমশিম খেতেন। ২-৩ বছর পর এক জোড়া জুতা কিনতাম। আর এখন মানুষ ১০ সেট কাপড়ই কেনেন। নটিবয় সু নামে তখন ৯ টাকা দিয়ে একজোড়া জুতা কিনেছিলাম। জেন্টেলমেন্ট সু ছিল ১০ টাকা। ওই জুতাটা পেয়ে বিছানার মধ্যে রেখে, মুছা এবং পালিশ করার মধ্যে একটা আনন্দ ছিলো। এখন মানুষ ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করে। এটা আমাদের মধ্যে ছিল না। পরিবারের অন্যরাও পছন্দ করতেন না। এখনো করি না। পাকিস্তান আমলে বাবা ৩৫০ টাকা বেতন পেতেন। তা দিয়েই সংসার চালাতেন। সবার মধ্যে সংযম এবং বিনয়ীভাব ছিলো, যা এখন মানুষের মধ্যে সেগুলোর কিছুই নেই। এখন যুগটা হয়ে গেছে, লুট করো, ভোগ করো, দেখাওয়ের প্রবণতা। আমরা সে সময় অল্পতেই তুষ্ট থাকতাম। মানুষ তাদের ‘কমিউনিটি’ নিয়ে বড় একটা গরু কোরবানি দিতো, যা ছিলো দেখার মতো। বাবারা গরু কিনে দিতেন, অনেকে মিলে সব কিছু করতেন। পরিচিতি : মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিনহাজুল আবেদীন।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : info@amadernotunshomoy.com