• প্রচ্ছদ » » মস্তিষ্কে করোনাভাইরাস : কোভিডের আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক


মস্তিষ্কে করোনাভাইরাস : কোভিডের আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক

আমাদের নতুন সময় : 29/07/2020

ডা. খোন্দকার মেহেদী আকরাম

টিস্যু ট্রপিজমের কারণে করোনাভাইরাস শুধু আমাদের শ^াসনালী এবং ফুসফুসকেই আক্রমণ করে না বরং এই ভাইরাসটি শরীরের আরও কিছু অঙ্গ এবং টিস্যুকে সংক্রমণ করে। মূলত শরীরের যেসব কোষে এসিই-২ রিসিপ্টর রয়েছে সেসব কোষ এবং কলাকেই এই ভাইরাসটি সংক্রমণ করতে পারে। আর এ কারণেই ফুসফুস ছাড়াও এই ভাইরাসটির সংক্রমণ দেখা যায়, রক্তনালীর এন্ডোথেলিয়াম, অন্ত্রের এপিথেলিয়াম এবং কিডনিতে। ভাইরাস সংক্রমণের স্থান ভেদে কোভিড রোগের উপসর্গেও তাই বেশ কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। করোনা ভাইরাসটি যেহেতু প্রধানত আক্রমণ করে ফুসফুসকে, তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই রোগটি শুরু হয় কাশি, গলাবেথা, জ্বর এবং শ্বাসকষ্ট দিয়ে। আবার ভাইরাসটি যখন আমাদের নাকের মিউকাস মেমব্রেনকে সংক্রমণ করে তখন রোগীদের ঘ্রাণশক্তি লোপ পায়। অন্ত্রের কোষকে সংক্রমণ করলে শুরু হয় অন্ত্রের গোলযোগ এবং ডায়রিয়া। কোভিড রোগীরা মাথা ব্যাথা, বিভ্রান্তি, ভ্রম বা প্রলাপের মতো মানসিক উপসর্গ প্রদর্শনের মাধ্যমেও রোগ প্রকাশ করতে পারে। আর এ থেকেই চিকিৎকগণ ধারনা করেন যে করোনা ভাইরাসটি হয়তো ব্রেইনের স্নায়ু কোষকেও সংক্রমণ করে।স¤প্রতি একদল ব্রিটিশ বিজ্ঞানী একটা গবেষণা চালান লন্ডনের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৪৩ জন কোভিড রোগীর উপর। রোগীদের ক্লিনিক্যাল ডাটা এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে তারা দেখতে পান যে এদের ভেতরে ১০ জনের এনসেফালোপ্যাথি হয়েছিলো এবং তারা ছিল অনেকটা বিকারগ্রস্ত। তবে তাদের ব্রেইনের এমআরআই এবং স্নায়ু রসের (ঈঝঋ) এর পরীক্ষায় কোনো প্রকার অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি। বাকিদের ভেতর ১২ জনের হয়েছিলো মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস এবং এনসেফালোমায়েলাইটিস (অউঊগ)। এদের ভেতরে ৫ জনের ব্রেইনে রক্তক্ষরণ এবং একজনের নেক্রোসিস পাওয়া যায়। এছাড়াও ৮ জনের মস্তিষ্কে রক্তনালিকা বøক হয়ে স্ট্রোক হয় এবং ৭ জনের হয় গুলেইন-বেরী সিনড্রোম- এটা একধরনের প্যারালাইসিস রোগ। এগুলো ছাড়াও রোগীরা বিভিন্ন ধরনের আরও কিছু স্নায়োবিক উপসর্গ প্রদর্শন করে। তবে কোভিডে আক্রান্ত রোগীদের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এবং রক্তনালিকার অস্বাভাবিকতাই ছিলো উল্লেখযোগ্য। আশ্চর্য্যজনক ব্যাপার হল, মস্তিষ্কের সমস্যা কোভিড রোগের তিব্রতার সাথে সম্পর্কিত ছিলো না। অর্থাৎ অনেক মাইল্ড কোভিড রোগীও মস্তিষ্কের উপসর্গ প্রদর্শন করেছে। করোনাভাইরাস মস্তিষ্কে সরাসরি কতোটুকু সংক্রমণ করে তা দেখতে হলে দরকার মস্তিষ্কের ব্যবচ্ছেদ। আর এ কাজটিই করেন ইতালির বিজ্ঞানীরা কোভিড রোগে মারা যাওয়া ১৮ জন মানুষের ব্রেইনে অটোপ্সির মাধ্যমে। রোগীদের সবাই সিভিয়ার কোভিডে ভুগে হাসপাতালে ভর্তির ২ থেকে ৯ দিনের মধ্যে মারা যান এবং তাদের ভেতরে কারও কারও নিউরোলজিক্যাল বা স্নায়ুতন্ত্রীয় উপসর্গও ছিলো। মৃত্যুর পরে রোগীদের ব্রেইন টিস্যু নিয়ে করোনাভাইরাস শনাক্তের জন্য আরটি-পিসিআর এবং ইমিউনোস্টেইনিং করা হয়। পিসিআর করে ১৮ জনের ভেতরে ৫ জনের ব্রেইন টিস্যুতে সামান্য পরিমাণ করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। তবে ইমিউনোস্টেইনিং করে কোনো রোগীর ব্রেইন টিস্যুতে কোনো প্রকার ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্নায়ু কোষে ভাইরাস ইনফেকশন হলে কোষ বা কলার যে পরিবর্তন হয়, সেই রকম পরিবর্তন কোনো রোগীর ব্রেইনেই পরিলক্ষিত হয়নি। তবে সব রোগীর ব্রেইন টিস্যুতেই মাইক্রোসকপিক ইস্কেমিয়া বা অক্সিজেনের ঘাটতি জনিত ইনজুরি দেখতে পাওয়া যায়।এসব থেকে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে উপনিত হন যে, করোনাভাইরাস মানুষের মস্তিষ্কে হয়তো সরাসরি সংক্রমণ করে না। ব্রেইন কোষে যে সামান্য পরিমাণ ভাইরাসের আলামত পাওয়া যায় তা সম্ভত ব্রেইনের রক্ত নালীকার ভেতরে ছিলো। করোনাভাইরাস রক্তনালীর কোষকে সংক্রমণ করে।এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয় নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে। এ দুটো গবেষণা থেকে এটা পরিষ্কার যে করোনাভাইরাস মস্তিষ্কে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। অতএব কোভিড রোগীদের রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে নিউরোলোজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার রয়েছে। লেখক : এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি। সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : info@amadernotunshomoy.com