• প্রচ্ছদ » » ভিউ-কাটতির ‘লোভে’ গণমাধ্যমের নৈতিক স্খলন?


ভিউ-কাটতির ‘লোভে’ গণমাধ্যমের নৈতিক স্খলন?

আমাদের নতুন সময় : 17/09/2020

রাজু নুরুল : একটা টেলিভিশন চ্যানেলে সন্ধ্যার ( ২০ জুলাই) খবর দেখছিলাম। যথারীতি সেই খবরের শুরুতেই করোনা কেলেঙ্কারিতে জড়িত মোহাম্মদ সাহেদ প্রসঙ্গ! দ্বিতীয় খবর ‘ডা. সাবরিনা কারাগারে’, কিন্তু ডা. সাবরিনাকে কারাগারে পাঠানো বিষয়ক সংবাদে ভুড়িভুড়ি পুরনো ছবি (যেটাকে মিডিয়া ‘ফাইল ফটো’ বলে) দেখানোর কী কারণ সেটা বোধগম্য হলো না। সেসব ছবিতে ডা. সাবরিনা নানা ভঙিমায়, নানা ধরনের পোজ দিয়ে আছেন। বেছে বেছে তার খোলামেলা কিছু ছবি দিয়ে কোলাজ বানানো হয়েছে। সেই কোলাজ আবার একবার ডানদিক থেকে আরেকবার বাম দিক থেকে, উপর-নিচ করে দেখানো হচ্ছে। সংবাদভিত্তিক একটা মূল ধারার গণমাধ্যমের এরকম বিকৃত রুচি হয় কি করে?
সাহেদ বা সাবরিনা — কারো কুকর্ম কিন্তু আমাদের ৩৩/৩৪টা মিডিয়া খুঁজে বের করতে পারেনি। আমি টেলিভিশন মিডিয়ার কথা বলছি। এর সাথে যোগ করুন হাজার হাজার নাম জানা, না-জানা ওয়েব পোর্টাল ও পত্রিকা। সাধারণ মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে এদের খুঁজে বের করেছে পুলিশ ও র‌্যাব। তার মানে সাধারণ মানুষ এখনো মিডিয়ার চেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বেশি বিশ^াস করে। অথচ আগে তার উল্টোটা হতো। মিডিয়া মুখোশ উন্মোচন করতো, আর পুলিশ সেটা বাস্তবায়ন করতো।
এই পশ্চাদপসরণের পেছনে কারণও আছে। দুই/তিনটা মূল ধারা পত্রিকা ছাড়া আর কোনো গণমাধ্যমের ন্যূনতম স্বাধীনতা আছে বলে মনে হয় না। এই দুই তিনটা পত্রিকায় আমরা মাঝেমধ্যে খানিকটা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ঝলক দেখতে পাই। আর বাকিদের অধিকাংশই কারো না কারো ব্যবসায়ীক স্বার্থ নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেন। এটা যে কী হতাশার সেটা যেকোনো সচেতন মানুষ মাত্রই উপলব্ধি করতে পারার কথা। একটা দেশে গণমাধ্যম হলো সেই সমাজের আয়না, যার মাধ্যমে গোটা দেশটাকে আমরা দেখি। ভালো-মন্দ-সফলতা-ব্যর্থতা-প্রান্তিক মানুষের খবর গণমাধ্যম আমাদের ঘরের দুয়ারে এনে হাজির করে। কিন্তু সেই মিডিয়া যদি এমন আচরণ করে; সেটা নিতান্তই উদ্বেগের। কারও স্বার্থ নিশ্চিত করার জন্য যদি কিছু প্রতিষ্ঠিত হয়; সেটা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান-সংগঠন যাই হোকÑ তাদের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করা যায় না। একটা পত্রিকা তাদের মালিকের মৃত্যুতে প্রতিদিন অসংখ্য খবর প্রকাশ করলো। আরেকটা টেলিভিশন চ্যানেল তাদের মালিকের মৃত্যুতেও তাই করলো। সংবাদের প্রথম অর্ধেকজুড়ে সেই কুলখানির খবর। নামাজের জানাজা, অনলাইন দোয়া মাহফিলÑ এটাসেটা। এসবে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু একই সময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান সিরাজের মৃত্যু পেলো মাত্র কয়েক সেকেন্ড কাভারেজ। এক কলাম তিন ইঞ্চি। জাতি ভালো করে জানলোও না তারা এই করোনাকালীন তাদের এক সূর্য সন্তানকে হারালো।
দেশের একটা মূলধারার গণমাধ্যম যদি শুধু ভিওয়ারের লোভে পড়ে অপ্রাসঙ্গিক দৃশ্য দেখাতে থাকে, তাদের অনলাইন ভারসনে অশ্লীল আর ভুয়া সব খবর দিয়ে ভরে রাখে, ব্যক্তির অপরাধের প্রতিবেদন করতে গিয়ে যদি তার একান্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক মুহূর্তের ছবি, ভিডিও কথোপকথন প্রকাশ করে, এমন চটকদার শিরোনাম করে যার মূল উদ্দেশ্য হলো শুধুই ‘ক্লিক’, তাহলে সেখানে বস্তুনিষ্ঠতা আশা করা বোকামি। এই মহা সংকটে আমাদের মিডিয়া দারুণ ভ‚মিকা রাখতে পারতো। মানুষের যুদ্ধজয়ের গল্পের পাশাপাশি সমাজের নানা অসঙ্গতি, অসামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ, নীতিনির্ধারকদের নেওয়া ভুল নীতি বস্তুনিষ্ঠতার সাথে উপস্থাপন করতে পারতো, নীতিনির্ধারকদের উপর গণমাধ্যম ‘পজেটিভ’ প্রভাব খাটাতে পারতো। অথচ সেটা তারা কতোটুকু করলেন? করোনা পেরিয়ে যাবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে এসব প্রশ্ন ঠিক থেকে যাবে। এসব প্রশ্নের উত্তর না মেলাটা আমাদের আরও বেশি অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাবে। লেখক : উন্নয়নকর্মী




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]