জীবনানন্দের নারীরা

আমাদের নতুন সময় : 21/10/2020

ফরিদ কবির : জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বেশ কয়েকজন নারীর দেখা মেলে। নানান নামে তারা ছড়িয়ে আছেন জীবনানন্দের কবিতায়। তাদের কেউ সুরঞ্জনা, কেউ সরোজিনী, কেউ সুচেতনা, কেউ শ্যামলী, কেউ সুদর্শনা, কেউ সবিতা। কবিদের জীবনে কিছু না কিছু নারীর ভ‚মিকা থাকেই। আর কবিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন সব নারীদের প্রেমে পড়েন, জীবনে যাদেরকে অর্জন করা খুবই কঠিন। কবিদের এটাই স্বভাব, জীবনে যাদের পাওয়া কঠিন, তাদেরকেই পেতে চান তারা। ফলে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কবিদের কাছে সেসব নারী রয়ে যান অধরাই। আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষের জীবনেও তো দু-চারজন নারী আমার ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিয়েছেন, জীবনানন্দের ক্ষেত্রেই বা তা হবে না কেন? অনেকেই জানেন, জীবনানন্দ যার প্রেমে পড়েছিলেন, তিনি শোভনা দাশ, সম্পর্কে যিনি জীবনানন্দ ওরফে মিলুর কাজিন। শোভনাকে তিনি বেবি নামেই সম্বোধন করতেন। সম্ভবত ‘ঝরা পালক’-এর দ্বিতীয় সংস্করণ তিনি তাকেই উৎসর্গ করেছিলেন। প্রথম সংস্করণে সম্ভবত তিনি কিছুটা সাহস করে ইধনু-র ‘ণ’ লিখেই ক্ষান্ত দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় সংস্করণের উৎসর্গপত্রে কিছুটা আড়াল করতে লিখেছিলেন- কল্যানীয়াসু-! শোভনাকে নানা কারণেই অর্জন করা সম্ভব ছিলো না জীবনানন্দের পক্ষে। পরবর্তীকালে শোভনা দিল্লি চলে যান। শোভনাকে না পাওয়ার বেদনা, হতাশা, দীর্ঘশ্বাস সারাজীবনই যে তিনি বয়ে বেড়িয়েছেন তা বোঝা যায়, তার কবিতায় নানা নামের নারীর উপস্থিতিতে।
এমনকি, তিনি যে যথেষ্ট নির্জনতাপ্রিয় হয়ে উঠলেন, তার পেছনেও থাকতে পারে শোভনাকে না পাওয়ার কষ্ট ও বেদনাই। তা শোভনাই হোক, কিংবা সুরঞ্জনা, সরোজিনী বা শ্যামলী- শোভনারই নানা রূপ তাতে উদ্ভাসিত। সুদর্শনা, সবিতা, কিংবা সুচেতনাও অন্য কোনো নারী হয়তো নন। তারাও হয়তো শোভনারই প্রতিচ্ছবি। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, জীবনানন্দের প্রতিটি নারীই হাজির হয়েছেন ‘স’ বা ‘শ’ আদ্যাক্ষর নিয়ে। এতে আমার অন্তত মনে হয়, ভিন্ন ভিন্ন নামে তাদের ডাকা হলেও এইসব নারী আসলে একজনই- শোভনা। কেবল বনলতাই আলাদা। তিনি কিছুতেই শোভনা নন। তবে তিনি কে? আকবর আলি খান জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখা তার একটা গদ্যে বলতে চেয়েছেন, বনলতা একজন গণিকা, যিনি কবিকে কোনো একদিন ‘দু-দন্ড শান্তি দিয়েছিলেন’। তার এই পর্যবেক্ষণ জীবনানন্দপ্রেমীদের পছন্দ হওয়ার কথা না। যদিও তার এ পর্যবেক্ষণ বেশ কৌত‚হলোদ্দীপক। যাই হোক, এ প্রশ্ন শেষঅব্দি অমীমাংসিতই রয়ে যায়, তাহলে কে এই বনলতা সেন? জীবনানন্দ দাশকে যারা পাঠ করেছেন, তারা জানেন, তিনি কতোটা রুচি সম্পন্ন ও খুঁতখুঁতে ধরনের মানুষ ছিলেন।
বনলতা যদি গণিকা হয়ে থাকেন, তবে স্রেফ শারীরিক কারণে একবার তার কাছে গেলেও জীবনানন্দ দুবার কোনো গণিকার কাছে যাওয়ার মানুষ নন। ‘বনলতা সেন’ পড়লে এটুকু মনে হয় যে, কবির সঙ্গে অন্তত দুবার দেখা হয়েছে বনলতার। আমার নিজের অবশ্য ধারণা, বনলতা সেন আসলে কোনো রক্তমাংসের মানবীই নন। বনলতা সেন কবিরই বিপরীত সত্তা। হয়তো তারই প্রতিবিম্ব। কোনো এক লেখায় আমি লিখেছিলাম, কবিতা লিখি আসলে নিজের সঙ্গে কথা বলার জন্যই। নির্জনে নিজের মুখোমুখি হতে। কিংবা, নিজের বিপরীত সত্তার সঙ্গে নানা কিছু মিলিয়ে নিতে। আর, কে না জানেন, মানুষের প্রতিবিম্ব সব সময় মানুষের বিপরীত সত্তাই। সে কারণেই আয়নায় তাকে উল্টো দেখায়। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]