• প্রচ্ছদ » » রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়া ঠেকানোর চক্রান্ত করছে দাতাগোষ্ঠী


রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়া ঠেকানোর চক্রান্ত করছে দাতাগোষ্ঠী

আমাদের নতুন সময় : 21/10/2020

রাহমান নাসির উদ্দিন : বাংলাদেশ তো রোহিঙ্গা সমস্যার স্রষ্টা নয়, বরং সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। তাহলে কেন বাংলাদেশকে একা ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার ভার বহন করতে হবে? আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের দায়িত্ব কি কেবলই অর্থের সংস্থান করা? সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী আশ্রয়কে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করা? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে যেমন জাতি গঠনের তোড়জোড় শুরু হয়, তেমনি ডি-কলোনাইজেশনের হাত ধরে বাড়ে শরণার্থীর সংখ্যা। শরণার্থী ব্যবস্থাপনা, শরণার্থীর অধিকার-মানবাধিকার, শরণার্থীর প্রতি করণীয় এবং শরণার্থীদের প্রতি বিশ^ স¤প্রদায়ের দায় ও দায়িত্ব প্রভৃতি নিয়ে ১৯৫১ সালে জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেশন স্বাক্ষরিত হয়। যদিও এর একটি অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো বিশে^ ক্রমবর্ধমান শরণার্থীর সংখ্যা কমানো। কিন্তু গত সাত দশকে শরণার্থীর সংখ্যা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। পাশাপাশি দাতাগোষ্ঠীর সক্রিয়তাও বেড়েছে বহুগুণ, এ কথাও অনস্বীকার্য। মুশকিল হলো, দাতাগোষ্ঠী শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় সাহায্য-সহযোগিতার পাশাপাশি ক্ষমতা ও আধিপত্যের বিবেচনায় বিশ্বমোড়লদের নানান ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা এবং ইন্টারেস্টের জন্য শরণার্থী সমস্যা বিশ্বব্যাপী ক্রমে জটিল আকার ধারণ করছে। এ রকমই একটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে ২২ অক্টোবর, যা রোহিঙ্গাদের সহায়তার নামে প্রকারান্তরে রোহিঙ্গা সমস্যা কীভাবে আরো দীর্ঘায়িত করা যায় তার একটি প্রয়াস। আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বহু ডিলারের নানা ধরনের দরদ রোহিঙ্গাদের জন্য উথলে উঠতে দেখেছি বিভিন্ন সময়। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যার কীভাবে একটি সন্তোষজনক সমাধান করা যায়, তা নিয়ে কারো কোনো প্রকৃত মাথাব্যথা নেই। অনেকেই শুরুতে এসে মানবতার অবতার সেজে, ফটো সেশন করে এবং সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে ‘প্যাভিলিয়নে’ ফিরে যায়। আর ২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে দেখভাল করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা সত্তে¡ও বাংলাদেশকে গত তিন বছরে নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। এ টাকা এ দেশের জনগণের টাকা। এ দেশের জনগণের ঘামের-শ্রমের টাকা। তখনই প্রশ্ন আসে, বাংলাদেশ কেন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয় এবং নিজের পকেটের টাকা খরচ করে তাদের ভরণপোষণ করে? বাংলাদেশ তো রোহিঙ্গা সমস্যার স্রষ্টা নয়, বরং সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। তা হলে কেন বাংলাদেশকে একা ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার ভার বহন করতে হবে? আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের দায়িত্ব কি কেবলই অর্থের সংস্থান করা? সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী আশ্রয়কে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করা? আগামী ২২ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে দাতাগোষ্ঠীর মাল্টি-ইয়ার প্ল্যানিংয়ের সভা মূলত রোহিঙ্গা সমস্যাকে দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা ছাড়া কিছু নয়। ২২ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা যৌথ উদ্যোগে দাতা সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণে একটি সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ঢাকা মিশন থেকে ‘যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের যৌথ সংবাদ বিবৃতি’ শীর্ষক বার্তায় জানানো হয়, সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থী, আশ্রয় প্রদানকারী দেশসমূহ (মূলত বাংলাদেশ) এবং মিয়ামারের বসবাসরত অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে তাদের ভাষায় কীভাবে মাল্টি-ইয়ার পরিকল্পনা করে এগোনো যায় এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় ও জরুরি তহবিল গঠন করা যায় প্রভৃতি হচ্ছে এ সম্মেলনের উদ্দেশ্য। আরো সাফ করে বললে বোঝায়, আগামী ১০ বছরে রোহিঙ্গাদের সহায়তা দেয়ার জন্য কীভাবে জরুরি তহবিল গঠন করা যায়, তার জন্য এ সম্মেলনের আয়োজন। তার মানে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো প্রকারান্তরে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে কমপক্ষে আরো ১০ বছর রাখার জন্য একটা প্রস্তাব করছে এবং তহবিলের নামে কিছু সাহায্য-সহযোগিতার ব্যবস্থা করে রোহিঙ্গার ভার বাংলাদেশের ওপর চাপানোর পাকা বন্দোবস্ত করছে। তাই এ সম্মেলন এবং এ সম্মেলনের উদ্দেশ্য কোনোটাই বাংলাদেশের জন্য ভালো নয়। ২২ অক্টোবরের বৈঠক সম্পর্কে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন যথার্থই বলেছেন, ‘ওই বৈঠক সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছি যে তারা কী আলাপ করতে চান। শুনতে পেলাম তারা ফেইজ ওয়াইজ, আগামী ১০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ করতে চান। ওনারা বলছেন, মাল্টি-ইয়ার প্ল্যানিং কিন্তু এটাতে আমরা নেই। ওনারা বলছেন যে রিজিওনাল কান্ট্রি ওদের (রোহিঙ্গাদের) শেল্টার দেবে, কিন্তু আমরা মনে করি এটা এই অঞ্চলের একার দায়িত্ব না, এটা বৈশ্বিক দায়িত্ব, এটা গোটা বিশ্বের দায়িত্ব। আমাদের প্রধান লক্ষ্য মানবিক সহায়তা নয়, প্রত্যাবাসন। এটা এই অঞ্চলের একার দায়িত্ব না, এটা বৈশ্বিক দায়িত্ব। আমরা আশা করব, বাংলাদেশে তার এ অবস্থানে অটল থাকবে।’ ঈষৎ সংক্ষেপিত। সারাক্ষণ ডটকমে পুরো লেখাটি পড়–ন। লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]