• প্রচ্ছদ » » পার ক্যাপিটা ইনকাম : পরিসংখ্যার সত্য-মিথ্যা


পার ক্যাপিটা ইনকাম : পরিসংখ্যার সত্য-মিথ্যা

আমাদের নতুন সময় : 26/10/2020

মাসুদ রানা : আমাদের সময়ে লÐন স্কুল অব ইকোনমিক্সের সমাজিক ও রাজনীতি বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদেরকে শুরুতেই যে, দীর্ঘ পাঠ্য তালিকা দেওয়া হতো, তার মধ্যে দু’টি পাঠ্যবইয়ের নাম আমি কখনো ভুলিনি। একটি হচ্ছে এ্যালেন চালমার্সের ‘ডযধঃ ওং ঞযরং ঞযরহম ঈধষষবফ ঝপরবহপব’এবং অন্যটি হচ্ছে ড্যারেল হাফের ‘ঐড়ি ঞড় খরব ডরঃয ঝঃধঃরংঃরপং’ বই দু’টো পাঠককে ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ে সাহায্য করে।
স্ট্যাটিসটিক্স বা পরিসংখ্যানে যে পার ক্যাপিটা ইনকাম বা মাথাপিছু আয়ের কথা বলা হয় এবং যা দিয়ে একটি দেশের জনগণের আয় নির্দেশ করা হয়, সেখানে একটি বিশাল ফাঁকি আছে। অর্থাৎ পরিসংখ্যান ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়। মনে করা যাক, অফিসের কর্তার বেতন মাসে ২ লাখ টাকা এবং কেরানির বেতন মাসে ২০ হাজার টাকা। পরিসংখ্যানগতভাবে তাদের পার ক্যাপিটা ইনকাম হচ্ছে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তব জীবনে কেরানির নুন আনতে পান্তা ফুরোয় এবং বড় কর্তা বিলাসী জীবনযাপন করেন। তো, এই পার ক্যাপিটা ইনকাম দিয়ে কী বুঝা গেলো? আদৌ কি কিছু বোঝা গেলো।
এবার পাঠকদেরকে পরিসংখ্যান সম্পর্কে বলি। পরিসংখ্যান বা স্ট্যাটিসটিক্স কথাটাই এসেছে স্টেইট বা রাষ্ট্র থেকে অর্থাৎ রাষ্ট্রের হিসেব-নিকেশ থেকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে স্ট্যাটিসটিক্স কাকে বলে। সরলভাবে বললে, বলতে হয় স্ট্যাটিসটিক্স হিসেবের বিজ্ঞান নয়, আন্দাজের বিজ্ঞান, যেখানে উপাত্ত সংগ্রহ, বিন্যাস, বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে তথ্য উৎপাদন করা হয়। এই যে তথ্য উৎপাদন, সেটিই জনগণের জন্যে। উপরের উদাহরণের পরিসংখ্যানগত তথ্য হলো এই যে, ওই অফিসের কর্মচারীদের গড় বেতন ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। আর এটি এসেছে বড় কর্তার ২ লাখ টাকা বেতনের তথ্য এবং কেরানীর ২০ হাজার টাকা বেতনের তথ্যকে উপাত্ত ধরে তার ওপর কিছু ম্যাথমেটিক্যাল অপারেশন প্রয়োগের মাধ্যমে মীন (গবধহ) নামের পরিসংখ্যা বা ‘স্ট্যাটিসটিক’ তৈরি করার মধ্য দিয়ে। আগ্রহী পাঠকদের জন্যে বলি, স্ট্যাটিসটিক্স হয় দু’ই প্রকারের। একটিকে বলা হয় ডেসক্রিপটিভ স্ট্যাটিসটিক্স (উবংপৎরঢ়ঃরাব ঝঃধঃরংঃরপং) ও অন্যটি ইনফারেনশিয়্যাল স্ট্যাটিসটিক্স (ওহভবৎবহঃরধষ ঝঃধঃরংঃরপং). নাম থেকেই বোঝা যায়, প্রথমটির কাজ সংখ্যা দিয়ে বর্ণনা করা এবং দ্বিতীয়টির কাজ হচ্ছে ইনফার করা বা যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত টানা।
পরিসংখ্যানবিদেরা সাধারণ মানুষকে ইনফারেনশিয়্যাল স্ট্যাটিসটিক্স সম্পর্কে তেমন বলেন না। তারা প্রধানত ডেসক্রিপটিভ স্ট্যাটিসটিক্স সম্পর্কেই বেশি বলেন, যদিও পাঠকেরা সেখান থেকেই ইনফার করে বসেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সাধারণ মানুষদেরকে সেই ডেসক্রিপটিভ স্ট্যাটিক্টসেরও সবটুকু বলা হয় না। ডেস্ক্রিপটিভ স্ট্যাটিসটিক্সে মূলত দু’টি বিষয় নিয়ে কারবার করা হয়। এর প্রথমটি হচ্ছে কেন্দ্রীয় প্রবণতার পরিমাপ (গবধংঁৎব ড়ভ ঈবহঃৎধষ ঞবহফবহপু) এবং অন্যটি হচ্ছে বণ্টন বা বিস্তারের পরিমাপ (গবধংঁৎব ড়ভ উরংঢ়বৎংরড়হ ড়ৎ ংঢ়ৎবধফ)। আসলে একটি ছাড়া অন্যটি তথ্য হিসেবে অসম্পূর্ণ। কীভাবে, নীচে বলছি। সেণ্ট্র্যাল টেÐেন্সির স্ট্যাটিসটিক বা পরিসংখ্যা হচ্ছে মীন (গবধহ), মীডিয়ান (গবফরধ) ও মৌড (গড়ফব) বিষয় তিনটি বুঝতে হলে, ডিস্ট্রিবিউশন (উরংঃৎরনঁঃরড়হ) বা বণ্টন কাকে বলে বুঝতে হবে। বণ্টন হচ্ছে উপাত্তসমূহক তার প্রকার বা পরিমাপ অনুসারে বিন্যস্ত করা। এই বিন্যাসে মৌড (গড়ফব) হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠটি, মীডিয়ান (গবফরধহ) হচ্ছে মধ্যবর্তীটি, এবং মীন (গবধহ) হচ্ছে সবগুলোর গড়।
ধরা যাক, একটি ফুটবল টীমের খেলোয়ারের মধ্যে ৫ জনের বয়স ২০ এবং বাকি ৬ জনের বয়স যথাক্রমে ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৫ ও ২৭ বছর। পরিসংখ্যান অনুসারে, তাদের বয়সের মৌড (গড়ফব) হলো ২০ বছর, কারণ অফিসের জনসংখ্যার বয়ের প্রবণতা হচ্ছে ৩০ বছরের দিকে, মীডিয়ান (গবফরধহ) হবে ২১ বছর, কারণ এটিই হচ্ছে মধ্যবর্তী, এবং মীন (গবধহ) হচ্ছে ২২ বছর, কারণ সবার বয়স যোগ করে ১১ দিয়ে ভাগ করলে ভাগফল ২২ হয়। বুঝতেই পারছেন, সেণ্ট্র্যাল টেÐেন্সির ৩টি পরিসংখ্যাই মোটামুটি কাছাকাছি ২০, ২১, ২২। কিন্তু যদি জ্যেষ্ঠ খেলোয়ারটি ২৭ বছরে না হয়ে ৪৯ বছরের হয়, তখন মৌড, মীডিয়ান ও মীনের কী অবস্থা হয়? দেখা যায়, মৌড ও মীডিয়ান অপরিবর্তিত থাকে যথাক্রমে ২০ বছরে ও ২১ বছরে, কিন্তু মীন বেড়ে যায় ২৪ বছরে।
এর অর্থ হলো, কেন্দ্রীয় প্রবণতা পরিমাপের ৩টি পরিসংখ্যার মধ্যে মীন হচ্ছে অধিক সংবেদনশীল। কিন্তু তা সত্তে¡ও আমরা ফুটবল টীমের খেলোয়ারদের বয়স সম্পর্কে যে গড়ে ২৪ বছরের ধারণা পাই, তা আমাদেরকে বাস্তবতাকে যথেষ্ট ধারণা দেয় না। কারণ এখানে কনিষ্ঠের বয়স ২০ এবং জ্যেষ্ঠের বয়স ৪৯ বছর। এই যে বিশাল ফারাক, তা আমরা কোনোভাবেই মীন দিয়ে বুঝাতে পারি না। এই পরিস্থিতিতে যেটির প্রয়োজন হয়, তাহলো মেজার অফ ডিসপার্শন (গবধংঁৎব ড়ভ উরংঢ়বৎংরড়হ), যাকে মেজার অফ স্প্রেডও (গবধংঁৎব ড়ভ ঝঢ়ৎবধফ) বলা হয়। এই পরিসংখ্যাটি আমাদেরকে ধারণা দেয় জনসংখ্যার কোনো বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ফারাকটা কতো। মেজার অফ ডিস্পার্শন বা স্প্রেডের জন্যে যে স্ট্যাটিসটিকগুলো নির্ণয় করা হয়। তাদের মধ্য অন্যতম হচ্ছে রেইঞ্জ (জধহমব), কোয়ার্টাইলস (ছঁধৎঃরষবং) ভ্যারিয়েন্স (ঠধৎরধহপব), ভ্যারিয়েন্স (ঠধৎরধহপব), এ্যাবস্যুলিউট ডীভিয়েইশন (অনংড়ষঁঃব উবারধঃরড়হ) স্ট্যাÐার্ড ডীভিয়েইশন(ঝঃধহফধৎফ উবারধঃরড়হ). প্রথমেই রেইঞ্জের কথা বলি। রেইঞ্জ নির্ণয় করতে হয়ে বৃহত্তম সংখ্যা থেকে ক্ষুদ্রতম সংখ্যা বিয়োগ করার মাধ্যমে। আমাদের প্রথম উদাহরণে, ২ লাখ টাকার বেতন-পাওয়া বড়কর্তা ও ২০ হাজার টাকা বেতন পাওয়া কেরানীর পার ক্যাপিটা ইনকাম তথা মীন বা গড় আয় ছিলো ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। এই পরিসংখ্যা আমাদেরকে যে তথ্য দেয়, তা কেরানীর জীবনের বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখে। কিন্তু আমরা যদি বলি, ওই অফিসে কর্মচারীদের গড় বেতন ১ লাখ ১ হাজার টাকা কিন্তু তাদের বেতন রেইঞ্জ বা ফারাক হচ্ছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা (২০০,০০০ ২০,০০০ = ১৮০,০০০), তখন নিমিষেই পূর্বের পার ক্যাপিটা ইনকাম তথা মীন বা গড় আয়ের চিত্রটা অর্থহীন ও মিথ্যা হয়ে যায়। যারা পরিসংখ্যানেরও ফাঁক-ফোকড়গুলো বুঝেন, তারা কখনও মেজার অফ সেণ্ট্র্যাল টেÐেন্সি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না, তাদেরকে অবশ্যই মেজারও ডিস্পার্শন বা স্প্রেড সম্পর্কে জানতে হয়। উপরে আমি মেজার অফ ডিস্পার্শন বা স্প্রেডের একটি পরিসংখ্যা ব্যাখ্যা করেছি। যারা আগ্রহী, তাদের জন্যে নীচে আরও কয়েকটি ব্যাখ্যা করছি। সামাজিক বিজ্ঞানের গবেষণার ফল পরিসংখ্যানিকভাবে বর্ণনার ক্ষেত্রে যে ডেস্ক্রিপটিভ স্ট্যাটিসটিক্স ব্যবহার করা হয়, তাদের মধ্যে মীন (গবধহ – সংক্ষেপে গ) ও স্ট্যাÐার্ড ডীভিয়েইশন (ঝঃধহফধৎফ উবারধঃরড়হ সংক্ষেপে ঝউ). এই স্ট্যাÐার্ড ডীভিয়েইশন হচ্ছে মীন বা গড় থেকে প্রতিটি কেইসের যে ফারাক, তার বর্গের গড়ের বর্গফল। একটি জনসংখ্যার কোনো বৈশিষ্ট্যে যতো অসাম্য (ডিস্পার্শন) থাকবে, স্ট্যাÐার্ড ডীভিয়েইশন ততোই বেশি হবে। বিপরীতক্রমে, সাম্য যতোই বেশি হবে, স্ট্যাÐার্ড ডীভিয়েইশন ততোই কম হবে। অর্থাৎ, পূর্ণ সাম্যে স্ট্যাÐার্ড ডীভিয়েইশন শূন্য হয়ে যাবে। আমরা যদি ফ‚টবল টীমের বয়সের বিষয়টি ধরি, ২০ থেকে ২৭ বছর বয়সী ১১ জনের বয়সের খেলোয়াড়দের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও সঠিক পরিসংখ্যা হবেঃ মৌড = ২০, মীডিয়ান = ২১, মীন = ২২, এবং স্ট্যাÐার্ড ডীভিয়েইশন = ২.৪৫ বছর । কিন্তু যখনই ২৭ বছরের খেলোয়াড়ের বদলে ৪৯ বছরে আমরা খেলোয়াড় নিই, তখন আমাদের পরিসংখ্যা হয়ঃ মৌড = ২০, মীডিয়ান = ২১, মীন = ২৪, এবং স্ট্যাÐার্ড ডীভিয়েইশন = ৮.৪৯ বছর। যদি সকল খেলোয়ার একই বয়সের হয় – ধরা যাক সকলেই ২০ বছরের। এ-ক্ষেত্রে তাদের হবেঃ মৌড = ২০ বছর, মীডিয়ান = ২০ বছর, মীন = ২০ বছর এবং স্ট্যাÐার্ড ডীভিয়েইশন = ০। অর্থাৎ, একটি সমাজের পার ক্যাপিটা ইনকাম দিয়ে সে-সমাজের মানুষের মধ্যে বৈষম্য আড়াল করা হয়। তাই, যেকোনো ডিস্ট্রিবিউশন বা বণ্টনের বৈষম্য কিংবা সাম্য বুঝতে হলে এর সেণ্ট্র্যাল টেÐেন্সি বা কেন্দ্রীয় প্রবণতার পরিসংখ্যার সাথে-সাথে এর ডিস্পার্শন/স্প্রেড বা বিস্তারের পরিসংখ্যাও জানতে হবে। কীভাবে মীন মীডিয়ান মৌড ও স্ট্যাÐার্ড ডীভিয়েইশন নির্ণয় করবেন? এগুলোর সূত্র আছে। কিন্তু আপনার যদি কোনো স্প্রেডশীট এ্যাপ্লিকেইশন থাকে – যেমন গরপৎড়ংড়ভঃ ঊীপবষ – আপনি ১ মিনিটের মধ্যে ডেইটা থেকে নীচের ফর্মুলা দিয়ে তা বের করতে পারবেন। মৌডের ফর্মুলা =গঙউঊ (প্রথম সেল : শেষ সেল ) [উদাহরণঃ =গঙউঊ(অ১:অ১১)] মীডিয়ানের ফর্মুলা = গঊউওঅঘ (প্রথম সেল : শেষ সেল) [উদাহরণঃ =গঊউওঅঘ(অ১:অ১১)] মীনের ফর্মুলা = অঠঊজঅএঊ(প্রথম সেল : শেষ সেল) [উদাহরণঃ =অঠঊজঅএঊ(অ১:অ১১)] স্ট্যাÐার্ড ডীভিয়েইশনের ফর্মুলা = ঝঞউঊঠ(প্রথম সেল : শেষ সেল) [উদাহরণঃ =ঝঞউঊঠ(অ১:অ১১)] ২৪/১০/২০২০। লÐন, ইংল্যাÐ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]