• প্রচ্ছদ » » যেই মানুষগুলো মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মৃত লাশ হয়ে ফিরে দেশের অর্থনীতি সচল রাখছে, সেই মানুষগুলো মরে যাবার পর, কেন মারা গেল সেটা জানার জন্য ময়নাতদন্ত পর্যন্ত করা যায় না?


যেই মানুষগুলো মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মৃত লাশ হয়ে ফিরে দেশের অর্থনীতি সচল রাখছে, সেই মানুষগুলো মরে যাবার পর, কেন মারা গেল সেটা জানার জন্য ময়নাতদন্ত পর্যন্ত করা যায় না?

আমাদের নতুন সময় : 01/12/2020

আমিনুল ইসলাম : মেয়েটা ফিরেছে মৃত লাশ হয়ে। গিয়েছিলো সৌদি আরবে। ১৫ বছরের মেয়েকে ২৫ বছর দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। সেখানে গিয়ে তার ভাগ্যে কী ঘটেছে, সেটা তো সহজেই বোঝা যাচ্ছে। তাও ভাগ্য ভালো, তার মৃতদেহ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এরপর তার পরিবার দাবি করেছে। মৃতদেহের ময়না তদন্ত হোক। কিন্তু বাংলাদেশের কর্তা ব্যক্তিরা সেটা হতে দেননি। হ্যাঁ ঠিকই পড়ছেন মেয়েটা যে দেশে জন্মেছিলো যে দেশে তারা বাবা-মাও জন্মেছিলো, যে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য এই মেয়েটার মতো লাখ লাখ ছেলে-মেয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়। সেই দেশের সরকারি কর্তারা সোজা বলে দিয়েছে ময়না তদন্ত করা সম্ভব না। সৌদি সরকার বলেছে, মেয়েটা স্ট্রোক করে মারা গিয়েছে। এটাই শেষ কথা। কেউ কী আমাকে বলবেন, সৌদি ফেরত মৃত সকল মেয়েগুলোই কেন স্ট্রোক করে মারা যাচ্ছে? মেয়েটার প্রকৃত বয়স ছিলো ১৫, তার বয়স কী করে ২৫ করা হলো, কে বা কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিলো। ঠিক আছে, মেনে নিলাম ১৫ বছর বয়েসেই গিয়েছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাকে কোন পরিস্থিতির মাঝ দিয়ে যেতে হবে, সেটা কি এই মেয়েটাকে কিংবা এমন অন্য সবাই যারা যায়, তাদেরকে শেখানো হয়। ধরে নিলাম, সৌদি রাজা-মহারাজারা এই মেয়েটার ওপর কোনো পাশবিক নির্যাতন করেনি। কিন্তু সেখানকার সংস্কৃতি। সেখানকার খাদ্য অভ্যাস। সেখানকার মানুষের ভাষা এইসব সম্পর্কে কী কোনো ধারণা এই মেয়েটার ছিলো। এইসব মেয়েরা তো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের বাসা বাড়িতে কাজ করতে যায়। আমি চিন্তা করছিলাম আমার নিজের কথা। আজ থেকে ১৮ বছর আগে যখন ইউরোপে পড়তে আসি, শিক্ষিত এই আমাকেই তো নানান রকম অজানা বিষয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
সুইডেনে পা দিয়ে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পার হচ্ছিলাম, দেখি গাড়ি আসছে। থেমে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। দেখি গাড়িও থেমে গিয়েছে। আমি পার হচ্ছি না দেখে ড্রাইভার নেমে এসে আমাকে বলেছে, তুমি মনে হয় নতুন এসেছো এই দেশে। আমাদের এখানে মানুষ আগে। এই ক্রসিংয়ে তোমাকে রেখে যদি আমি চলে যাই, পরের ক্রসিং এ আমার জরিমানা হয়ে যাবে। তুমি দয়া করে পার হও। তো বাংলাদেশ থেকে আসা এই আমি সেটা কী করে জানবো। ছাত্র হোস্টেলে থাকা শুরু করেছি, দেখি কাপড় ধোঁয়ার জন্য লন্ড্রির বুকিং দিতে হয় অনলাইনে। আজ থেকে ১৮ বছর আগের কথা বলছি। আমি তো বুঝতেই পারছিলাম না এটা কী করে সম্ভব। অন্য আরেক জনের কাছ থেকে শিখতে হয়েছে কীভাবে বুকিং দিতে হয়। শুধু বুকিং দিলেই তো আর সব শেষ না। আমাদের ঢাকার বাসায় ওয়াশিং মেশিন এসেছে আজ থেকে ৮-১০ বছর আগে। এর আগে তো ওয়াশিং মেশিন ছিলো না। তো ১৮ বছর আগের এই আমি কী করে জানবো ওয়াশিং মেশিন কী করে চালায়। সেটাও শিখতে হয়েছে। শিখতে হয়েছে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে কী করে ঘর পরিষ্কার করতে হয়। রান্না করতে গিয়ে দেখি চুলা হচ্ছে স্বচ্ছ কাঁচ। দেখেই ভাবলাম এটা কি করে সম্ভব। এই চুলা দিয়ে কি করে রান্না করবো। আজীবন তো গ্যাসের তিন কোনা চুলা দেখেই অভ্যস্ত। এরপর জানতে পারলাম। এইসব হচ্ছে ইলেকট্রিক চুলা। স্রেফ বাটন চেপে ঘাট ঠিক করে দিলেই চুলা গরম হয়ে যায়। ঘরের কাজের এইসব তো গেল। আমাকে অন্তত কোনো সুইডিশ কিংবা বিদেশির সঙ্গে থাকতে হয়নি। আমি ছিলাম আমার মতো ছাত্র হোস্টেলে। তাই নিজের মতো করে থাকতে পারতাম। খাওয়া দাওয়াও নিজের মতো করে করতে পারতাম। আমার মনে আছে আমার এক সুইডিশ বন্ধু তার বাসায় আমাকে দাওয়াত দিয়েছে। তার মা মনের আনন্দে আমার জন্য অনেক কিছু রান্না করেছে। সন্ধ্যায় তাদের বাসায় গেলাম। খেতে গিয়ে দেখি এমন সব খাদ্য যে গলা দিয়ে আর নামছেই না। আলু সেদ্ধ, তাও কোনো রকম লবন-মরিচ ছাড়া। সামান্য মাছ মনে হচ্ছে অর্ধেক সেদ্ধ করে রেখেছে (তখন আমি মাছ খেতাম), মুখেই দেওয়ার উপায় নেই। চিংড়ি মাছ মনে হলো, পুরোই কাঁচা। তো এইসব খাওয়া দেখে তো আমার বমি আসার জোগাড়। এরপরও অনেক কষ্টে ভাব করেছি, খুবই চমৎকার হয়েছে। এখন আপনিই চিন্তা করুন, একটা লেখাপড়া না জানা ১৫ থেকে ২০ বছরের মেয়ে যখন সৌদি আরবে কারও বাসায় কাজ করতে যায়, তাকে তো আমার চাইতে আরও বেশি নানান সব অজানা বিষয়ের মাঝ দিয়ে যেতে হয়। প্রতিদিন তাকে যে খাবার দেওয়া হয়, সেটা তো সৌদিদের খাবার। তার জন্য নিশ্চয় আলাদা কোনো খাবার রান্না করা হয় না। এখন এই মেয়ে কী এই খাবারে অভ্যস্ত। তাকে কি আগে থেকে এই বিষয়ে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। কিংবা ওপরে আমি যেসব অভিজ্ঞতার কথা বললাম। তাদেরকে নাকি এক মাসের না কয় মাসের ট্রেনিং দেওয়া হয়। কিন্তু সেই ট্রেনিংয়ে নাকি কিছুই শেখানো হয় না। তাহলে এই মানুষগুলো সম্পূর্ণ নতুন একটা দেশে, একটা বিদেশি পরিবারের সাথে কী করে থাকবে। এর সঙ্গে যুক্ত করে নিন পাশবিক নির্যাতনের ব্যাপার। এই যখন অবস্থা। এইসব বিষয় নিয়ে যখন ভাবার কথা, তখন আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিদেশে থাকা বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশন (মানে দূতাবাসগুলোতে) কীভাবে পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে কাজ হয় সেটা দেখার জন্য আমেরিকা-ইংল্যাÐসহ ৯টি দেশে তারা সফরে যেতে চান। এই হচ্ছে আমাদের সরকারি কর্মকর্তাদের অবস্থা। যেই মানুষগুলো মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, মৃত লাশ হয়ে ফিরে দেশের অর্থনীতি সচল রাখছে। সেই মানুষগুলো মরে যাবার পর কেন মারা গেল, সেটা জানার জন্য ময়না তদন্ত পর্যন্ত করা যায় না। আর এই মানুষগুলোর পাঠানো টাকায় যেই দেশ চলছে। সেই দেশের সরকারি কর্তারা, বিসিএস ক্যাডাররা ঘুষ খেয়ে, দুর্নীতি করে কিংবা নানান সময় বিদেশ ভ্রমণ করে, লাখ-লাখ, কোটি-কোটি টাকা বাগিয়ে নিয়ে কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম বানিয়ে সেখানে বউ-বাচ্চা রেখে আসে। হ্যাঁ এরপরও তারাই নাকি দিন শেষে দেশ প্রেমিক বিসিএস ক্যাডার কিংবা সরকারি আমলা। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]