• প্রচ্ছদ » » ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন


ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন

আমাদের নতুন সময় : 11/01/2021

অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক : ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি আমাদের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডন এবং নয়া দিল্লিতে যাত্রা বিরতি করে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের আহবান জানিয়ে ৭ই মার্চে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন এবং তারপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে আচমকা পকিস্তান বাহিনীর ভয়াবহ আক্রমণ এবং পরক্ষণে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। এরপরেই সাড়ে সাত কোটি বাঙালির আর এক মুহূর্ত দেরি হয়নি তাদের করণীয় কি তা নির্ধারণে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। দীর্ঘ ৯ মাস ১১ দিনের মহান মুক্তি যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বিজয় অর্জন করেছি কিন্তু সেই বিজয় পূর্ণতা পায়নি। ১৬ ডিসেম্বর যখন পকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনী ৯৩ হাজার সেনা সদস্য আত্মসমর্পণ করে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিদায় নেয়। তখন সাড়ে সাত কোটি বাঙালি অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো আমাদের বিজয় কখন পূর্ণতা পাবে অর্থাৎ কখন বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। সেই সময়টার কথা আজ যদি চিন্তা করি ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে প্রতিটি দিন, মুহূর্ত, ঘন্টা বাঙালি অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন জানার জন্য বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন, কেমন আছেন, কি অবস্থায় আছেন কিন্তু আমরা চরম অনিশ্চয়তায় ছিলাম। ১৯৭২ সালে ৪ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর পাওয়া গেলো বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে আছেন। সেই সময় ইয়াহিয়ার বিদায়ের পর জুলফিকার আলী ভ‚ট্ট পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন এবং ভ‚ট্ট বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে দেখা করে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকে তারা মুক্তি দেবে।
এই ধরনেরই একটা খবর আসলো, কেউ সঠিক জানে না তবে আস্তে আস্তে খবরটা ছড়াচ্ছে পুরোপুরি সাড়ে সাত কোটি বাঙালি খবরটা পেয়ে যায়। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছান। সকাল ১০টার পর থেকে তিনি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, তাজউদ্দীন আহমদ ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলেন। পরে ব্রিটেনের বিমানবাহিনীর একটি বিমানে পরের দিন ৯ জানুয়ারি তিনি দেশের পথে যাত্রা করেন। ১০ জানুয়ারি সকালে তিনি নামেন দিল্লীতে। শেখ মুজিবুর রহমান সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, সমগ্র মন্ত্রিসভা, নেতৃবৃন্দ, ৩ বাহিনীর প্রধান এবং অন্যান্য অতিথি ও সে দেশের জনগণের কাছ থেকে উষ্ণ সংবর্ধনা লাভ করেন। বঙ্গবন্ধু ভারতের নেতৃবৃন্দ এবং জনগণের কাছে তাদের অকৃপণ সাহায্যের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা এসে পৌঁছেন ১০ জানুয়ারি। বঙ্গবন্ধুর আজীবনের সংগ্রামের ফসল আজকের বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি আজকের এই দিনে সদ্য স্বাধীন দেশে ফিরে না আসলে আমাদের স্বাধীনতা কোনোদিনই পূর্ণতা পেতো না। বঙ্গবন্ধু ঢাকায় পৌঁছে বাবা-মামা, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ের সঙ্গে দেখা না করে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি জনগনের সঙ্গে দেখা করা খুব জরুরি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘এই জনগণকেই ৭ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের আহŸান করেছি আমার কথা শুনে যুদ্ধ করে ত্রিশ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে, দেশকে স্বাধীন করেছে। সুতরাং আমার প্রথম দায়িত্ব সেই সকল মানুষের কাছে যাওয়া।
সেই জনসভায় গিয়ে ৭ই মার্চ যেমন ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন তেমনি ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে আরেকবার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। যেখানে তিনি বলেন, তার স্বরপ্নর বাংলাদেশ আজ বাস্তবে রুপ নিয়েছে, তার স্বপ্নের বাংলাদেশ কীভাবে গড়ে তুলবেন, কীভাবে এই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, কীভাবে পুননির্মাণ, পুনর্গঠন করবেন সে বিষয় বলেন। আরোও বলেন পাকিস্তান বাহিনী পরাজিত হয়েছে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন কিন্তু তারা রেখে গেছেন তাদের দোসর যারা এদেশের ত্রিশ লাখ মানুষের হত্যাকাÐে সহযোগিতা করেছে। পাকিস্তানের দোসররা যারা ছিলো তারা এখনো এ দেশে আছে এবং তাদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। অতএব আপনারা সতর্ক থাকুন। এই সর্তক বাণী তিনি সেদিনই উচ্চারণ করে ছিলেন এবং আমরা অত্যন্ত বেদনাহত যে বঙ্গবন্ধুকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি। এই ষড়যন্ত্রকারীরা শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে পর্যন্ত সপরিবারে হত্যা করেছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট, তারা হত্যা করেছে আমাদের জাতীয় চার নেতকে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর এবং তারা ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা করেছিলো বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা কে হত্যা করতে ও আওয়ামী লীগের দলীয় সকল নেতাকর্মীকে এক সঙ্গে শেষ করে দিতে ২০০৪ সালের ২১ আগষ্ট। তাদের ষড়যন্ত্র চক্রান্ত এখনও অব্যাহত আছে। বঙ্গবন্ধু কিন্তু এই সতর্ক বাণী করেছিলেন অনেক আগে এবং আমরা জানি তিনি ১১ জানুয়ারি অস্থ্য়াী শাসনতান্ত্রিক আদেশ জারি করেন। কারণ তিনি গণতন্ত্রের কথা সবসময় বলেছেন।
১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাক্ষরিত ‘বাংলাদেশের অস্থায়ী সংবিধান আদেশ, ১৯৭২’ জারি করা হয়। বলা হয়, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর এবং ১৯৭১ সালের জানুয়ারি ও মার্চে নির্বাচিত ও অন্য কোনো কারণে অযোগ্য ঘোষিত নয় এরকম সব এমএনএ (মেম্বার অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) ও এমপিদের সমন্বয়ে বাংলাদেশের প্রথম গণপরিষদ গঠিত হবে এবং প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের মনোনীত করবেন। এ আদেশ বাংলাদেশের সব অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য হবে। এই আদেশ বলে বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায় অনুসারে সরকার পদ্ধতি সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে যায় এবং শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পরদিন ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। বঙ্গবন্ধু কতোটা বিচক্ষণতার সঙ্গে প্রতিটি পর্যায় সিদ্ধান্তগুলো এমন ভাবে নিলেন যে কোনো কিছুতেই কোন গ্যাপ থাকলো না। একদিনের মধ্যে বিচারপতি, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেওয়া হলো, মন্ত্রিসভা গঠিত হলো। প্রতিকটি পর্যায়ে বিস্তারিতভাবে যেভাবে প্রটোকল অনুসরণ করা উচিত সেভাবে করা হলো এবং বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভা গঠন করলেন ও সেই মন্ত্রিসভা নিয়ে কাজ শুরু করলেন। বঙ্গবন্ধু কারাগারে বন্দি জীবন, টেনশনেও ঝামেলায় থেকেও ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে এসে একদিন সময় নিয়ে সার্বিক সমস্ত ভিত্তি গঠন করে ১২ জানুয়ারি সরকার গঠন করে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু কতো সুচিন্তিত ভাবে সুশৃঙ্খল ভাবে ও বৈজ্ঞানিক ভাবে কাজ পরিচালনা করতেন সেটির একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে ১০ থেকে ১২ জানুয়ারি। তিনি প্রথমিক শিক্ষাকে জাতীয় করণ করে শিক্ষার একটি ভিত দিয়ে যান। তিনি জাতীয় চার মূলনীতর ঘোষণা করেছেন এবং এই চারটি নীতি হচ্ছে বাংলাদেশের দার্শনিক ভিত। বঙ্গবন্ধু মুক্তির পর ওই কয়দিনে কতোগুলো সভা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একে একে নিয়েছেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কতো বিচক্ষনতার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক ভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করেছেন। এরপর বহু চড়াই উতড়াই পেরিয়ে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এরপর থেকে তিনি কখনো সরকার প্রধান হিসেবে, কখনো বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আজ ২০২১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সেগুলো আমরা জানি, বঙ্গবন্ধু অনেক কিছুই বলেছিলেন কিন্তু তার হত্যাকাÐের কারণে করে যেতে পারেননি। আমরা আশা করি আমাদের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বৈষম্য দূর করে, সাম্যের বাংলাদেশ গঠন করবে, সুবিচার প্রতিষ্ঠা করবে এবং বাংলাদেশের মানুষ সত্যিকার অর্থে বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলা চেয়েছিলেন সেই সোনার বাংলাদেশ গড়বে।
পরিচিতি : সাবেক উপাচার্য, ঢাবি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]