• প্রচ্ছদ » » প্রীতিভাজন সহকর্মী মিজানুর রহমান খানের জন্য ভালোবাসা


প্রীতিভাজন সহকর্মী মিজানুর রহমান খানের জন্য ভালোবাসা

আমাদের নতুন সময় : 13/01/2021

লুৎফর রহমান রিটন : হঠাৎ করেই প্রীতিভাজন মিজানের সঙ্গে আমার যোগাযোগটা ঘটেছিলো ক্যালেন্ডারের হিশেবে প্রায় তিরিশ বছর পর, গেলো মে মাসের ২৬ তারিখে। সে আমার সহকর্মী ছিলো ১৯৯২ সালে বাংলাবাজার পত্রিকার যাত্রাসূচনাকালে। আমি পত্রিকাটায় জয়েন করেছি ফিচার এডিটর হিসেবে। সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী এক ঝাঁক তরুণ তুর্কীর সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন বাংলাবাজারে। আমাকে টেলিফোন করে জরুরি ভিত্তিতে মতিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করার তাগিদ দিয়েছিলো আনিস আলমগীর, মতি ভাইয়েরই অনুরোধে। আমি জয়েন করে ডেকে এনেছিলাম হিফজুর রহমানকে, যিনি যুক্ত হয়েছিলেন বার্তা সম্পাদক হিসেবে। আমাকে ডেকে আনলেও সম্পাদক মতিউরের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় আনিস আলমগীর শেষমেশ আর যুক্ত হয়নি। স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর ১৯৯২ সালে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত বাংলাবাজার পত্রিকায় জড়ো হয়েছিলো একদল টগবগে তরুণ। (এই তরুণরাই পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক সাংবাদিকতায় যুক্ত করেছিলো নতুন জোয়ার। তারাই এখন মিডিয়ার হর্তা-কর্তার আসনে।) কে ছিলো না সেই টিমে? ছিলো ফজলুল বারী, প্রভাষ আমিন, জাহিদ নেওয়াজ খান, শহিদুল আজম, কাওসার মাহমুদ, জুলফিকার আলী মানিক, মোস্তফা ফিরোজ, আমিনুর রশীদ, মনোয়ারুল ইসলাম, দুলাল মাহমুদ, মাহফুজুর রহমান, ফরহাদ টিটো, রাজু আলাউদ্দিন, জুয়েল মাজহার, শাকুর মজিদ, আমিনুল ইসলাম শাহীন, জুলফিকার হায়দার, মিলন ফারাবী, সিদ্দিকুর রহমান, শিবলী সালেহ, উত্তম সেন সহ আরো কয়েকজন। তারুণ্যের প্রতীক সেই এক ঝাঁক থোকা থোকা নামের একজন ছিলো মিজানুর রহমান খান। বাংলাবাজারে আমার অন্যান্য সহকর্মীদের মধ্যে ছিলেন অভিনেতা আবুল খায়ের, রাকা, তিন গোয়েন্দার রকিব হাসান, লোকচিত্রী পাভেল রহমান, মাহমুদ আনোয়ার হোসেন, ফারুক মেহদী, মোস্তফা হোসেইন, মাহমুদ শামসুল হক, বদিউল আলম, আযম মীর এবং জালাল আহমেদ। আমাদের বাংলাবাজার টিমের মেধাবী তরুণ মুখ মিজানুর রহমান খানকে কেড়ে নিলো কোভিড ১৯।
মিজানের হাসিমুখটা বারবার ভেসে উঠছে চোখের সামনে। কী প্রাণবন্ত ছিলো মানুষটা। এমনিতেই হাসতো প্রচুর। তার ওপরে আমার সঙ্গে আড্ডায় বসলে তো কথাই নেই। আমার একেকটা কথায় হেসে গড়িয়ে পড়তো চেয়ার থেকে। একসময় আমি কাজ করতাম দৈনিক খবরে। সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজানের পত্রিকা হাউজে। খুব কাছে থেকে দেখেছি মিজান ভাইকে। সম্পাদক মিজান ভাইয়ের সঙ্গে সম্পাদক মতি ভাইয়ের শিক্ষাদীক্ষা এবং আরচরণগত একটা তুলনামূলক আলোচনা করেছিলাম কোনো এক আড্ডায়। সেই আড্ডায় আমি বলেছিলাম—খবরের মিজান ভাই কারো চাকরি খেতে হলে তাকে নিজের রুমে ডেকে নিয়ে বলতেন—‘তুমি বেটার ছুটি নাও’। এই ‘বেটার ছুটি নেয়ার ব্যাপারটায় কী যে আমোদ পেয়েছিলো আমাদের বাংলাবাজারের মিজান। সে তো হেসেই কুটিকুটি—হাহ হাহ হাহ রিটন ভাই, আপনি বেটার ছুটি ন্যান…। প্রায় ত্রিশ বছর পর গত ২৬ মে মেসেঞ্জারে হঠাৎ ভেসে উঠেছিলো মিজানের বার্তা—‘প্রিয় রিটন ভাই, ঈদ মোবারক। আপনার সদাহাস্য মুখে বেটার ছুটির কথা সব সময় মনে থাকে।’ তাৎক্ষণিক জবাবে আমি বলেছিলাম—‘হাহ হাহ হাহ কেমন আছেন আপনি? বেটার ছুটি নেওয়ার কথাটা ফের মনে করিয়ে দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ। অনেক ভালো থাকবেন। শুভকামনা নিরন্তর।’‘আমি ভালো আছি রিটন ভাই। আপনি কোন শহরে থাকেন? আপনার সঙ্গে দীর্ঘ দিনের বিরতিতে আবার মিসিং লিঙ্ক খুজে পেয়ে খুশি হলাম খুবই। আশা করি এখন থেকে যোগাযোগ থাকবে। করোনাময় দিনগুলো পরম করুণাময়ের করুণায় ঋদ্ধ হোক আপনার জীবনে।’ —‘আমি অটোয়া থাকি। খুব মনে পড়ে আমাদের বেটার ছুটি নেওয়ার দিনগুলো। যোগাযোগ থাকবে। ভালো থাকবেন। সাবধানে থাকবেন।’
‘করোনাময় দিনগুলো করুণাময়ের করুণায় ঋদ্ধ হোক আপনার জীবনে’—আমার প্রতি মিজানের এই শুভ কামনা এখনো কার্যকর থাকলেও স্বয়ং মিজানকে রেহাই দিলো না করো না। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে লড়তে এক পর্যায়ে লাইফ সাপোর্টে চলে গিয়েছিলো মিজান, প্রথম আলোর যুগ্মসম্পাদক মিজানুর রহমান খান। আমাদের সম্মিলিত শুভ কামনা তাকে আর ফিরিয়ে আনতে পারেনি। মিজান চলে গেলো। আইন বিষয়ে আমার দেখা চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া গাজী শামছুর রহমানের পর আমাদের মিজানই ছিলো সবচে মেধাবী ব্যাখ্যাকারী। জটিল আইনি ব্যাখ্যার সময়েও ওর মুখের হাসিটি বিলীন হতো না কখনো। টক শোতে নিজের যুক্তিটি পেশ করতো খুবই উচ্চকণ্ঠে। মিজানের সঙ্গে সব সময় একমত যে হতাম এমন নয় কিন্তু তাকে অস্বীকার বা অগ্রাহ্য করার কোনো উপায় সে রাখতো না। গড়গড় করে বলে যেতো সে আইনি ধারাগুলো। কিছুদিন আগে বাংলাবাজারে আমার সাবেক সহকর্মী বন্ধু হিফজুর রহমানের কাছ থেকে একটা শাদাকালো ছবি পেয়েছিলাম। সেই ছবিতে বাংলাবাজার টিমের তরুণ তুর্কীদের সঙ্গে আমাদের বন্ধু মিজানুর রহমান খানও ছিলো। ছবিতে আমি স্বভাবসুলভ কিছু একটা বিষয় নিয়ে মজা করছি, আমার বন্ধুরা হাসছে, অদূরেই দাঁড়ানো হাসিমুখ মিজান,(গোল চিহ্নিত) এবং তার পুরো মনোযোগ আমার দিকেই স্থির। প্রিয় মিজান, শিশুর সারল্যমাখা আপনার হাসিমুখটা কখনো ভোলা যাবে না। আপনি ছিলেন সৎ সাংবাদিকদের প্রতীক, আমার কাছে। ‘বেটার ছুটি নেওয়ার গল্পটা মনে করিয়ে দিয়ে আপনি নিজেই কী না ফাইনাল ছুটিটা নিয়ে নিলেন। শান্তিময় হোক আপনার অনন্তযাত্রা। অটোয়া ১১ জানুয়ারি ২০২১। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]