• প্রচ্ছদ » » বাংলাদেশের গণমাধ্যম কখনোই আরেকজন মিজানুর রহমান খান পাবে না


বাংলাদেশের গণমাধ্যম কখনোই আরেকজন মিজানুর রহমান খান পাবে না

আমাদের নতুন সময় : 13/01/2021

প্রভাষ আমিন : মৃত্যুর সময় তিনি প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু পদবি দিয়ে তাকে মাপাটা হবে মস্ত বড় এক বোকামি। মিজানুর রহমান খান নিজেকে এক ইনস্টিটিউশনে পরিণত করেছিলেন। কিন্তু তিনি যে ইনস্টিটিউশন, সে ব্যাপারে ছিলেন বড্ড উদাসীন। আসলে তার মধ্যে ধ্যানী ঋষির ব্যাপার ছিলো। শুধু মনোযোগ দিয়ে নিজের কাজটা করে যেতেন। সাংবাদিকতার নামে বা সাংবাদিকতার পাশাপাশি আমরা অনেকে অনেক কিছু করি। কিন্তু আমার ধারণা এইসব ব্যাপারে তার কোনো ধারণাই ছিল না। তিনি সারাক্ষণ পড়াশোনা করতেন অথবা ভাবতেন। হাঁটতে হাঁটতেও ভাবতেন মনে হয়। হঠাৎ কিছু জিজ্ঞাসা করলে চমকে যেতেন। তার মধ্যে একধরনের সারল্য ছিল। এখন বুঝি তিনি আসলে জ্ঞানের ধ্যান করতেন। আমরা আড়ালে-আবডালে তাকে নিয়ে বিস্তর হাসাহাসি করেছি। কিন্তু তার ধ্যানমগ্নতায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারিনি।
বাংলাদেশে আমরা চটজলদি সাংবাদিকতায় অভ্যস্থ। কিছু একটা হলো, আমরা চট করে একটা অবস্থান নিয়ে ফেললাম, না বুঝে লিখে ফেললাম। এটা হলো মাছরাঙ্গা সাংবাদিকতা, চট করে ছো মেরে মাছ ধরে বাহবা নিয়ে চলে যাওয়া। সবার সাংবাদিকতা যখন শেষ, তখন শুরু হতো মিজানুর রহমান খানের সত্য অনুসন্ধান। আমি আসলে বাংলাদেশের অল্প কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে গর্ব করি, মিজানুর রহমান খান ছিলেন তাদের একজন। কারণ তিনি বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকেই অন্য উচ্চতায় তুলে নিয়েছিলেন। আলো ফেলেছেন অনেক চাপা পড়া অধ্যায়ে। মার্কিন গোপন দলিল খুঁজে খুঁজে বের করে এনেছেন অনেক চমকে দেয়া সত্য।
মৃত্যুর পর জানলাম, মিজানুর রহমান খান পড়াশোনা করেছেন হিসাববিজ্ঞানে। একটু অবাকই হলাম, হিসাব নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। বরং পার্থিব লাভালাভ নিয়ে ভেবেছেন, এমন বদনাম কখনো শুনিনি। তার মাথাভর্তি ছিল আইন, সংবিধান, মানবাধিকার আর সবকিছুর উর্ধ্বে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা। বিশেষ করে আইন ও সংবিধান নিয়ে তার পান্ডিত্য ছিল সত্যিই ইর্ষণীয়। শুধু জানা-বোঝা নয়, সেটা সঠিকভাবে বোধগম্য উপায়ে পাঠকের জন্য উপস্থাপন করতেন দারুণ মুন্সীয়ানায়। আদালতের কোনো জটিল বিষয় হলে আমি অপেক্ষা করতাম মিজানুর রহমান খানের লেখা বা বিশ্লেষণের জন্য। বেশি দেরি হলে ফোন করে জেনে নিতাম। একজন সাংবাদিকের মধ্যে যে গুনটি থাকা জরুরি, সেই সততা আর বস্তুনিষ্ঠতা ছিল তার সহজাত গুন। মিজানুর রহমান খান এসমন অনায়াসে সেটা অর্জন করেছেন, তিনি হয়তো বুঝতেই পারতেন না। তিনি সত্যটা লিখে ফেলতেন বা বলে ফেলতেন অবলীলায়। সত্য বলার যে ঝুঁকি আছে, সেটা হয় জানতেন না বা আমলে নিতেন না। সত্য বলার সাহস তার ছিল। আর এই সাহসের উৎস ছিল সততা। তার লেখা বা বলা কার পক্ষে বা বিপক্ষে গেল বা যাবে, সেটা বোধহয় তার বিবেচনায় থাকতো না। তাই তো বারবার বিরাগভাজন হয়েছেন আদালতের। কিন্তু পিছপা হননি কখনো। শুরুতেই বলেছি মিজানুর রহমান খানের মৃত্যুতে দেশের সাংবাদিকতার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। সাধারণত কেউ মারা গেলে এই কথাটাই বলি আমরা। আসলে প্রত্যেকটি মৃত্যুই অপূরণীয়। তবে মিজানুর রহমান খানের অভাব কোনোভাবেই পূরণ হবে না। বাংলাদেশের গণমাধ্যম কখনোই আরেকজন মিজানুর রহমান খান পাবে না।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]