• প্রচ্ছদ » » পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে হবে, ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে


পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে হবে, ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে

আমাদের নতুন সময় : 16/01/2021

মারুফ রসূল : এখন সময় এসেছে এই বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করার। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির কারণেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে ন্যায়বিচারের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করলে তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। সত্য ও মানবতাবাদী মানুষ তখন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন। ১৯৭১ সালে বাংলার মানুষের সঙ্গে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে পাকিস্তান, আন্তর্জাতিকভাবে এখন এ বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন জাপানের বিরুদ্ধে কোরিয়ার আদালতের রায়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স গত ৭ জানুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি সংবাদ সূত্রে জানা যায়, ঢাকায় পাকিস্তানের নতুন হাইকমিশনার ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে গেলে একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বর গণহত্যার জন্য দেশটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে বলেন প্রতিমন্ত্রী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়াও আটকে পড়া পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন এবং সম্পত্তির ভাগাভাগির মতো দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমাধানের জন্য আলোচনা করা হয় বাংলাদেশের তরফ থেকে। এর আগে গত ডিসেম্বর মাসে নবনিযুক্ত হাইকমিশনার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে গেলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তান যে নৃশংসতা চালিয়েছিলো, বাংলাদেশ তা ভুলে যেতে পারে না।
মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তান বাহিনীর বর্বর জেনোসাইডের বিষয়টি উত্থাপন করে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনার প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বেশ কয়েকবার দাবি উত্থাপন করেছে। কিন্তু পাকিস্তান বরাবরই তাদের এই নৃশংস অপরাধকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে। দেশটির অধিকাংশ মানুষ এখনো জানেই না কী বীভৎস মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল তাদের রাষ্ট্র ১৯৭১ সালে। তাদের পাঠ্যপুস্তকেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংসতা সম্পর্কিত কোনো ইতিহাস নেই। অন্তর্জালের নানা মাধ্যম ও জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে পাকিস্তানের তথাকথিত শিক্ষিত, সচেতন নাগরিকরাও লেখে, ‘ভারতীয় ষড়যন্ত্রে ঢাকার পতন হয়েছে’। পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী তাদের লেখা বইয়েও এ ধরনের মনগড়া তথ্য দিয়ে থাকে। এ তো গেল স্বীকার-অস্বীকারের রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকেই পাকিস্তান বিভিন্নভাবে বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করে আসছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাÐ থেকে শুরু করে পঁচাত্তর-পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রচনায় পাকিস্তান এ দেশের স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে মদদ দিয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের ক‚টনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় ১৯৭৫ সালে— বঙ্গবন্ধু হত্যাকাÐের পর। বাংলাদেশে যখনই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উঠেছে, তখনই পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা ষড়যন্ত্রের নীলনকশা করেছে। সর্বশেষ ২০১৩ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যখন যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদÐ কার্যকর করা হয়, তখন পাকিস্তান তাদের জাতীয় পরিষদে নিন্দা প্রস্তাব পাস করে। এভাবেই প্রতিটি কর্মকাÐে পাকিস্তান প্রমাণ করে, তারা এখনো বাংলাদেশ-বিরোধিতার জন্যই রাজনৈতিক ছক কষে চলেছে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তান বাংলার মানুষের ওপর যে জেনোসাইড চালিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা বা ক্ষতিপূরণই কেবল নয়, দেশটির কাছে বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের অনেক অর্থনৈতিক পাওনাও রয়েছে, যেগুলো অমীমাংসিত। বাংলাদেশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনার দাবির মতো এই অর্থনৈতিক পাওনা পরিশোধের দাবিও অনেক পুরোনো। ১৯৪৭-৭০ পর্যন্ত পাকিস্তান যে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রæতি পায় (৭৬৪০ মিলিয়ন ডলার), তার ৮৪.২৮ শতাংশ (৬৪৩৯ মিলিয়ন ডলার) পশ্চিম পাকিস্তান উন্নয়নকাজে ব্যয় করে। এর মাত্র ৩০ শতাংশ পায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (১৯৩১.৭ মিলিয়ন ডলার)। অথচ জনসংখ্যার ভিত্তিতে ৫৬ শতাংশ বা সমবণ্টনের ভিত্তিতে ৫০ শতাংশ ঋণ সুবিধা আমাদের পাওয়ার কথা ছিল। বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রে যে ভয়াবহ আগ্রাসী জোচ্চুরি করেছে পাকিস্তান, তা সম্ভবত তৎকালীন ইতিহাসে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। ১৯৪৭-৭০ সালের মধ্যে মোট রপ্তানিতে পূর্ব পাকিস্তানের আয় ছিল ২৫,৫৫৯ মিলিয়ন টাকা (৫,৩৭০ মিলিয়ন ডলার); অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তান আয় করেছে ২১,১৩৭ মিলিয়ন টাকা (৪,৪৪০ মিলিয়ন ডলার)। কিন্তু এই উপার্জিত অর্থ যখন আমদানির জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তখন হিসাব উল্টে ফেলেছিল শোষক পাকিস্তান সরকার। মোট রপ্তানি আয় ৪৬,৬৯৬ মিলিয়ন টাকার (৯৮১০ মিলিয়ন ডলার) মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান বরাদ্দ পেয়েছে মাত্র ১৭,০৬৭ মিলিয়ন টাকা (৩৫৮৫.৪৭ মিলিয়ন ডলার)। বাকি অর্থ (২৯,৬২৯ মিলিয়ন টাকা বা ৬২২৪.৫৩ মিলিয়ন ডলার) পশ্চিম পাকিস্তানের কাজে ব্যয় হয় (গড়হঃযষু ঋড়ৎবরমহ ঞৎধফব ঝঃধঃরংঃরপং, ঔঁহব ১৯৭০, কধৎধপযর, ঢ়১)। অর্থাৎ, আমাদের আয়ের উদ্বৃত্ত অর্থ (৮৪৯২ মিলিয়ন টাকা বা ১৭৮৪.৫৩ মিলিয়ন ডলার) ব্যয় হয় পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন খাতে। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদের মতে, রপ্তানি আয় থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ হবে ২০০০ মিলিয়ন ডলার। আবার দুই অঞ্চলের বাণিজ্যতেও পাকিস্তানের শোষকরা আমাদের রক্ত চুষে মুনাফার পাহাড় গড়ে। ১৯৪৭-৬৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে রপ্তানি হয় ১৭৩৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য অথচ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমদানি করতে হয় ৩৩০৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল দৈনিক বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন মতে, শুধু বৈদেশিক বাণিজ্য খাতে পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের ৫০০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে হবে : এ ছাড়াও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী ইতিহাসের যে জঘন্যতম লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ব্যাংকের টাকা পাচারসহ নানাবিধ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তার বিষয়ে ঢাকায় জাতিসংঘের কার্যক্রম পরিচালনা কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১.২ বিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশের সরকারের হিসাবে তা ১২৪৯ কোটি টাকা। [২] মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পাকিস্তানের কাছে আবারও এই দাবিগুলো তুলে ধরছে, তখনই একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গত ৮ জানুয়ারি দক্ষিণ কোরিয়ার আদালত গুরুত্বপূর্ণ একটি রায় প্রদান করেন (সারাক্ষণ, ১০ জানুয়ারি ২০২১)। রায় অনুযায়ী দুটি বিশ্বযুদ্ধে জাপানি বাহিনী কোরিয়ান নারীদের ওপর যে যৌন সহিংসতা চালিয়েছে, তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। নির্যাতিত নারীদের মধ্যে জীবিত ১২ জন ২০১৫ সালে সে দেশের আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা করেন। জাপানকে জানালেও এ বিষয়ে তারা কোনো সহযোগিতা না করায় ২০২০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার আদালত এ বিষয়ে শুনানি শুরু করে। ১৯১০ সালে জাপানি বাহিনী সমগ্র কোরিয়াতে তাদের সামরিক আধিপত্য স্থাপন করে। সেখানে শুরু করে অকথ্য নির্যাতন। কোরিয়ার নারীদের ওপর চালানো হয় ভয়াবহ যৌন সহিংসতা। টানা ৩৫ বছর ধরে চালানো হয় এই নির্যাতন। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চ‚ড়ান্ত পরাজয়ের পর এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। গবেষকদের তথ্যমতে, এই ৩৫ বছরে প্রায় আড়াই লাখ কোরিয়ান নারীকে বন্দী রেখে যৌন নির্যাতন চালিয়েছিল জাপানি বাহিনীর সদস্যরা (ঐঁধহম, ঐঁধ-খঁহ, ঞযব গরংংরহম এরৎষং ধহফ ডড়সবহ ড়ভ ঈযরহধ, ঐড়হম কড়হম ধহফ ঞধরধিহ, গপঋধৎষধহফ ্ ঈড়সঢ়ধহু, ২০১২, ঘড়ৎঃয ঈধৎড়ষরহধ, ঢ়ঢ়. ১২৭-১৩১)। এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনীর নৃশংস নারী নির্যাতনের বিষয়টি বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা, আদালতের রায় এবং সর্বোপরি ঐতিহাসিক সত্য বিবেচনায় এ কথা প্রমাণিত যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে যৌন নির্যাতন চালিয়েছে, তা ইতিহাসের এক ন্যক্কারজনক অধ্যায়। সভ্যতার ইতিহাসে এমন পূর্বপরিকল্পিত, বিকৃত জিঘাংসাবৃত্তির নজির কমই আছে। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ নারী পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক নির্মম যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু এ বিষয়ে আজ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারকে আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়নি। এখন সময় এসেছে এই বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করার। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির কারণেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে ন্যায়বিচারের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করলে তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। সত্য ও মানবতাবাদী মানুষ তখন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন। ১৯৭১ সালে বাংলার মানুষের সঙ্গে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে পাকিস্তান, আন্তর্জাতিকভাবে এখন এ বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন জাপানের বিরুদ্ধে কোরিয়ার আদালতের রায়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স। সারাক্ষণ ডটকম। লেখক: লেখক ও বøগার




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]