• প্রচ্ছদ » » সময়-অসময় : সব সময় ইরফানরা কেন পার পেয়ে যায়?


সময়-অসময় : সব সময় ইরফানরা কেন পার পেয়ে যায়?

আমাদের নতুন সময় : 16/01/2021

সায়ন্থ সাখাওয়াৎ : বিলম্বিত বিচার বিচারহীনতারই নামান্তর। এর বিপরীতে আরেকটা কথাও আছে, জাস্টিস হারিড ইজ জাস্টিস বারিড। অর্থাৎ তাড়াহুড়োর বিচারও বিচারহীনতার নামান্তর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে এই দুটো তো চলছেই, তার সঙ্গে আছে প্রভাবিত তদন্ত ও বিচার স¤প্রতি একটি সংবাদ শিরোনাম দেখে অনেকে চমকে উঠেছেন, ‘ইরফান সেলিমকে অব্যাহতি দিয়ে পুলিশ প্রতিবেদন’। কী থেকে কেন অব্যাহতি দেওয়া হলো ঢাকার প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি হাজি সেলিমের পুত্র ও নোয়াখালীর আরেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ এমপি একরামুল করিম চৌধুরীর জামাতা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ইরফান সেলিমকে, সে প্রশ্নে যাওয়ার আগে একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক। বেশি দূরে যেতে হবে না। মাত্র মাস দুয়েক আগে। যাদের স্মৃতিশক্তি দুর্বল, তারা ঢাকার কলাবাগানে ঘুসির তোড়ে নৌবাহিনীর একজন অফিসারের দাঁত উপড়ে পড়ার দৃশ্যটা মনে করতে পারেন। তার পরের দৃশ্যগুলো বোঝার জন্য সেই সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। তখন ইরফান সেলিমকে নিয়ে পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, রাজধানীর কলাবাগান ক্রসিংয়ের কাছে নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ওয়াসিফ আহম্মেদ খানকে বেধড়ক মারধর করেন হাজি সেলিমের ছেলে ও তার সঙ্গী-দেহরক্ষীরা। এ সময় ওই কর্মকর্তার সঙ্গে তার স্ত্রীও ছিলেন। তাকেও লাঞ্ছিত করা হয়। সে ঘটনার ধারাবাহিকতায় আমরা জানতে পেরেছি, আলিশান বাড়িতে থাকতেন ইরফান, যেন এক রাজপ্রাসাদ। সেই বাড়িকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে ইরফান সেলিমের অপরাধজগৎ। সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হতো পুরান ঢাকা। চলত চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসী। আর এ জন্য গড়ে তোলা হয় শক্তিশালী এক ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক। র‌্যাবের অভিযানে তার বাসায় মেলে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ, মদের বোতল, বিয়ার, ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ও হ্যান্ডকাফ। সেখানে বিপুল পরিমাণ কালো রঙের ওয়াকিটকিও পাওয়া যায়। এ ছাড়া বেডরুম থেকে উদ্ধার করা হয় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। একটি গুলিসহ পিস্তল, আরেকটি বন্দুক। এগুলোর লাইসেন্স নেই। উদ্ধার করা হয় শক্তিশালী অবৈধ ড্রোন, যেটা আমদানি করতে সিভিল এভিয়েশনের অনুমতি লাগে। ইরফান সেলিমের দেহরক্ষী জাহিদের কাছে ৪০০ পিস ইয়াবা ও বিদেশি অস্ত্র পাওয়া যায়। ওই বাড়ির পাশে ইরফান সেলিমের একটি টর্চার সেলের সন্ধান মেলে। সেখানে তার প্রতিপক্ষ ও ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে নির্যাতন করা হতো। তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। সেখানেও মেলে হাতকড়া (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ অক্টোবর ২০২০)। এই কথা শুধু ইত্তেফাক নয়, দেশ রূপান্তরসহ দেশের সব সংবাদমাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে। আর তথ্যগুলো সরবরাহ করেছে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই।
এইবার দুই মাস পরের খবরটি দেখা যাক। ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজি সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমকে অস্ত্র ও মাদক মামলায় অব্যাহতি দিয়ে এবং তার দেহরক্ষীকে অভিযুক্ত করে চ‚ড়ান্ত পুলিশ রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার থানার ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন ইরফান সেলিমকে অব্যাহতির সুপারিশ করে দেহরক্ষী জাহিদের বিরুদ্ধে ঢাকার সিএমএম আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চকবাজার থানার ওসি মওদুদ হাসান। তিনি বলেন, এ মামলা থেকে ইরফান সেলিমকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে (যুগান্তর, ৪ জানুয়ারি ২০২১)। র‌্যাব-পুলিশই বলল, ইরফান সেলিম এক দুর্ধর্ষ অপরাধী। অবৈধ অস্ত্র, মাদক, ওয়াকিটকি ও টর্চার সেলের কর্তা ইরফান। তাকে মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করা হলো এই চরিত্রে। দুই মাসের মাথায় আবার পুলিশই বলল পুরোপুরি নির্দোষ এমপি পুত্র কাউন্সিলর ইরফান। তাহলে সত্য কোনটা? ইরফান সম্পর্কে দেওয়া র‌্যাব-পুলিশের আগের বক্তব্য? নাকি পরের প্রতিবেদন? যদি পরের পুলিশ প্রতিবেদন সত্য হয়, তবে রাষ্ট্রের একজন সম্মানিত নাগরিককে আগে যেভাবে বেইজ্জতি করা হলো, তার জন্য কী কোনো শাস্তি হবে সংশ্লিষ্টদের? আর যদি পরের প্রতিবেদন মিথ্যা হয়, তবে কী শাস্তির আওতায় আনা হবে তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশকে? বাংলাদেশে দুটোই দুরাশা। এই দেশে যে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা টাকার ক্ষমতা থাকলে শত খুনও মাফ, সেটা কে না জানে! সারাক্ষণ। এমপিপুত্র ইরফানের অব্যাহতির মতোই চমকে ওঠার মতো আরেকটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে ৩ জানুয়ারি সংবাদমাধ্যমগুলোতে, ‘নোয়াখালীতে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন মামলার আসামির জামিন’। রিপোর্টে লেখা হয়, ‘নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে গৃহবধূকে ধর্ষণচেষ্টা ও বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলার এক আসামিকে জামিন দিয়েছেন মহামান্য হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এই এক্তিয়ার আছে। কিন্তু বিবস্ত্র করার ঘটনা নিয়ে দেশের মানুষের মনের যে আকাঙ্খা তার সঙ্গে কি এই জামিনকে মেলানো যায়?
অনেকেরই হয়তো মনে আছে, গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর রাতে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নে একজন গৃহবধূর বসতঘরে ঢুকে তার স্বামীকে পাশের কক্ষে বেঁধে রেখে গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। এ সময় গৃহবধূ বাধা দিলে তাকে বিবস্ত্র করে বেধড়ক মারধর করে মোবাইলে ভিডিওচিত্র ধারণ করে এই জঘন্য অপরাধীরা। পরে সেটি ছড়িয়ে দেয় ইন্টারনেটে। এ ঘটনায় তখন দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়। নির্যাতনের শিকার ওই নারী ৪ অক্টোবর ২০২০ বেগমগঞ্জ থানায় দুটি মামলা করেন। দুই মামলাতেই নয়জনকে আসামি করা হয়। এমন একটি আলোচিত মামলার আসামিও মাত্র তিন মাসের মাথায় জামিন পেলে মানুষের মন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দুর্বল হয়ে পড়ে। চার্জশিটে দুর্বলতা এ দেশে নতুন নয়। অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষকে বিচার পেতে অপেক্ষা করতে হয় বছরের পর বছর, এমনকি যুগের পর যুগও। তারপরও তারা ন্যায়বিচার পাবেন- সেই নিশ্চয়তা নেই এই দেশে। কিন্তু রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা টাকার জোর থাকলে অনেক সময় খুব দ্রæততার সঙ্গে যে বিচার মেলে না, এমনও নয়। যতো বিপদ দুর্বল বা সাধারণ জনগোষ্ঠীর। তাদের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদনে নানা রকম দুর্বলতা থাকে বলে প্রায়ই শোনা যায়। সেই দুর্বলতার সুযোগে পার পেয়ে যায় প্রতিপক্ষ। আদালতের রায়ের ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদন ও সাক্ষী খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু এই দুই ক্ষেত্রেই দুর্বলরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময়ই তদন্ত প্রতিবেদন থাকে তাদের প্রতিক‚লে। তাদের সাক্ষীও থাকে অনুপস্থিত বা দুর্বল। ফলে রায়ে কাক্সিক্ষত ফল পায় না ক্ষমতার বলয়ের বাইরে থাকা সাধারণ জনগোষ্ঠী। পুরো লেখাটি পড়–ন সারাক্ষণ ডটকম। লেখক : চিকিৎসক ও কলামিস্ট




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]