অপুষ্ট উচ্চশিক্ষা

আমাদের নতুন সময় : 18/01/2021

তুষার আবদুল্লাহ : আমার কাছে প্রায়ই শিক্ষার্থীরা আসেন। রকমারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ থেকে। আড্ডা দিতে যেমন আসেন, তেমন অনেকেই আসেন তাদের লেখাপড়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে। কারও কারও পরীক্ষার নির্ধারিত বিষয় থাকি আমি। গণমাধ্যমই শুধু নয়, রকমারি বিষয় নিয়ে তারা কথা বলতে আসেন। এসময় তাদের কাছ থেকে বিদ্যায়তনগুলোর খবরাখবর পাই। কারা পড়াচ্ছেন, কী পড়াচ্ছেন শুনি। তাদের কথায় ভরসা পাই না। শুধুই মন খারাপ হয়। এই তরুণ-তরুণীরা অন্তত মেধাবী। কথা বললেই তাদের মেধার স্ফুরণ দেখতে পাই। সেই স্ফুরণের সঠিক পরিচর্যা হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় নামটি তারা বলছে, বিপনী বিতানের সারি থেকে কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যায়তন বড় উদ্যানে গিয়ে ঠাঁই পেয়েছে ঠিক, কিন্তু সেখানে ফুল ফোটানোর মালি নেই। পরিচর্যার অভাবে, দেখার চোখ সংকীর্ণ হওয়ায় এই স্ফুরণগুলোর অপচয় হচ্ছে। গড় পড়তাভাবে আমরা বলতে থাকি কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সনদ বাণিজ্য হচ্ছে। ছেলে-মেয়েরা শিখছে না কিছুই। শিক্ষক নেই। শিক্ষার মান কলেজের চেয়েও হ্রস্ব মানের। এখানে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের মতোই সবাইকে ভালো নম্বর দিয়ে সন্তুষ্ট রাখা হয়। কারণ তারা ‘শিক্ষা ক্রেতা’। শিক্ষার যে বৈষম্য সেটির উৎকৃষ্ট প্রদর্শন হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রায় শতকের কাছাকাছি সংখ্যার আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে এমন অভিযোগ অসত্য নয়। আবার সকলকে একই কাঠগড়ায় দাঁড় করানোরও সুযোগ নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরেও এনিয়ে আত্ম সমালোচনা আছে বিস্তর। গণমাধ্যম থেকেই জানা করোনাকালে বন্ধ থাকা অবস্থায় কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের হাত বদল হয়েছে। যাকে ‘বিক্রি’ বলছেন কেউ কেউ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্ফোরণ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে বলা যাবে না। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র এখনও উচ্চশিক্ষা কী, এই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণার মধ্যে আসতে পারেনি। বলা যায় এ ব্যাপারে অশিক্ষিত থেকে গেছে। আসলে উচ্চশিক্ষার নামে এক প্রকার সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করছি আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এখানে উচ্চ শিক্ষার জ্ঞানের জোগান নেই ছিঁটে ফোটাও। যেখানে শিক্ষকরাই গবেষণা থেকে, লেখাপড়া থেকে দূরে সেখানে জ্ঞান ভিত্তিক উচ্চশিক্ষা হবে কোথা থেকে। কালই শুনলাম সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠের একজন কক্সবাজার, উখিয়াতে না গিয়েই রোহিঙ্গা নিয়ে তার গবেষণা বা পিএইচডি’র অভিসন্দর্ভ তৈরি করেছেন। শুনতে পাই গণমাধ্যমে মাঠের রিপোর্টিংয়ে চরম ব্যর্থ ছেলেটি বা মেয়েটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছে রিপোর্টিং। এমন অনেক উদাহরণের বিপরীতে কতিপয় যোগ্য অবশ্য আছেন। তারা ভালো গবেষণাও করেন হয়তো। কিন্তু শতাধিক বেসরকারি ও অর্ধশত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কতিপয় নির্ভর হয়ে চলতে পারে না। বলে রাখা ভালো এই কতিপয়ের একটি বড় অংশ আবার উড়ালের দলে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রাজনৈতিক দলের সামিয়ানার নিচে। উপাচার্য পরিবার পরিজনকে বিশেষ ছাড়ে চাকরি দেওয়া এবং আসন ধরে রাখায় ঘর্মাক্ত। সঙ্গে আছে শিক্ষক ও উপাচার্যদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ‘ছুটাগিরী’। এটা কোনোভাবেই ‘শিক্ষক’ চরিত্র বান্ধব হতে পারে না। আমাদের বিদ্যায়তনের মূল সংকট এখন শিক্ষক শূন্যতা। জ্ঞান শূন্যতা। এই দুই শূন্যতা নিয়ে সুষম ও স্বাস্থ্যরূপ উচ্চশিক্ষা সম্ভব নয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যখন বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে, তখন কিন্তু আমাদের শিক্ষাখাতে এই আশা জাগিয়েছিল। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বা জ্ঞানের সঙ্গে সেতু তৈরি করতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নতুন সড়ক তৈরি করেছিল। দুঃখজনক হলো এই সড়কে যোগ দেওয়ার মতো সক্ষমতা হাতে গোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ই মাত্র অর্জন করতে পেরেছে। অনেকেই এখনও ওই সড়ক পথের দেখা পায়নি। যারা পেরেছে তারা আন্তর্জাতিক বিদ্যায়তনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে দিতে পেরেছে যেমন, তেমনই তারা শিক্ষক বিনিময় করারও উদাহরণ দেখাতে পেরেছে। কিন্তু আবারও বলছি কতিপয় সক্ষম হলো আর বাকিরা অসামর্থ থেকে গেলো, এতে কিন্তু বৈষম্য রয়েই যাচ্ছে। এই বৈষম্য ক্রমশ বাড়ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়তেও বৈষম্য বাড়ছে। বাড়ার মূল কারণ কিন্তু জ্ঞানের অবনমন। একই বিদ্যায়তনের ভিন্ন ভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের মাঝেও যোগ্যতার দূরত্ব বিস্তর। মূলত শিক্ষকহীনতাই এখন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল রোগ। যেটি প্রাথমিক পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। এ থেকে উত্তরণের মূল উপায় হচ্ছে শিক্ষক তৈরিতে বিনিয়োগ। এজন্য শিক্ষাদান পদ্ধতিকেও বৈষম্যমুক্ত করতে হবে। লেখক: গণমাধ্যমকর্মী




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]