• প্রচ্ছদ » » মাদ্রাসায় মূলত কারা পড়তে যায়?


মাদ্রাসায় মূলত কারা পড়তে যায়?

আমাদের নতুন সময় : 21/01/2021

নিঝুম মজুমদার : মাদ্রাসায় মূলত কারা পড়তে যায়? যদি প্রশ্নটা করি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাহলে উত্তরটা একদিকে বড়ই করুন এবং অন্যদিকে আতঙ্কের। শেষ বয়সে কোনো দম্পত্তির একটা ছেলে বা মেয়ে হয়েছে ব্যস দম্পত্তি মানত করে বসলো যে তাকে আল্লাহর রাস্তায় পাঠিয়ে দেবো, কোনো দম্পত্তির সন্তান হচ্ছে না, ব্যাস তারা কোনো দর্গায় গিয়ে বা মসজিদে গিয়ে বা ঘরে বসে মানত করলেন যে এইবার যদি একটা সন্তান হয় তাহলে তাকে আল্লহর রাস্তায় দিয়ে দেবেন, ঘরের সবচাইতে দুষ্টু ছেলেটাকে শান্ত করতে হবে? ব্যস তাকে পাঠিয়ে দেন মাদ্রাসায়। অর্থ কড়ির সমস্যা? স্কুলে পাঠাবার টাকা নেই? ব্যস তাকে পাঠিয়ে দিন মাদ্রাসায়। কিংবা বাবা-মা মারা গেছে, বাচ্চাটা এতিম, তাহলে দাও তাকে মাদ্রাসায় পাঠিয়ে। কিংবা পরিবারটা খুব দরিদ্র, তাহলে দাও তাদের সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠিয়ে। এরকম নানাবিধ আরও অনেক আনেক্সপেক্টিং সিচুয়েশনগুলোতে মূলত একজন মানুষের জন্য নির্ধারিত হয় মাদ্রাসা। কখনো সেটি পিতা-মাতার পরকালের বাসনা, কখনো অর্থনৈতিক কিংবা কখনো সামাজিক। মাদ্রাসায় গিয়ে একজন ছাত্র বা ছাত্রী কী পড়েন? তাদের সিলেবাস কী? শহুরে মাদ্রাসার কথা আমি বাদ-ই দিলাম। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে মাদ্রাসাগুলো কীভাবে চলে? গ্রামের বেশিরভাগ মাদ্রাসা বানায় ওই এলাকার কতিপয় দানবীর। কখনো মৃত মায়ের নামে, কখনো মৃত বাবার নামে। সারাজীবন নানাবিধ কর্ম করে একটা বয়সে একটা চৌচালা টিনের ঘর বানিয়ে, দুটো চাটাই কিনে দিয়ে আর একজন হুজুর রেখে দিয়ে দিলেন মাদ্রাসা। ব্যসা, দ্বীনের কাজ শেষ। পরকাল নিশ্চিত করে ফেললেন সেই দানবীর। এইসব মাদ্রাসায় কি পড়ানো হয়, কি পড়েন তারা? কি শেখেন তারা, কারা এই কোমলমতি ছাত্র ছাত্রীদের শিক্ষা দেন? কি শিক্ষা দেন? তাদের জ্ঞান কতোদূর? কি তাদের পরিধি? আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল আমি আলোচনা-ই করলাম না, দেশীয় পরিমন্ডলে তাদের স্থান কোথায়? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। দাখিল কিংবা কামিল পরীক্ষার পাট চুকিয়ে (কারো কারো সেটিও ভাগ্যে জোটে না) মানুষের বাসায় বাসায় গিয়ে মিলাদ পড়ানো এবং একটু চতুর হলে ওয়াজটা শিখে মাহফিল করে আয় করা ছাড়া বেশিরভাগ মাদ্রাসার ছাত্রের কপালে কি আছে বা কি থাকে? কোরবানীর কিংবা রোজার ঈদ এলে দলে দলে মাদ্রাসার ছাত্ররা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে যাকাত, ফিতরা খোঁজেন, কোরবানীর গরুর চামড়া খোঁজেন, মাদ্রাসা চালাবার জন্য ছোট ছোট বাচ্চারা মানুষের বাসায় বাসায় গিয়ে রীতিমত ভিক্ষার মতো দু’হাত পাতেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাদের শিক্ষকরা অনেকটা ভিক্ষার মতো করে হাত পাতেন হাতে লাল কিংবা নীল রঙ্গের একটা রিসিটের কাগজ নিয়ে। আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার কি আদৌ এমন হবার কথা ছিলো? যতোগুলো মাদ্রাসা আমি গ্রামে গিয়ে দেখেছি সেগুলোর অবস্থা যদি আজ বয়ান করি তাহলে আপনারা ভয় পেয়ে যাবেন। এই অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। একটা খর্বকায় টুলের মত বস্তু, তার উপরে কায়দা কিংবা আমপারা। সারি সারি করে রাখা সেসব টুল বা রেহাল। আর একটানা চাটাইয়ের উপর শত শত বাচ্চারা চোখ বন্ধ করে একবার মাথা সামনে আরেকবার মাথা পেছনে নিয়ে চিৎকার করে আরবীতে সেগুলো পড়ে চলেছে। সমান্তরাল করে এই দুই লাইনের ফাঁকে একজন শিক্ষক লম্বা বেত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ ঘুমে হেলে পড়লে, কেউ একটু কম চিৎকার করে পড়লে চটাশ চটাশ করে বেতের বাড়ি পড়ে তার সেই কোমল শরীরে। ফিজিক্স নেই, কেমেস্ট্রি নেই, জ্যামিতি নেই, ত্রিকনোমিতি নেই, বিস্তারিত আকারে বাংলা বা ইংরেজী নেই, সমাজ বিজ্ঞান নেই, কম্পিউটার সায়েন্স নেই, নিজ ভাষায় ধর্মীয় শিক্ষা নেই, আর্টস নেই, ক্রাফটস নেই, ক্রীড়া নেই শধু আছে একটানা বিষাদ। দিনের পরদিন এই রকম অবহেলায় আর পিছিয়ে পড়তে থাকা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এক একজন মাদ্রাসার ছাত্ররা বড় হয়, বেড়ে ওঠে। আপনারা আশ্চর্য হবেন এটি শুনে যে মাদ্রাসায় উর্দু ভাষা শিক্ষা দেয়া হয় অনেক উপরের শ্রেণি পর্যন্ত। কেন উর্দূ ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়, এটির কোনো রকমের ব্যখ্যা নেই? এই স্বাধীন বাংলাদেশে মাদ্রাসায় কেন উর্দু শিক্ষা দেওয়া হবে? তার পেছনের যুক্তিগুলো কি কি কেউ কি আমাকে দয়া করে বলবেন? এই কোমলমতি বাচ্চাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে তাদের উচ্ছ¡ল শৈশব, কৈশোর, ভালোলাগা, নিজের ইচ্ছে সব কিছু। আমাদের সমাজে তারা বেড়ে ওঠেন দূর্দান্ত অবহেলায়, গøানিতে ও অপমানে। বাবা মারা গেলে, মা মারা গেলে, দাদী মারা গেলে, চাচী মারা গেলে এই সব কোমলমতি ছাত্রদের ডাক পড়ে। তারা সেই মৃত বাড়িতে আসেন, বড় হুজুর কোরআন পাঠ করেন, তারাও হুজুরের সাথে সাথে পড়েন তাদের মায়াবী কন্ঠে। মৃতের বাড়ি গম গম করে উঠে সুরা আর রাহমানে, সূরা ইউনুস কিংবা সুরা ইয়াসীনে। আগরবাতির কন্ঠের সাথে সাথে পাঞ্জাবী, স্কার্ফ আর হালকা দাড়িওয়ালা এই কিশোর, যুবকেরা সেই মৃতের বাড়ীতে ফেরেশতা আনবার কিংবা তাকে পরকালে বাঁচাবার রাস্তায় নিয়ে যাবার জন্য প্রাণপণ কোরান পড়তে থাকে…হাদীস পড়তে থাকে। সেই গৃহের মালিক বড় আনন্দ পান। মৃত মায়ের জন্য কোরআন খতম দিয়েছেন, ১০ পারা পরিয়েছেন, ২০ পারা পরিয়েছেন, কি আনন্দ তার। মৃত মা কিংবা বাবাকে পরকালের পুলসেরাত পার করে দিয়েছেন সেই লায়েক ছেলে। এইসব যাবতীয় আরবি চিৎকার শেষে তাদের লাইন ধরে ভাত খেতে দেওয়া হয়। গরম গরম ভাত, গরুর মাংশ, মুরগীর মাংশ। সালাদ…এই একটা দিন যাবতীয় চিৎকারের শেষে তাদের ভাগ্যে জোটে বেহেশতী খাবার। খাবার শেষে তারা আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে বলেন ইয়া রাজ্জাকু, ইয়া রাহীমু এই তোমারই দান…কিন্তু, এই সমাজে এই অংশটি কি জানে যে তারা বেঁচে থেকেও মৃত? তারা কি জানে এই সমাজে, এই পৃথিবী এই বাংলাদেশ তাদের সাথে প্রতারণা করেছে? জ্ঞান, শিক্ষায়, চিন্তায়, আচরণে, ভাবনায় সবকিছুতে তারা পেছনে পড়ে শুধু কষ্ট নিয়ে বেঁচে রয়েছে? তারা কি জানে তাদের পুলসেরাত পার করবার যে কেউ নেই? ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]