• প্রচ্ছদ » » যাপিতজীবন : দ্য হ্যাপিনেস অ্যান্ড দ্য সুখ!


যাপিতজীবন : দ্য হ্যাপিনেস অ্যান্ড দ্য সুখ!

আমাদের নতুন সময় : 21/01/2021

রিতা রায় মিঠু : তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। কেবলই বড়লোক হতে ইচ্ছে করতো। আমার চোখে বড়লোক মানে যাদের বাড়িতে চার স্ট্যান্ডওয়ালা খাট আছে, ঘরে টিউব লাইট জ্বলে, টেলিভিশন আছে, সোফা আছে, টেলিফোন আছে, যারা আইসক্রিমওয়ালার কাছ থেকে কাপ আইসক্রিম কিনে খায়। বাড়িওয়ালা মামার বাড়িতে দলবেঁধে সবাই টেলিভিশন দেখতে যেতাম, মেঝেয় বসে টেলিভিশনে সিনেমা, মামা-ভাগ্নে, বুলেট- টোটা আরও কতো সুন্দর অনুষ্ঠান দেখতাম।
টেলিভিশন তো তাও দেখতাম কিন্তু টেলিফোন জীবনে ছুঁয়ে দেখিনি। খুব শখ হতো টেলিফোন কানে লাগিয়ে হেলো হেলো শোনার। আমার ক্লাসের বন্ধু এনিদের বাড়িতে টেলিফোন ছিলো। এনি আমাকে ওদের ফোন নাম্বার দিয়েছিলো, ফোন করলেই হ্যালো হ্যালো শুনতে পাবো। আমাদের প্রতিবেশী এক ধনী বাড়িতে টেলিফোন ছিল। তাদের মেয়ে আমার বন্ধু ছিলো। সেই বন্ধুর সাথে যুক্তি করে বন্ধুর মা’কে লুকিয়ে এনিকে ফোন করেছি মাত্র, কীভাবে জানি বন্ধুর মা টের পেয়ে যায়।
ঝড়ের গতিতে এসে আমাদের দুই জনকেই বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করে ফোন কেড়ে নেয়। আর আমাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলে, আমার মায়ের কাছে বিচার দিবে বলে। বন্ধুর মায়ের রাগ দেখে ভয়ে আর লজ্জায় কুঁকড়ে গেছিলাম। সেই ছোট্ট বয়সেই অনুভব করেছিলাম, মানুষ বয়সে বড়ো অথবা ছোটো হলেও তাকে অবজ্ঞা, অপমান অসম্মান করা খুবই অন্যায়। অপমানে আমার কালো মুখ আরও কালো হয়ে গেছিলো সেদিন। ভেতরে ভেতরে দারুণ অভিমান এবং আত্মসম্মানবোধ অনুভব করতে শুরু করি। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত কারো কাছে করুণা ভিক্ষা করিনি। নিজের নেই তো নেই। সবার সব থাকে না। আত্মমর্যাদা বোধও দামী সম্পদ, সবার থাকে না, আমার ছিলো। সেই বিকেলে আমার মধ্যে অন্য এক আমি জেগে উঠেছিলো। সেই ‘আমি’ এরপর থেকে মাঝে মাঝেই জেগে উঠতো, আজও জেগে উঠে। সেই আমিই আমাকে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য উদ্বুদ্ধ করে।
এত্তগুলো ডিগ্রী থাকার পরেও নিয়তি আমায় আজ ফোনমেলার মধ্যে টেনে এনেছে। ফোন সার্ভিসে চাকরি আমার, আমার হাতে ঘোরে লেটেস্ট মডেলের ফোন, নিজে ব্যবহার করি না, যতœ করে ছোটো থেকে বুড়ো সবাইকে ফোনের ব্যবহার শিখিয়ে দেই। ভালো লাগায় গলে যাই যখন ভিনদেশী মানুষগুলো আমার কাছে ছুটে আসে ফোনের সমস্যা নিয়ে, আমাকে না পেলে অন্যের কাছে আমার খোঁজ করে, আমি কাজে আসা পর্যন্ত আমার জন্য অপেক্ষা করে! আর আমি? ঘর ভর্তি ফোন, আমি কিনিনি, ফোন কোম্পানির সাথে ফোন সার্ভিস প্ল্যান রিনিউ করার সময় ফোনগুলো পেয়েছি। ছোটোবেলায় টেলিফোন কানে লাগিয়ে হেলো শুনতে গিয়ে বন্ধুর মায়ের গালি শুনে অপমানিত আমি আজ আনলিমিটেড মিনিট প্ল্যান নিয়েও মাসে ১০০ মিনিটের বেশি কথা বলি না।
ভাগ্য আমাকে আরেকটি চমক দেখিয়েছে। ক্যামেরার প্রতি আমার দুর্বলতা ছিলো। ক্যামেরা কারো হাতে দেখলেই আমি পোজ দেয়ার জন্য উতলা হয়ে যেতাম। আমাদের তো ক্যামেরা ছিলো না, বিয়েবাড়িতে ক্যামেরা হাতে দুই একজনকে দেখা যেতো। বিয়েবাড়ির ভোজ যেমন প্রিয় ছিলো, তেমনি ছবি উঠবে আশায় ভীড় ঠেলে নতুন বউয়ের শরীর ঘেঁষে বসার আপ্রাণ চেষ্টা ছিলো। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইট জ্বলতে দেখলেই আমি খুশি আমার ছবি উঠেছে ভেবে। আদৌ হয়তো আমার ছবি ওঠেনি, উঠলেও সেই ছবি আমার দেখার সুযোগ আসেনি, তবুও ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতাম।
অনেক পরে একজন ক্যামেরা শৌখিন মানুষের সাথে আমার বিয়ে হওয়ার সুবাদে আমার নিজস্ব একজন ক্যামেরাম্যান হয়, এবং মনের খুশিতে ইচ্ছেমতো পোজ দিয়ে শত শত ছবি তোলার সৌভাগ্য হয় এবং জীবনের এই মধ্যবেলায় আমার সুযোগ আসে ওয়ালমার্টে ফোন সার্ভিস বাদ দিয়ে ফটোল্যাবে কাজ করার। ফটোল্যাবে আমি এখন সবচেয়ে সেরা ফটোগ্রাফার, সেরা ফটোল্যাব বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছি। পাসপোর্ট পিকচার তুলতে এসেছে কেউ, আমাকে খুঁজবে সবাই। গেন্দা বাচ্চার ছবি তুলবে, তাও পাসপোর্টের জন্য। আমি ছাড়া আর কেউ এগিয়ে আসে না গেন্দা বাচ্চার ছবি তুলতে। এখন কাস্টমার এসে আমাকে খোঁজে, ৮০ বছর আগের লাল হয়ে যাওয়া পুরানো ছবি আমার কাছে নিয়ে আসে এনলার্জ করাতে। আমি স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। ছেঁড়া ছবি, লালচে ছবিকে এমন যতেœ নতুন করে প্রিন্ট করে কাস্টমারের হাতে তুলে দিই, তাদের চোখে বিস্ময় আর মুখে ফুটে ওঠা হাসি দেখে আমার নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দিই। আমার পিসী আজ বলছিলো, তোর শিক্ষা, এত ডিগ্রী কোনো কাজে লাগাইলি না। এটা একটা আফসোসের বিষয়। আমি বললাম, পিসী আমি কিন্তু খুব হ্যাপি আমার কাজের ব্যাপারে। শিক্ষা অথবা ডিগ্রি, কিছুই তো হারিয়ে যায়নি। সবই আছে কিছু ঘিলুতে, বাকিটা সার্টিফিকেটে। আমার ডিগ্রি দিয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটানো যাবে না, কিন্তু ওয়ালমার্টে গত পনেরো বছরে আমার কাজ দিয়ে কতো মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছি, তার মূল্য তো অপরিসীম। পিসী বলে, হ, তুই যা কইবি তাই ঠিক ঠিক ঠিক। তবে এটাও ঠিক, মানুষের মুখে হাসি ফোটানো সহজ কাজ না। তুই যখন তোর কাজ নিয়া হ্যাপি, সেইটাই আসল। হ্যাপি থাকাটাই আসল কথা।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]