• প্রচ্ছদ » » সময়-অসময় : ব্যানারে ধর্ম, আড়ালে রাজনীতি


সময়-অসময় : ব্যানারে ধর্ম, আড়ালে রাজনীতি

আমাদের নতুন সময় : 21/01/2021

মারুফ রসূল : ধর্মকে ব্যবহার করে সেনা কর্মকর্তারা কীভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তা ইবরাহিম সাহেবের অজানা নয়। সেই পুরোনো কৌশলটিই তিনি অবলম্বন করেছেন। এবারই প্রথম করলেন, তা নয়, গত বছরের ১২ ডিসেম্বরেও ১৪ জন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের অডিটোরিয়ামে গোলটেবিল বৈঠক করেছিলেন তিনি। বাহাত্তরের সংবিধানে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। কারণ ২৩ বছরের পাকিস্তানি শাসনামলে এই ধর্মকে ব্যবহার করেই বাংলার মানুষের ওপর নির্মম শোষণ আর নির্যাতন চালিয়েছে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। একাত্তরে বর্বরতম জেনোসাইড চালিয়েছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসরা ধর্মের নামে। ধর্মের নামে রাজনীতি একটি জাতিকে যে কোথায় নামিয়ে আনতে পারে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাকিস্তান। ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে পাকিস্তান রাজনৈতিকভাবে যেমন পর্যুদস্ত, অর্থনৈতিকভাবেও তেমনি বিপর্যস্ত। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বা রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার যেভাবেই কথাটি বলি না কেন, পরিণতি দিন শেষে একই হয়। এই সত্য, সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা বুঝতে পেরেছিলেন বলেই বাহাত্তরের সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। সংবিধানের ১২তম অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের জন্য সা¤প্রদায়িকতা, রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহার ও বিশেষ কোনো ধর্ম পালনের কারণে ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য লোপ করার সাংবিধানিক বিধান ছিলো। আবার ৩৮ অনুচ্ছেদে বলা ছিলো, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুযায়ী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক কোনো সমিতি বা সংঘ গঠন করার বা তাদের সদস্য হওয়ার বা অন্য কোনোভাবে তার তৎপরতায় অংশগ্রহণ করার অধিকার কোনো ব্যক্তির থাকবে না। ১৯৭৭ সালে প্রোক্লেমেশন অর্ডার নং ১ এর মাধ্যমে সংবিধানের ধর্মীয় ১২ সম্পূর্ণভাবে এবং ৩৮ অনুচ্ছেদের অংশবিশেষ বিলোপ করা হয়। ২০১১ সালে আদালত পঞ্চম সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলে উল্লিখিত দুটো ধারাই পুনর্বহাল থাকে। যদিও ৩৮ অনুচ্ছেদ খানিকটা রূপ পাল্টায়। এতে বলা হয়েছে, কারও এমন সমিতি বা সংঘ গঠন করার কিংবা তার সদস্য হবার অধিকার থাকবে না, যা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক ও সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি বিনষ্ট করে। আবার সংবিধানেই যেহেতু রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ‘ইসলাম’-কে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং প্রস্তাবনাতেও ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ রাখা হয়েছে, সেহেতু পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হলেও সার্বিক বিচারে একে বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতিস্থাপিত রূপ বলা চলে না।
গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতির ওপর দিয়ে সামরিক ও মোল্লাতন্ত্রের যে খড়্গকাল গেছে, তাতে রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতিরও নানা পরিবর্তন ঘটেছে, কোথাও কোথাও স্থায়ীভাবে বদলে গেছে রাজনীতির মুখ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ। কিন্তু মোটাদাগে বাংলাদেশের রাজনীতির পক্ষ-বিপক্ষ শক্তিটি সুস্পষ্ট। সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্কগুলো নিয়ে আলোচনা করলে দেখা যাবে এখানে রাজনৈতিক আলোচনা হয় মূলত ‘বাংলাদেশ’ ও ‘বাংলাদেশ বিরোধিতা’র প্রশ্নে। রাজনৈতিক গতিপ্রবাহও নির্মিত হয় সেভাবেই। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের দর্শনের সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখতে পাই। কিন্তু পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনীতিতে শাসনতন্ত্র সংশোধন থেকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই পাকিস্তানপন্থী দর্শনের উপস্থিতি টের পাই। এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, পঁচাত্তর-পরবর্তী সময় থেকেই বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থী রাজনীতি স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালু করা, যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করা, রাষ্ট্রধর্ম বানানো, পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা বা যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতায় আনা বিএনপি, জাতীয় পার্টি বা বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে এই কাজগুলো করেছে। আর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এসে এগুলো ঠিক করতে হয়েছে। সবকিছু যে তারা ঠিক করেছে বা করতে পারছে, এমন নয়। কারণ রাষ্ট্র চরিত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে আওয়ামী লীগেরও রাজনৈতিক চরিত্রের বদল ঘটেছে। ফলে রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারের চল আওয়ামী লীগের মাঝেও তীব্রভাবে বিদ্যমান এবং ক্ষেত্রবিশেষে তারাও জানে, ভোটের রাজনীতিতে ধর্মকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। গত ১৬ জানুয়ারি দোয়া মাহফিলের ব্যানারে বিএনপি-জামায়াতের একটি বৈঠকের সংবাদ প্রকাশিত হয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ‘সরকার পতন’। আয়োজক ছিলেন বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম। বৈঠকে বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারাও যোগ দেন। দোয়া মাহফিলের আড়ালে রাজনীতির এই মহড়া তো আমাদের দেশে নতুন নয়। দীর্ঘ সময় ধরেই এ দেশে ওয়াজ মাহফিলের নামে আদতে বাংলাদেশ বিরোধী রাজনীতিই চলে এসেছে। যুদ্ধাপরাধী দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী এই ধারাতেই জামায়াতের সা¤প্রদায়িক ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশের নানা প্রান্তে যে ওয়াজ মাহফিলগুলো হয়, ঠিকঠাক খোঁজখবর নিলে দেখা যাবে, কীভাবে এগুলোর মাধ্যমে আদতে পাকিস্তানপন্থী রাজনীতি চালিয়ে যায় কাঠমোল্লারা। এইসব ওয়াজ মাহফিলের যে সামান্য অংশ আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পাই, তা থেকেই স্পষ্ট হয় তাদের রাজনৈতিক কৌশল। তারই আরেকটি সংস্করণ হলো কল্যাণ পার্টি আয়োজিত এই ‘দোয়া মাহফিল’। সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম যেহেতু সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের যে বাঁকগুলোতে সামরিকতন্ত্রের আধিপত্য প্রকট ছিল, তিনি সেই সময়টাতেই সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন। ধর্মকে ব্যবহার করে সেনা কর্মকর্তারা কীভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন,তা ইবরাহিম সাহেবের অজানা নয়। সেই পুরোনো কৌশলটিই তিনি অবলম্বন করেছেন। এবারই প্রথম করলেন, তা নয়। গত বছরের ১২ ডিসেম্বরেও ১৪ জন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের অডিটোরিয়ামে গোলটেবিল বৈঠক করেছিলেন তিনি। বর্তমানে জামায়াত-বিএনপি বা স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির রাজনীতি চর্চার ধরন খানিকটা বদলেছে। যারা ওয়াজে বা ইসলামি বক্তৃতাতে অহরহ পাশ্চাত্যের দেশগুলোকে ‘ইহুদি-নাসারা’ বলে থাকে, তারাও নিয়ম করে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ব্যবহার করছে, শুধু তা-ই নয়, ফেসবুকে তাদের বক্তব্য শেয়ার দিলে যে ‘হাশরের ময়দানে তা সওয়াব হিসেবে গণ্য হবে’ এই মর্মেও ফতোয়া দিচ্ছে। ফলে বর্তমান রাজনীতি বুঝতে হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে খানিকটা ধারণা নেয়া যেতে পারে। বেশ কয়েক মাস ধরেই সাবেক কিছু সেনা কর্মকর্তা, বর্তমানে যারা প্রবাসী, ফেসবুক এবং ইউটিউবে অনর্গল বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। নানা অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া কিছু সাংবাদিকও আছেন এই দলে, যারা যুদ্ধাপরাধীদের অর্থে প্রবাসে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। হঠাৎ করে কিছু ‘সাংবাদিক’ ও ‘সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের’ এই সম্মিলিত অপপ্রয়াসের সঙ্গে ১৬ জানুয়ারির ঘটনাটি মিলিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক এসব কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের যেসব বক্তব্য আমরা শুনি, তারই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই কল্যাণ পার্টির আয়োজিত ওই সভাতে। সুতরাং হিসাবটি খুব পরিষ্কার। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে রাজনীতি যেমন ক্যান্টনমেন্টে ঢুকে গিয়েছিল এবং রাষ্ট্রের সমূহ সর্বনাশের জন্য ধর্মকেই শিখÐী হিসেবে খাড়া করেছিল, বর্তমানেও তেমন পাঁয়তারা চলছে কি না, এটা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ, অশুভ শক্তি চূড়ান্ত আঘাত হানার আগেই ছোট ছোট বাঁই তোলে। সাধু সাবধান না হলেই সর্বনাশের মাথায় বাড়ি! সারাক্ষণ ডটকম। লেখক : লেখক ও বøগার




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]