• প্রচ্ছদ » » অভিমানী মাশরাফিকে বিদায় বলার সুযোগ দিলেন না!


অভিমানী মাশরাফিকে বিদায় বলার সুযোগ দিলেন না!

আমাদের নতুন সময় : 23/01/2021

প্রভাষ আমিন : দশ মাসেরও বেশি সময় পর বুধবার মাঠে নেমে জয় নিয়েই মাঠ ছেড়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল, প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু এই শীতেও ক্রিকেটের চিরকালীন প্রতিপক্ষ বৃষ্টি হাজির। তবে এই সময়ে ক্রিকেটের আসল প্রতিপক্ষ করোনা। আর এই করোনার কারণে আজ মাঠে ক্রিকেট ছিল, কিন্তু প্রাণ ছিল না। কারণ, বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রাণ আসলে এর দর্শক। এই প্রথম বাংলাদেশের ক্রিকেট হচ্ছে দর্শকশূন্য মাঠে। যারা খেলবেন, তারা নিশ্চয়ই দর্শকদের মিস করবেন। আর আমি মিস করবো মাশরাফিকে। সত্যিই মাশরাফির মাঠে না থাকাটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য বড্ড বেদনার। মাশরাফির গোটা ক্যারিয়ারই আসা-যাওয়ার এক জটিল গোলকধাঁধা। মাশরাফি কবে বাদ পড়েছেন, কবে ফিরেছেন, কয়বার অপারেশন করিয়েছেন; এর হিসেব রাখা মুশকিল। মাশরাফির ক্যারিয়ার বারবার থমকে গেছে। অনেকেই অনেকবার ভেবেছেন, এই বুঝি শেষ, মাশরাফির আর ফেরা হবে না। কিন্তু মাশরাফি বারবার প্রমাণ করেছেন, তিনি অন্য ধাতুতে গড়া, লড়াই তার রক্তে। তাই তো বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিরে এসে সেখানেই গড়েছেন সুরম্য প্রাসাদ। মাশরাফি তার ক্যারিয়ারের সেরা সময় কাটিয়েছেন হাঁটুতে ৭টি অপারেশন নিয়ে। বারবার ইনজুরির কারণে বাদ পড়লেও এবার মাশরাফি বাদ পড়েছেন পারফরম্যান্স বিবেচনায়। মাশরাফির বয়স এখন ৩৭। তাছাড়া বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভাবনা এখন আগামী বিশ্বকাপকে ঘিরে। তাই কোনও লড়াইয়েই বোধহয় এবার আর ফেরা হবে না মাশরাফির। আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দেননি বটে। কিন্তু মোটামুটি বলেই দেওয়া যায়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাশরাফিকে আর দেখা যাবে না। জীবনের সব ক্ষেত্রে থামতে জানাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাফল্যটা অবশ্যই দরকার। কিন্তু সেই সাফল্যের সীমাটাও জানা দরকার। খেলোয়াড়ি জীবনে থামতে জানাটা, এমনকি খেলতে পারার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অনেক খেলোয়াড় শুধু সময় মতো অবসর নিতে না পারায়, ক্যারিয়ারে অনেক অর্জন থাকার পরও নিন্দিত হয়েছেন। এমনকি শচীন টেন্ডুলকারের মতো গ্রেট খেলোয়াড়কে নিয়েও ফিসফাস শোনা যাচ্ছিল, এখনও যাচ্ছে না কেন?
মাশরাফির ক্ষেত্রে ফিসফাস নয়, রীতিমতো উচ্চকণ্ঠ ছিলেন সবাই, এখনও যাচ্ছে না কেন। একসময় মাশরাফির জন্য মানুষ মিছিল করেছে, মাশরাফির চোখের জল কাঁদিয়েছে গোটা বাংলাদেশকে। আর এবার বাদ পড়ার পর কোনও আওয়াজ শোনা যায়নি। সময় আসলেই খুব নিষ্ঠুর। দুই বছর আগেও বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তির নাম ছিল মাশরাফি। দলমত নির্বিশেষে সবার চোখের মণি ছিলেন মাশরাফি। এই সর্বব্যাপী জনপ্রিয়তায় প্রথম ধস নামে ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ায়। খেলোয়াড়দের রাজনীতি করা নিয়ে আমার কোনও আপত্তি নেই, বরং আমি সবাইকে রাজনীতিতে উৎসাহ দেই। তারা কোন দলে যোগ দেবেন, সেটা নিয়েও আমার বলার কিছু নেই। তবে খেলা ছাড়ার আগেই মাশরাফির এমপি হয়ে যাওয়াটা আমার কাছে ভালো লাগেনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের এমপি যতো ভালোই হোক, বিএনপির কোনও সমর্থক তাকে পছন্দ করবে না। এভাবেই মাশরাফির জনপ্রিয়তায় পতন ঘটে। তারপরও বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ কেউ হাতছাড়া করতে চাইবে না। বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সও তার জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মাশরাফি চাইলে বিশ্বকাপের বড় মঞ্চ থেকেই অবসর নিতে পারতেন। সেটাই তার মতো বড় মাপের আইকনের জন্য মানানসই হতো। কিন্তু বোর্ডের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির কারণে সেটা হয়নি। বিশ্বকাপের পর থেকেই প্রথমে ফিসফাস, তারপর আলোচনা- কবে অবসর নেবেন মাশরাফি? তার অবসরের জন্য একটি বিশেষ ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু তিনি রাজি হননি। অধিনায়কত্ব ছেড়েছেন। কিন্তু খেলা ছাড়তে রাজি নন। এমনকি দল থেকে বাদ পড়ার পরও তিনি অবসর নিয়ে কথা বলতে রাজি নন। জানি না কোন অভিমানে মাশরাফি মাঠ থেকে বিদায় বলার সুযোগ দিলেন না আমাদের। এমন নীরব বিদায় মাশরাফির সঙ্গে যায় না।
মাঠ থেকে বিদায় নিতে না পারাতে মাশরাফির কিছু যায় আসে না। মাশরাফিকে যথাযথ মর্যাদায় বিদায় দিতে না পারাটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য গøানির। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ক্রিকেটারদের মধ্যে সেরা নিশ্চয়ই সাকিব আল হাসান। তবে আমি বলি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং দিন বদলানো ক্রিকেটার নিঃসন্দেহে মাশরাফি বিন মর্তুজা। তাকে উইকেট দিয়ে, পরিসংখ্যান দিয়ে মাপাটা হবে দারুণ বোকামি। মাশরাফিকে আমি কখনও পরিসংখ্যান দিয়ে মাপি না। মাশরাফি আসলে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। মাশরাফি এক অনুপ্রেরণার নাম। মাশরাফি যে বাংলাদেশে জন্মেছে, এ জন্য আমাদের গর্ব করা উচিত। শুধু বাংলাদেশ নয়, আমার বিবেচনায় মাশরাফি বিশ্বসেরা অধিনায়কদের একজন। যেভাবে তিনি দলকে নেতৃত্ব দেন, সবাইকে অনুপ্রাণিত করেন, বিপদে সতীর্থকে আগলে রাখেন, হৃদয়ে গভীর দেশপ্রেম আর আবেগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন; তার কোনও তুলনা নেই। ২০১৫ বিশ্বকাপের আগেও বাংলাদেশ একটা গড়পড়তা দল ছিল। কালেভদ্রে জয় পেতাম আমরা। জিম্বাবুয়েকে হারালেও মধ্যরাতে মিছিল বের হতো। মাশরাফি এসে জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় বদলে দিলেন বাংলাদেশকে। সম্মানজনক পরাজয়ের ধারা থেকে বাংলাদেশকে নিয়ে এলেন জয়ের ধারায়। প্রতিপক্ষ যেই হোক, নিজেদের সেরাটা খেললে বাংলাদেশ জিততে পারে, এই বিশ্বাসটা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব মাশরাফি বিন মর্তুজার। ইনজুরি এসে বারবার ধ্বংস করে দিতে চায় তাকে, কিন্তু আবার তিনি উঠে দাঁড়ান। এই অদম্য মনোবলটাই তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন দলে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাবালক হয়ে ওঠাটাও তার অবদান। স্পিন নির্ভরতা কাটিয়ে গতি দিয়ে প্রতিপক্ষের মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়ার কৃতিত্বটাও মাশরাফিরই। শুধু ক্রিকেটার নয়, মাশরাফি সব মানুষের অনুপ্রেরণা। মাশরাফির জীবনে যা যা ঘটেছে; অন্য কেউ হলে এতোদিনে কোথায় চলে যেতেন। মাশরাফিরা কখনও হাল ছাড়ে না, হার মানে না। লড়াই করে শেষ বিন্দু পর্যন্ত। মাশরাফির জীবনের গল্প আসলে নিছক গল্প নয়, গল্পের চেয়েও বেশি কিছু। লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]