• প্রচ্ছদ » » জীবনের জয়গান : বিকৃত স্বভাব ও পথ হারানো তারুণ্য


জীবনের জয়গান : বিকৃত স্বভাব ও পথ হারানো তারুণ্য

আমাদের নতুন সময় : 23/01/2021

ডা. লেলিন চৌধুরী : তারুণ্যের এই অধ:পতনের ধারা থামাতে হবে। তাদের একজনকেও পথ হারাতে দেওয়া যাবে না। আমাদের পারিবারিক পরিবেশে সুস্থ ও স্বাভাবিক যৌনতার শালীন প্রকাশ থাকা দরকার। শিশু-কিশোর-তরুণদের জানাতে হবে যৌনতা ‘খারাপ নয়, এটা জীবনের স্বাভাবিক অংশ। প্রতিটি শিশুর বয়ঃসন্ধিকালে, বাবা-মা তাকে এ সময়ের পরিবর্তন সম্পর্কে জানাবে স¤প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি সংবাদে মানুষজন চমকে উঠেছে। রাজধানীর কলাবাগানের এক কিশোরী, তার বয়স ১৭। ধানমন্ডির বিখ্যাত ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল মাস্টার মাইন্ডে ও লেভেলে লেখাপড়া করত। ইফতেখার ফারদিন দিহান নামের ১৮ বছর ৭ মাস বয়সের আরেক তরুণ। সেও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্র। গ্রæপ স্টাডির নাম করে মেয়েটিকে নিজের ফাঁকা বাসায় ডেকে নেয় দিহান। এটি ছিল প্রথম দৃশ্যপট। দ্বিতীয় দৃশ্যপটে আমরা কিশোরীটিকে দেখি নিকটবর্তী একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। ইতোমধ্যে মেয়েটির মা তার অফিস থেকে ওই হাসপাতালে চলে এসেছেন। ডাক্তার মেয়েটির মাকে জানান, ‘ওকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। রোগীর যৌনাঙ্গ দিয়ে প্রচুর রক্তপাত হয়েছে। সম্ভবত অনেক বেশি রক্তক্ষরণের জন্য সে মারা যায়।’ পোস্টমর্টেমকারী চিকিৎসক জানালেন, ‘মেয়েটির যোনি এবং পায়ু দুটো পথ দিয়েই রক্তরক্ষণ হয়েছে। এই প্রাণবন্ত কিশোরীটির মৃত্যুর কারণ হলো অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ।’ কিশোরীর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন না থাকার কথাও তিনি জানালেন। ঘটনাটির কতোগুলো বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। দিহান মেয়েটিকে ডেকে নেয় কেবল তার বাসা খালি হওয়ার পর। মেয়েটির যথেষ্ট ভরসা ছিল, ছেলেটার দ্বারা তার কোনো ক্ষতি হবে না। এ জন্য সে নির্দ্বিধায় ওর বাসায় যায়। এটা নিশ্চিত যে তাদের মধ্যে সম্মতিভিত্তিক স্বাভাবিক যৌনমিলন হয়নি। উভয়ের সম্মতিতে মিলন হলে মেয়েটির যৌনাঙ্গে কোনো ক্ষত হওয়ার কথা নয়। তার জন্য এটি প্রথম মিলন হলে কেবল সতীচ্ছদ বা হাইমেন ছিন্ন হওয়ার কারণে অল্প পরিমাণে রক্তপাত হতো। অবশ্য সেটাও সব ক্ষেত্রে হয় না। কিন্তু এখানে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ একাধিক রক্তনালি ছিঁড়ে গেছে। যেটা কেবল প্রবল বল প্রয়োগের মাধ্যমে হতে পারে। পায়ুপথে গভীর ক্ষত কীভাবে হলো? এখানেও তীব্র শক্তি প্রয়োগ করে পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করানো হয়। এতে যে ক্ষত হয়, সেখানেও কয়েকটি রক্তনালি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। অল্পস্বল্প রক্তপাতে একটি তরুণ প্রাণ নিভে যায় না। প্রচুর রক্তক্ষরণ না হলে মৃত্যুর মতো চ‚ড়ান্ত ঘটনা ঘটত না। প্রথম ক্ষতের তীব্র যন্ত্রণায় মেয়েটি কখনোই দ্বিতীয় ক্ষত তৈরির প্রক্রিয়ায় অংশ নিত না। সে রকম হতে গেলে সে আপ্রাণ বাধা দিত ও ধস্তাধস্তি হতো। তার যন্ত্রণা ও প্রতিরোধের চিৎকার শোনা যেত। মেয়েটির শরীরে এসবের চিহ্ন তৈরি হতো। কিন্তু সে রকম আলামত পাওয়া যায়নি বলে আমরা জেনেছি। এ জন্যই মনে করা হচ্ছে, কিশোরীটিকে অধিকমাত্রায় ঘুম বা অচেতন করার ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল। সেটা সম্ভবত কোকা-কোলা জাতীয় কোমল কোনো পানীয়র সঙ্গে। অর্থাৎ এখানে একটি ঠান্ডামাথার পূর্বপরিকল্পনা ছিল। জোরপূর্বক যৌনমিলন বা মিলনের চেষ্টা হলো ধর্ষণ। ধর্ষকামিতা একধরনের মানসিক বিকৃতি। পায়ুপথে সঙ্গমকে বলা হয় পায়ুকাম। এটিও পরিপূর্ণ যৌনবিকৃতি। ফাঁকা বাসায় ডাকা, ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো ইত্যাদি কাজগুলো ঠান্ডামাথায় করা হয়েছে। বিকৃত যৌনাচারের আকাক্সক্ষা পরিপূর্ণ করার জন্য বিকৃত মানুষেরা ঠান্ডামাথায় পরিকল্পনা করতে পারে। কয়েক মাস আগে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে একজন নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন করা হয়। কয়েকজন তরুণ এ কাজে অংশ নেয়। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, একজন নারীকে বিবস্ত্র করা হয়েছে। তরুণরা তার স্তনে আঘাত করছে। দুই পা জোরপূর্বক দুই দিকে সরিয়ে নারীটির যৌনাঙ্গে টর্চের আলো ফেলে দেখছে। সেখানে একটি লাঠি প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এগুলোও যৌনবিকৃতি। এ রকম বিকৃত যৌনাচারের ঘটনা প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো স্থানে ঘটছে। এ-জাতীয় ঘটনা কি দিন দিন বাড়ছে? কেন বাড়ছে? এ প্রশ্ন দুটোর উত্তর খোঁজা জরুরি। বয়ঃসন্ধিতে মানুষের শরীরে যৌন হরমোনের মাত্রা বাড়তে শুরু করে। এর প্রভাবে দেহ ও মনে মোহময় পরিবর্তন ঘটে। দিন যায়, মায়ামন্ত্রের প্রভাব বাড়তে থাকে। সাধারণত বিপরীত লিঙ্গীয় মানুষ পরস্পরের দিকে আকৃষ্ট হয়। ক্রমান্বয়ে আকাঙ্খা বাড়ে। প্রতি অঙ্গ কাঁদে প্রতি অঙ্গ লাগি। চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে দুজনের শারীরিক মিলন।
প্রজাতিকে বহমান রাখতে প্রকৃতির মনোহর কৌশল এটি। সমাজ দুজনের মিলনকে সমসাময়িক নৈতিকতা ও আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে। এই প্রক্রিয়া কতোটা মানবিক এবং কতোটা মানবিক নয়- সে আলোচনার জায়গা এটি নয়। তবে সুস্থ যৌনতা সুতীব্রভাবে মানবিক ও সুন্দর। যৌনবিকৃতি হলো অসুন্দর, বর্বর এবং বিনাশী। যৌনবিকৃতি কেন ঘটে? একটি শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশের প্রক্রিয়ায় ভারসাম্যহীনতা বা অসম্পূর্ণতা তৈরি হতে পারে। সে স্থানটি যৌনতার বিকৃত উপাদান বা কনটেন্ট দ্বারা প্রতিস্থাপিত হলে, শিশুটির মধ্যে যৌনবিকৃতি দেখা দেয়। আমাদের সমাজে বিপুলসংখ্যক মেয়ে ও ছেলেশিশু যৌননিপীড়ন এবং বিকৃত যৌনাচারের শিকার হয়। এসব শিশুর মধ্যে পরবর্তী সময়ে যৌনবিকৃতির ঝুঁকি বেড়ে যায়। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে শিশু-কিশোরদের কাছ থেকে যৌনতাকে পরিপূর্ণভাবে আড়াল করে রাখা হয়। পাঠ্যপুস্তকে যৌনশিক্ষার কিছু বিষয় থাকলেও প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পুরোটা পড়ানো হয় না। স্বাভাবিক যৌনতা ও যৌনবিজ্ঞান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভে তারা বঞ্চিত হয়। শিশু-কিশোরদের সামনে যৌনতাকে ‘খারাপ’ বলে চিত্রিত করা হয়। তারা শিখে নেয় যৌনকর্মের আরেক নাম ‘খারাপ কাজ’। অন্যদিকে টেলিভিশন, নাটক, সিনেমা ইত্যাদিতে যৌনতার ইঙ্গিতবহ অনেক কিছু শিশু-কিশোর-তরুণেরা দেখে। কিছু সিনেমায় খোলাখুলি যৌনতা দেখানো হয়। এখনকার দিনে ইন্টারনেটের পথ বেয়ে পর্নো ছবি, ভিডিও বা মুভি কিশোর-তরুণদের হাতের স্মার্টফোনে অতি সহজেই চলে আসে। নিষিদ্ধ আনন্দে তাদের শিহরণ জাগে। একাকী অথবা কয়েকজন মিলে তারা এগুলো দেখার আয়োজনে মশগুল হয়। এসব পর্নোতে স্বাভাবিক যৌনতা থাকে না, থাকে বিকৃত যৌনাচারের রমরমা আয়োজন। এগুলোতে ধর্ষকাম, মুখকাম, পায়ুকাম, পশুকাম (পশুর সঙ্গে যৌনমিলন), অজাচার বা ইনসেস্ট ইত্যাদিসহ যাবতীয় সব বিকৃত বিষয় থাকে। এই পর্নোর প্রভাবে কিশোর-কিশোরী তরুণ-তরুণীর মনোজগতে ব্যাপক ভাঙনের ঢেউ জাগে। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে নব অর্জিত নিষিদ্ধ আনন্দের লড়াই শুরু হয়। ঈষৎ সংক্ষেপিত। লেখক: শিশু অধিকার, স্বাস্থ্য অধিকার ও পরিবেশ কর্মী। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]