• প্রচ্ছদ » Uncategorized » এমপি পাপুল আর তাদের দোসররাই দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করে


এমপি পাপুল আর তাদের দোসররাই দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করে

আমাদের নতুন সময় : 31/01/2021

শরিফুল হাসান : কথায় কথায় আমরা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষণœ করার অভিযোগ শুনি। কিন্তু দেশে-বিদেশে কারা আসলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষণœ করে? একটা উদাহরণ শুনুন। গত বছরের ফেব্রæয়ারির ঘটনা। কুয়েতের আরবি দৈনিক আল কাবাস ও আরব টাইমসে খবর প্রকাশিত হলো, ল²ীপুর-২ আসনের সাংসদ কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের বিরুদ্ধে মানব পাচারের গুরুতর অভিযোগ। তাকে ধরতে অভিযান চালিয়েছে কুয়েত পুলিশ। বাংলাদেশের একজন সাংসদের বিরুদ্ধে এমন ভয়াবহ অভিযোগ, কোথায় রাষ্ট্র খোঁজ নেবে তা না করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, এমপির বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগ ‘ফেক নিউজ (সূত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার, ১৬ ফেব্রæয়ারি ২০২০)।
অন্যদিকে কোভিডের সময় বিদেশ থেকে আসা প্রায় পাঁচশ প্রবাসীর বিরুদ্ধে ৫৪ ধারায় অন্তত পাঁচটি মামলা করেছে রাষ্ট্র। গৎবাঁধা সেই পুরনো অভিযোগ, ‘তারা বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষণœ করেছে। কোয়ারেন্টিনে থাকা অবস্থায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষণœ করার জন্য সলাপরামর্শ করছিলেন। পুলিশ গোপন সূত্রে ওই সলাপরামর্শের খবর জানতে পেরেছে। ভবিষ্যতে তাদের বাংলাদেশে অপরাধে জড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। জনগণের জানমালরে নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। তাদের মধ্যে ভিয়েতনাম ফেরত ৮১ জন বাংলাদেশিও রয়েছেন যারা মানব পাচারকারীদের হাতে প্রতারিত হয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের কর্তাব্যক্তিরা তখন বলেছিলেন, তারা বাংলাদেশ দূতাবাস দখল করতে গেছে। অবশ্য দুদিন আগে গত ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশের হাইকোর্ট ভিয়েতনাম ও কাতার ফেরত ৫৪ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি খারিজ করে দিয়েছে। কিন্তু এর আগে এই প্রবাসীদের তিন থেকে চারমাস এই প্রবাসীদের জেলে থাকতে হয়। পুলিশ থেকে শুরু করে তদন্তকারী কর্মকর্তা, দূতাবাস সবাই জানতো এই বাংলাদেশিরা নিরপরাধ। কিন্তু তারপরেও নীরহ এই প্রবাসীদের মাসের পর মাস জেলে থাকতে হয়েছে। আর যেই সাংসদের বিরুদ্ধে অভিযোগকে ফেক নিউজ বলা হয়েছিলো ২৮ জানুয়ারি সেই সাংসদকে দোষী সাব্যস্ত করে চার বছরের কারাদÐ দিয়েছেন কয়েতের আদালত। পাশাপাশি ল²ীপুর ২ আসনের ওই সাংসদকে ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার বা ৫৩ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অবশ্য মানবপাচার ও অর্থ পাচারের আরও দুটি মামলা এখনও চলমান। দেখা যাক সেগুলো রায় কী হয়। তবে এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে কারা আসলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষণœ করলো? মানব পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত একজন সাংসদ, নাকি বিদেশে প্রতারিত সাধারণ মানুষ? কোনো সন্দেহ নেই, একজন সাংসদের বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগ ওঠা, তার গ্রেফতার, তার সাজা পুরো বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষণœ করেছে। কারণ শুধু বাংলাদেশের ইতিহাস নয় বিশ^জুড়ে এমন ঘটনা নজিরবিহীন। এখন প্রশ্ন হলো এমন একজন লোক সাংসদ হলেন কী করে? জনশক্তি রপ্তানিকারক ও ল²ীপুরের স্থানীয় মানুষজনের কাছ থেকে যতোটুকু জেনেছি, ১৯৮৯ সালে একটি প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার (শ্রমিকদের তত্ত¡াবধায়ক) হিসেবে চাকরি নিয়ে কুয়েত যান পাপুল। ১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত দখলের কারণে তিনি দেশে ফিরে আসেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পাপুল আবার কুয়েতে যান। এরপর মারাফি কুয়েতিয়া গ্রæপ অব কোম্পানির নামে তিনি জনশক্তি রপ্তানি ব্যবসা শুরু করেন। মূলত এই ব্যবসা থেকেই কোটি কোটি টাকা আয়। আর এই আয় যখনে অনেক বেশি হয়ে গেলো তখন তার খায়েশ জাগলো সংসদে যাওয়ার এবং বাংলাদেশে যে টাকা দিয়ে সংসদ সদস্যের পদ কেনা যায় সেটা প্রমাণ করলেন তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, শহিদ ইসলামকে এলাকার লোকজন আগে সেভাবে চিনতো না। শুধু টাকার জোরেই ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে হঠাৎ করে ল²ীপুর-২ আসনের (রায়পুর-ল²ীপুর সদরের আংশিক) মনোনয়ন পেয়ে যায় শহিদ ইসলাম। এই মনোনয়নের ঘটনা তদন্ত করলেই বাংলাদেশের রাজনীতির আরেক চিত্র বেরিয়ে আসবে। ওই নির্বাচনে ল²ীপুর-২ আসনটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মহাজোটের শরিক এরশাদের জাতীয় পার্টিকে (জাপা) ছেড়ে দেয়। জাপার মনোনয়ন পান আগের বারের সাংসদ মোহাম্মদ নোমান। কিন্তু মনোনয়ন পেলেও তিনি নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে দাঁড়ান যদিও তার প্রতীক ছিলো। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি থেকে চিঠি দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী পাপুলের পক্ষে কাজ করার জন্য দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলেন, পাপুল কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতি না করলেও নির্বাচন পরিচালনা কমিটি থেকে জাতীয় নির্বাচনের আট দিন আগে ল²ীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে একটা চিঠি পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়, ‘আপনাদের জানা আছে যে শহিদ ইসলাম পাপুল আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিত নেতা ও সক্রিয় মাঠপর্যায়ের কর্মী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বৃহত্তর স্বার্থে এই আসনের বিজয় দলের পক্ষে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এইলক্ষ্যে তাকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে নির্বাচন কমিশনকৃত তার প্রতীকে বিজয়ের পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি।’ অভিযোগ আছে, এই মনোনয়ন পেতে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সবাইকেই বিপুল পরিমান টাকা দিয়ে ম্যানেজ করেছিলেন শহিদ ইসলাম পাপুল। কারও কারও মতে তিনি অন্তত ৫০ কোটি টাকা খরচ করেছিলেন। শুধু যে নিজে এমপি হয়ে তেলেসমতি দেখিয়েছিলেন শহীদ ইসলাম তাই নয়, স্ত্রী সেলিনা ইসলামকেও একইভাবে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে সংরক্ষিত আসনে সাংসদ বানান তিনি। এখন জানা যাচ্ছে, বিপুল পরিমান এই টাকার উৎস ভিসা বাণিজ্য ও মানব পাচার। টাকা থাকলে যে এমপি পদটাও কেনা যায় সেটাই প্রমাণ করেছিলেন শহীদ। মানব ও অর্থ পাচারের অভিযোগে শহিদকে গত বছরের ৬ জুন রাতে তার কুয়েত সিটির বাসা থেকে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করে। আর গতকাল একটি মামলার রায় হলো চার বছরের জেল। এখন প্রশ্ন হলো, দেশের ভাবমূর্তি তাহলে ক্ষণœ করলেন কারা? নিশ্চয়ই একজন সাংসদ। একইভাবে যারা তাকে টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন দিলেন, সংসদে নিয়ে গেলেন, যারা তার স্ত্রীকেও সাংসদ বানালেন তারা কী দেশের ভাবমূর্তি ক্ষণœ করেননি? মানবপাচার ও অর্থ পাচারের এসব ঘটনায় কুয়েতের ফৌজদারি আদালত বাংলাদেশের সাংসদের পাশাপাশি সে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মাজেন আল জারাহকেও চার বছরের সশ্রম কারাদÐ ও ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার জরিমানা করেন। প্রভাবশালী ওই জেনারেল বাংলাদেশের সাংসদকে অনৈতিকভাবে ব্যবসা পরিচালনায় মদদ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। অবশ্য কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত আবুল কালামের বিরুদ্ধেও সাংসদ পাপুলকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ ছিলো। ২০১৬ সালের ব্যবসায়ী ও চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালামকে চুক্তিতে কুয়েতের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিয়েছিলো সরকার। চট্টগ্রাম দক্ষিণ আওয়ামী লীগের তৎকালীন সহ-সভাপতি কালাম চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতিও ছিলেন। রাষ্ট্রদূত হয়ে তিনিসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা শহিদ ইসলামকে মদদ দেন বলে অভিযোগ ওঠে। কিন্তু মেয়াদ শেষে তাকে ফিরিয়ে আনা ছাড়া তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা শোনা যায়নি। অথচ অভিযোগ সত্য হয়ে থাকলে রাষ্ট্রদূতও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষণœ করেছেন। শহিদ ইসলাম পাপুল
২০১৮ সালে নির্বাচনী হলফনামায় দেখা যায়, ওই সময়েই পাপুল ও তার স্ত্রী সেলিনা ইসলাম সোনাদানাসহ প্রায় শত কোটি টাকার অর্থসম্পদের মালিক। তবে দুদক বলছে, প্রদর্শিত এই অর্থসম্পদের বাইরেও শহিদ ইসলাম ও তার স্ত্রী সেলিনা ইসলামের বিপুল অর্থসম্পদ আছে দেশ-বিদেশে। দুদক ইতিমধ্যেই অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ১৪৮ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে একটি মামলা করেছে। পাপুল- সেলিনা দম্পতিসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুদকের করা ওই মামরায় ২ কোটি ৩১ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ১৪৮ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার পর পাপুলের স্ত্রী, কন্যা ও শ্যালিকার দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। সাংসদ পাপুল যে শুধু তার স্ত্রী-কন্যার নামে সম্পদ গড়েছেন তাই নয়, দুদকের অনুসন্ধান বলছে, তার শ্যালিকা জেসমিনের পাঁচটি ব্যাংক হিসেবেও ১৪৮ কোটি ৪২ লাখ টাকার তথ্য মিলেছে। অথচ ২৩ বছর বয়সী জেসমিনের নিজস্ব কোনো আয়ের উৎস নেই। বিভিন্ন ব্যাংকে জেসমিনের প্রায় ৪৪টি হিসাব পাওয়া গেছে। একটি ব্যাংকেই তার ৩৪টি এফডিআর হিসাব রয়েছে। এ ছাড়া পাপুলের মেয়ে ওয়াফা ইসলামের নামে ৪১টি এফডিআরে দুই কোটি ২৯ লাখ টাকাসহ মোট ২৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা জেসমিন প্রধানের একটি ব্যাংকের হিসাবে লগ্নি করে ২৫ কোটি ২৩ লাখ টাকার ওভার ড্রাফট সুবিধা গ্রহণের প্রমাণ মেলে। দুদক বলছে, অবৈধ পথে অর্জিত বিপুল অর্থ বৈধ হিসাবে দেখাতে শ্যালিকা জেসমিনের মালিকানায় ‘লিলাবালি’ নামের একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলেন এমপি পাপুল। ওই প্রতিষ্ঠানের আড়ালে জেসমিন প্রধানের পাঁচটি ব্যাংক হিসেবের মাধ্যমে ২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পাচার করা হয় ১৪৮ কোটি টাকা। এই পরিমাণ টাকা হস্তান্তর, রূপান্তর ও স্থানান্তরের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধে এমপি পাপুল, তার স্ত্রী ও সন্তান এবং শ্যালিকার বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুদক। লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। বার্তা ২৪




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]