‘জীবনে কিছু পাবো না রে…’

আমাদের নতুন সময় : 01/03/2021

প্রবর রিপন : পূর্বের গায়কের প্রতি একজন নতুন গায়কের ভালবাসা শুধু তার জন্মদিন, মৃত্যুদিন উদযাপন নয়, লোক দেখানো প্রশংসা বাক্যের আতশবাজি ফুটানোও নয়। তার প্রতি ভালোবাসা হলো; কীভাবে সে তার পূর্বতন গায়কের হৃদয়ের তরঙ্গ থেকে নৃত্যপর অনুভূতিকে তার নিজের হৃদয়ে তরঙ্গায়িত করতে পেরেছে, কি শিখতে পেরেছে সেই বিগত আগ্নেয়গিরির মত হৃদয় থেকে। সেদিন একজন আমাকে জিজ্ঞেস করছিলো ‘আপনি যে গান গেতে গেতে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন, আমার বিস্ময় লাগে আপনার চোখ দিয়ে কান্না বের হলেও কন্ঠ সুরের বাইরে চলে যায় না, এটা আপনি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন? আমি তাকে বললাম, আমি এটা শিখেছি আজম খানের কাছ থেকে, যার চেয়ে এতো হৃদয় দিয়ে বাংলায় আরও কারো গান গাইতে শুনিনি! প্রতিটি শব্দ আর গানের বোধ এতোটা ভালবেসে কাউকে গাইতে শুনিনি, যেনো এ সেই মহীরুহ যার নিজেকে পৃথিবীর কাছে প্রকাশ করার জন্য হৃদয়ের বৃন্তে গানফুল ছাড়া আর কিছু নেই, যে গানই সে গায় না কেনো, সে গান কারো ভালো লাগুক বা না লাগুক কেনো, তার গায়কীর হৃদয়গ্রাহী তীব্রতার কারণে অন্যরা মোহে আচ্ছন্ন হতে বাধ্য। এমন গায়কী পৃথিবী থেকে দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, কেননা এই সভ্যতা জর্জরিত পৃথিবীতে হৃদয় সেই প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসর যা বিলুপ্ত হয়ে, তার মর্মান্তিক ফসিল ঝুলে আছে প্লাস্টিক মোড়ানো কোনো যাদুঘরে, আর মানুষ টিকেট কেটে দেখছে নিজের বিলুপ্ত হৃদয়।
এই যে শশ্মানের মতো, ভাগাড়ের মতো পৃথিবীতে এই কয়েক দশক আগেও গানের ভেতর এক অগ্নিময়ী এক পৃথিবী, আকাশময় পাখিদের কলোরল ছিলো তা এখন আর নেই, যেনো এক কফিনের দীর্ঘশ্বাস হয়ে গেছে। কারণ তখনকার গায়কেরা বিশ্বাস করতো গানের চঞ্চুতে পৃথিবীকে নরক থেকে স্বর্গে তুলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, আর সেই শক্তি অবশ্যই একজন শিল্পীরই থাকে, আর এখনকার গায়কেরা বিশ্বাস করে এই বিশাল অস্ত্রাগারের মত পৃথিবীর বিপরীতে গান কিচ্ছুই করতে পারে না, তাই বরং আমরা যতো প্রেম-ফ্রেমের সনাতন গান পদ্ধতিতে নিজেদের খ্যাতি বাড়াই, আর পকেট ভরি মৃতদের শেষ নিঃশ্বাসের মতো মুদ্রায়। আমি সেই সময়ের গায়ক যখন গায়কেরা তাদের ফলোয়ারদের রুচিকে ফলো করা, যেটা বব ডিলানের ক্ষেত্রে কোনো ভাবেই কল্পনা করাও সম্ভব নয়। আর এই ফলো আর ফলোয়ারের ফলাফলে এখন খুব কম গায়কই আছে যাদের আলাদা ভাবে চেনা যায়, বাজার কাটতির জন্য যে গায়ক হিট হচ্ছে বাকিরা তাকে অনুসরণ করে এক সঙ্গীতহীন অন্ধক‚পে পতিত হচ্ছে। আজম খান সেই গায়ক যে নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলার অসহায় অবস্থা দেখে গেয়ে উঠছে ‘হায় আমার বাংলাদেশ’, এ যেনো শুধু কোনো গায়ক নয়, সব মানুষের সেই কন্ঠস্বর যে তার নিজের রক্তের অপচয়ে বিলাপ করছে আর চুল ছিঁড়ছে, সন্তান হারিয়ে উন্মাদ হয়ে ওঠা এক মায়ের মতো। স্বাধীনতার জন্য যে যুদ্ধ সে করেছিলো তার পরিণতি দেখে এভাবে গান কয়জন গাওয়ার সাহস করেছিলো? আর এটা তো সেই গাইতে পারে যে নিজে যুদ্ধে গিয়েছিলো।
বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে সবচেয়ে সফল ও প্রভাবশালী শিল্পমাধ্যম কিন্তু বাংলা রক সঙ্গীত, সেটা সামাজিক, অর্থনৈতিক সব ভাবেই, আজম খানের আগে অন্যরা এর সাথে জড়িত থাকলেও আপামর জনসাধারণের কাছে এই রক সঙ্গীত নিয়ে যাওয়ার পুরোধা ব্যক্তি কিন্তু এই আজম খান, আমাদের সময়ে যারা পাইরেসির কথা বলে গান গাওয়া নিয়ে নিস্পৃহ হয়ে পড়ে, বিদেশ চলে যায়, তারা একবার ভাবুন, তিনি যে সময় রকগান গেয়েছে সে সময় রকসঙ্গীতকে অপসংস্কৃতি বা এন্টি-ক্ল্যাসিকাল মিউজিক বলে বয়োজ্যোষ্ঠরা নাকচ করে দিতো, আমি শুনেছি কনসার্টে গেলে সে স্টেজে উঠলে তাকে নিয়ে উপহাসও করতো, এমন সময়ের গায়ক হলে আমরা কি করতাম। এর কোনকিছুই তাকে দমাতে পারেনি, কারণ সে জানতো রকসংগীত কোনো বিদেশি সঙ্গীত নয়, এটা পৃথিবীর তারুণ্যের সঙ্গীত, যা আইনস্টাইনের পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রের মতোই, যা পৃথিবীর সবার প্রয়োজন, আর আমরা তো এখন দেখতে পাই, এই একমাত্র রকসঙ্গীতই পৃথিবীর সব দেশের ফোকসঙ্গীত বা জনতার লোকের সঙ্গীত হয়ে উঠতে পেরেছে, নিজের প্রয়োজনেই সব দেশের তারুণ্য তাকে নিজের করে নিতে পেরেছ, যে রক সঙ্গীত কোনো সাদা উপনিবেশবাদীদের সঙ্গীত নয়, যার জন্ম কালোদের নিপীড়িত আত্মার অন্ধকার থেকে, সেই আফ্রিকার বেদনাভূমি থেকে, যেখান থেকে মানুষ বেরিয়ে পড়েছিলো পৃথিবীর পথে সেই আদিম সময়ে । প্রিয় গায়কদের সাথে না দেখা করার এক দারুণ অসুখ আছে আমার, আমি বরং গানের মুগ্ধতা নিয়েই দূরে থাকতে চাই, তাই আজম খানের সাথে আমার কখনো দেখা করা হয়নি। অনেকের কাছে শুনেছি তার সম্পর্কে, কেমন মিশুক সে, কেমন অহংকারহীন মানুষ,যার কোনো স্টারডম নেই, বাংলা রকের আদিপুরুষ হয়েও কেমন এই মুহুর্তের সাথে মিশে আছে এক লাজুকলতার মতো, বাচ্চাদের সাথে ক্রিকেট খেলে, স্কুলে গিয়ে তাদের পড়াশোনার খবর নেয়, রাস্তাঘাটে যখন তখন দেখা যায়। আসলে সেই তো মানুষের গায়ক, যাকে খুব সাধারণ মানুষের মতো মানুষের ভীড়ে দেখা যায়। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও যার কোনো দুঃশ্চিন্তা ছিলো না বলে, কোনো সঞ্চয় করেনি, যাকে তার প্রিয় জাতি আগামীতে বিদায় দেবে এক দুঃস্থ শিল্পীর অমর্যাদায়। এটা সেই জাতি যারা শিল্পীকে শুধু ভালবাসতে জানে তার মৃত্যুর পরে মেকী কান্নায়। এসব কি সে জানতো না? একটি জাতির সবচেয়ে সংবেদনশীল আত্মা কেনো এসব টের পাবে না? অবশ্যই সেই জানতো, কিন্তু সবার প্রতি ভালোবাসায় এসব উপেক্ষা করে গেছে, খুব নিভৃত জীবনযাপন করে লুকিয়ে রেখেছিলো সব গুপ্ত অভিমান, অথবা তার অভিমান আর বাকি ছিলো না, সেই কবেই তো গেয়েছিলো ‘হায় আমার বাংলাদেশ’
এবার আসি আমার আজম খানের শোনা সবচেয়ে প্রিয় গানের কথা, শুধু তার কেনো, শুধু বাংলা গানের ভেতর প্রিয় গান কেনো, পৃথিবীর গানের ইতিহাসে আমার অন্যতম প্রিয় গান ‘জীবনে কিছু পাবো না রে’। এই কর্পোরেট শকুন সময়ে যখন উন্নতমানের দাস বানানোর জন্য কৃত্রিম সফলতার কালোযাদুতে মানুষকে বশীভূত করা হচ্ছে, আর যেমন সফল না হতে পারাতে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ছে নিজের মহাজাগতিক সত্ত¡াকে উপেক্ষা করে, কতো মানুষ আত্মহত্যা করছে এই দানব নির্ধারিত সফলতার মানদÐে উত্তীর্ন না হতে পেরে, সেখানে সবকিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সেই কতো আগের একজন গায়ক গেয়ে উঠছে ‘জীবনে কিছু পাবো না রে, ভুলে সে ভাবনা আহা’! কি সাহসি উচ্চারণ , কতোটা আত্মার শক্তিতে উদ্গিরিত আগ্নেয়গিরি। এমন সাহসী গান তো এখনো কাউকে আর গাইতে শুনি না, বরং কর্পোরেট শশ্মানে কেমন নিজেকে স্বেচ্ছায় পোড়াচ্ছে এই সময়ের গায়কেরা, ওই সব নকল কৃত্রিম মোটিভেশনাল স্পিচ এর দাসত্বের গানে। পাঁজরের ভেতর আজম খানের মতো অমন আদিম বুনো হৃদয় থাকলেই মনে এমন গান গাওয়া সম্ভব। যে জন্মেছিলো শুধু গানের জন্য, গানকে কোন স্পোর্টস কারে রূপান্তর করার জন্য নয়, যারই ফলাফল হিসেবে এখনো ভালোবাসা পাচ্ছে মানুষের।
আজম খান, আপনার মত গায়ককে ভালবাসা জানানোর শক্তি আমার মতো গায়কের নেই, তবু আমার গান আপনাকে ভালবাসে, আমার গান আপনার গান থেকে শিখে নেয় আদিম সেই ডাইনোসরের মতো হৃদয়ের তরঙ্গ, আমার গান আপনাকে এতো ভালবাসে যে, সবকিছুকে উপেক্ষা করে সেই প্রেমে সে নতুন গান হয়ে উঠতে চায়, সাহসী হতে চায় বুনোজন্তুর মতো, যারা ছিন্নবিচ্ছিন্ন করতে চায় সব প্লাস্টিক গানের কলের পুতুল। ভালোবাসা নিবেন বাংলা রকসঙ্গীতের আদিপুরুষ, যে একদিন নিস্তরংগ জনপদে একদিন ভিসুভিয়াসের মতো উগরে উঠেছিলো আর ধংস করেছিলো নীরবতার পম্পেই। লেখক পরিচিতি : কবি ও সঙ্গীত শিল্পী, সোনার বাংলা সার্কাস




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]