• প্রচ্ছদ » » বিভাজনের সূত্র, ভাষা এবং ‘রুদালি’ স¤প্রদায়


বিভাজনের সূত্র, ভাষা এবং ‘রুদালি’ স¤প্রদায়

আমাদের নতুন সময় : 03/03/2021

কাকন রেজা : সব কিছুতেই কিছু ‘ট্রাবল মেকার’ থাকেন। যাদের কাজ হলো বিশেষ মুহূর্তে ‘ট্রাবল’টা তৈরি করা। আপনার বুদ্ধিবৃত্তির কাজ হলো, ট্রাবলে’র মেকিং ও মেকারদের চিহ্নিত করা। যেমন এখন শব্দকে কেন্দ্র করে সা¤প্রদায়িক বিভাজনের চেষ্টা চলছে। খেয়াল করলে দেখবেন যখনই জাতীয় ঐক্য অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠে, তখনই কোথা থেকে যেনো সা¤প্রদায়িকতার উদ্ভব হয় এবং মানুষ বিভক্ত হয়ে যায়।
যখন শব্দকে ধর্ম দিয়ে বিভাজন করা হয়। বহুল ব্যবহৃত শব্দকে কেন্দ্র করে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা চলে। কেউ বিতর্ক তোলেন, তখন বুঝে নেবেন, এটা উদ্ভুত নয় তৈরি করা সমস্যা। মূল সা¤প্রদায়িকতা এদের দ্বারাই সৃষ্ট। পানি ও জল বাংলাদেশে সমান্তরালে চলে এসেছে কখনো কোনো সমস্যা হয়নি, হচ্ছে না। যখন হবে, তখন বুঝবেন সেই তৈরির পেছনে উদ্দেশ্য রয়েছে। আর সমস্যা তৈরি করার এই কৌশলটা খুব নি¤œমানের এবং পুরনো। মুশকিল হলো আমাদের এখানে এই কৌশলটা খুব খেটে যায়। না খাটলে শব্দ নিয়ে বিতর্ক উল্টো উপেক্ষিত হতো, আলোচিত হতো না। দুর্ভাগ্য আমাকেও সেই আলোচনায় জড়াতে হচ্ছে।
ভারতের মৃত বাড়িতে কাঁদার জন্য ভাড়াটে এক স¤প্রদায় রয়েছে। ‘রুদালি’ নামের এই স¤প্রদায়ের লোকজনকে ভাড়া করা হয় শোক প্রকাশের জন্য। যে যতো জোরে কাঁদতে পারে, তার পয়সা ততো বেশি। মজার ব্যাপার হলো, এই স¤প্রদায়টি কিন্তু একরকম ‘অচ্ছ্যুৎ’ সেখানে। সেই স¤প্রদায়ের সাথে বিয়ে-শাদি কিংবা উৎসবে অংশগ্রহণ চলে না অন্যদের। আমাদের এখানেও এই স¤প্রদায়টি রয়েছে ভিন্নরূপে। তারা চিৎকার চেচামেচি করে সমস্যা সৃষ্টি করবে। অহেতুক, অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টির প্রয়াস চালাবে। প্রতিষ্ঠিত বিষয়কে বিতর্কিত করবে। তবে ‘রুদালি’দের সাথে আমাদের এই স¤প্রদায়টির পার্থক্য হলো তারা ‘অচ্ছ্যুত’ নয়। বরং তারা ‘অভিজাত’দের সাথে মিশে থাকে। অভিজাতদের সাথে তাদের সেক্স থেকে উৎসব সবই চলে।
প্রশ্ন করতে পারেন, ওখানের রুদালি স¤প্রদায় আর আমাদের কথিত ‘অভিজাত বুদ্ধিবৃত্তিক’ সমাজের মধ্যে অবস্থানগত পার্থক্য কী। না, আপাতত সুহ্ম দাগে কোনো পার্থক্য নেই। তবে মোটা দাগে পার্থক্য হলো, আমাদের কথিত ‘অভিজাত বুদ্ধিবৃত্তিক’ সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো। তাদের বেশিরভাগই বাড়ি-গাড়িওয়ালা মানুষ। আর ‘রুদালি’রা দরিদ্র ও দুঃস্থ। আর দরিদ্র ও দুঃস্থ বলেই তারা ‘অচ্ছ্যুৎ’, ধনী বলেই আমাদের ‘ওনারা’ সম্ভবত ‘অচ্ছ্যুৎ’ নন। অবশ্য তার সাথে যুক্ত হয়েছে সামাজিক অবস্থানের বিষয়টিও। আপনার বুদ্ধিবৃত্তির কাজ হলো এই ‘রুদালি’দের চিহ্নিত করা এবং উপেক্ষা করা। আপনি যদি কুতর্কের জালে জড়িয়ে যান, তাহলেই তাদের উদ্দেশ্য পূরণ হয়। মূল বিষয়টিকে ছাপিয়ে কুতর্কটি প্রতিষ্ঠা পায়। তারাও চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়’তে চকচকে হয়ে ওঠেন। তাদের চকচকে আর দৃশ্যমান করা নিশ্চয়ই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এই যে, কেউ কেউ ‘শহিদ মজলুম’ এসব নানা শব্দের উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করতে চাইছেন, এসব শব্দও তো মুসলিম বা বিদেশী। তারা সম্ভবত বিষয়টির গভীরে না গিয়েই এমনটা করছেন। কথা পরিষ্কার, ভাষার বিষয়ে প্রমাণের কিছু নেই। ভাষা নিজ ধারাতেই সমৃদ্ধ হয় বিভিন্ন শব্দ গ্রহণ করে। মুসলিম বা বিদেশী শব্দ বাছতে গেলে কম্বল উজাড় হবে। যেমন ভারতের তালেবররা যে গান-বাজনার অহঙ্কার করেন, তার মূল খোঁজ করতে গেলে দেখা যাবে, বীনা আর নাল ছাড়া আর কোনো বাদ্যযন্ত্র ভারতীয়দের ছিলো না। এমন কী বহুল আলোচিত বাঁশিটাও না। রাগ-রাগিনী যা, তাও সব ধার করা। এখন যদি বলা হয়, ধার করা সব বাদ, তবে অবস্থা কী দাঁড়াবে? শব্দের অবস্থাও অনেকটা তাই। বিভিন্ন শব্দের সমন্বয়ে ভাষা তৈরি হয়। আর সে সব শব্দ আসে অন্য ভাষা থেকেই।
হুমায়ূন আহমেদ হযরত আলী থেকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ‘তোমরা মূর্খদের সাথে তর্ক করতে যেওনা, সে তোমাকে তার পর্যায়ে নামিয়ে দিবে এবং তার অভিজ্ঞতা দিয়ে তোমাকে হারিয়ে দিবে।’ বুদ্ধিমানদের হৈচৈ মানায় না। সুতরাং এসব কুতর্ককে মূর্খের আলাপ ভেবে উপেক্ষা করুন। উপেক্ষার চেয়ে বড় আর কোনো অস্ত্র নেই। লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]