বিস্মরণের অভয় আশ্রম

আমাদের নতুন সময় : 03/03/2021

প্রবীর বিকাশ সরকার : ভারতবর্ষের ইতিহাসের সঙ্গে ত্রিপুরা রাজ্যের কুমিল্লা নানা ভাবেই অবিচ্ছেদ্য। প্রাচীনকাল, মধ্যযুগ এবং আধুনিকালেও কুমিল্লায় যে সকল বিখ্যাত মানুষ জন্মেছেন এবং অনেক মহান কাজের মাধ্যমে ভারতকে বিশ্বের কাছে উজ্জ্বল করেছেন তার তুলনা খুঁজে পাওয়া কঠিন। কুমিল্লার মানুষ বরাবরই সাহসী, দূরদর্শী এবং সৃজনশীল। কিন্তু শিক্ষাবিতৃষ্ণ আর ইতিহাসবিমুখ। তার গৌরবোজ্জ্বল, শিক্ষণীয় ইতিহাসের সে যতœ নেয় না। এক ময়নামতি প্রতœস্থানে গেলেই এই জেলার অতীত মানুষদের চিন্তার প্রতিফলন দেখলে অবাক না হয়ে পারা যায় না। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল প্রাচ্যের মস্তবড় অহংকার। সেই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ছিলেন ত্রিপুরাস্থ চান্দিনার বৌদ্ধ পÐিত শীলভদ্র। এই ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন ঈশ্বর পাঠশালা বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, রামমালা গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক এবং মহেশাঙ্গন ট্রাস্টের অন্যতম প্রধান ট্রাস্টি স্বনামধন্য বৌদ্ধ পÐিত, গবেষক ও লেখক ইন্দ্রকুমার সিংহ স্যার। অনেক বছর আগে তিনি শীলভদ্রকে নিয়ে ইংরেজিতে লিখে একটি প্রবন্ধ আমাকে পাঠিয়েছিলেন ‘মানচিত্রে’ প্রকাশ করার জন্য। কিন্তু কী কারণে যেন লেখাটি আর প্রকাশ করতে পারিনি। খুঁজলে দালিলপত্রের মধ্যে পাওয়া যাবে। খুব মূল্যবান একটি প্রবন্ধ।
বাঙালি জাতি শিক্ষামুখী নয়, নয় অনুসন্ধিৎসু। ইতিহাস তার কাছে বিতৃষ্ণ একটি বিষয়। অনেক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগ নেই! এটা কী ভাবা যায়! অথচ এই জাতির হাজার বছরের অনেক-অনেক বিস্ময়কর ঘটনা আছে, আছে ইতিহাস কিন্তু সেগুলো নিয়ে আমরা কোনো গবেষণা করি না, জানার চেষ্টা করি না, বিশে^ ছড়িয়ে দেবার ইচ্ছেও আমাদের নেই। বহির্বিশ্বে বহু বাঙালির আজ বসবাস অথচ ক‘জন সঠিকভাবে বাংলার ইতিহাস পাঠ করেছেন সেই প্রশ্ন করা অবান্তর হবে না। নিজের দেশের গৌবরোজ্জ্বল ইতিহাস না জানার কারণে আমরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি না, মাথা উঁচু করে চলতে পারি না, ম্রিয়মাণ হয়ে থাকি, অবনত হয়ে থাকি। অথচ দেখা যায় বিদেশিরা আমাদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছেন।
এই যে নিজেকে না জানা, নিজের জনগোষ্ঠীকে না জানা, দেশকে না জানা সর্বোপরি জাতির ইতিহাসকে না জানা কত বড় বোকামি তা আর না বললেও চলে। এই যে জাপানে কমপক্ষে বিশ হাজার বাঙালি বসবাস করছেন তাদের ৫০ জনও জানে না জাপানের সঙ্গে বাঙালি জাতি বা বাংলাদেশের কী সম্পর্ক? আমাদের সঙ্গে জাপানিদের যে ঐতিহাসিকভাবে একাধিক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান তা না জানার কারণে কোথাও তারা কথাও বলতে পারে না! অথচ আমি সেই ইতিহাস জানি বলে জাপানিদের সামনে দাপটের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলি। তারা অবাক হয়ে যান আমার কথায়! তাদের প্রবীণ অনেকেই আমাদের জাতির অনেক ঘটনা সম্পর্কে জানেন, অথচ আমরাই জানি না। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের একাধিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক জাপানে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন, ডক্টরেট করছেন কিন্তু জানেন না দেশ সম্পর্কে কিছুই যা বললে পরে জাপানিরা চমকে যেতে বাধ্য!
আমরা বইয়ের পাতা বা মুদ্রিত ছেঁড়া কাগজে পা লাগলে তুলে নিয়ে মাথায় ছোঁয়াই-এর চেয়ে বড় প্রতারণা ও ভÐামি জগতে আর দ্বিতীয়টি নেই। এই দৃশ্য বাংলাদেশের হাটেবাজারে দেখে অনেক বিদেশিকে আমি হাসতে দেখেছি। সেই হাসিটা যে সঙ্গত তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। অর্থাৎ বাঙালির নানা ভÐামি সহজেই যে হাসির উদ্রেক করে সে সম্পর্কে আমরা মোটেই সচেতন নই। সে এক অদ্ভূত ব্যাপার! এর পেছনে মূল যে কারণ, সেটা শিক্ষার প্রতি অবহেলা, শিক্ষকের প্রতি অবহেলা। শিক্ষককে না খেয়ে মরতে হয়, ঘুষ খেতে হয়, থাপ্পড় খেতে হয়, দাবিদাওয়া নিয়ে সারা বছর আন্দোলন করতে হয়, রাজনীতিককে সালাম দিতে হয়, সন্ত্রাসীকে বসার জন্য নিজের আসন ছেড়ে দিতে হয় যে দেশে সে দেশটির নাম বাংলাদেশ। এমন দেশটি আর কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি হে বাঙালি। কবিবর দ্বীজেন্দ্রলাল রায়ও খুঁজে পাননি।
জাপান থেকে কুমিল্লায় ফিরলে তো বটেই, এমনকি আমার ছাত্রজীবনেও প্রায়শ যেসকল স্থানগুলোতে আমি গিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতাম তার মধ্যে অভয় আশ্রম অন্যতম। পুরনো অভয় আশ্রমটি আমার বাসার কাছেই। আর পরবর্তীকালে যেটা স্থানান্তরিত হয়েছে সেটাও আমার কাছে খুব পরিচিত। পুরনোটির অবস্থা যাচ্ছেতাই। ভবনটি পরিত্যক্ত। কেউ সেখানে পা রাখে না। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালে এসেছিলেন। সেই ঘটনার একটি স্মৃতিফলকও সেখানে নেই। সুতরাং নতুন প্রজন্ম জানেই না এই ঘটনা বা প্রতিষ্ঠানটিকে।
শহরের অনেক ছাত্রকে, তরুণকে এমনকি বয়স্ক নাগরিককেও জিজ্ঞেস করেছি অভয় আশ্রম কোথায়? তারা আমতা আমতা করেছে। সঠিক করে বলতে পারেননি। সম্ভবত তারা তাদের জন্ম সম্পর্কেও জানেন কিনা সন্দেহ। ২০১৪ সালের মার্চ মাসে পরবর্তী সময়ে স্থানান্তরিত অভয় আশ্রমে গিয়েছিলাম বছর দুই পরে। ঘুরে ঘুরে দেখলাম। প্রধান কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললাম। কিছু প্রকল্প দেখালেন। হতদরিদ্র অবস্থা। জিজ্ঞেস করলাম, স্থানীয় লোকজন কি আসে এখানে? তিনি বললেন, না। তবে মাঝেমাঝে বিদেশিরা আসেন। গান্ধীভক্তরা আসেন। গান্ধী অভয় আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা তারা তা জানেন। জাপানিরাও এসেছেন।
বছর কয়েক আগে গান্ধীর এক প্রপৌত্রী দেখতে এসেছিলেন অভয় আশ্রম। আমি অবাক হয়ে গেলাম শুনে। জিজ্ঞেস করলাম, শহরের মানুষ কি তা জেনেছিল? তিনি উত্তর দিলেন, না। কুমিল্লার এই অভয় আশ্রম বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এখানে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। এর সঙ্গে কুমিল্লার বেশ কিছু বিখ্যাত মানুষ জড়িত ছিলেন। একসময় জমজমাট ছিল এর প্রাঙ্গণ, কর্মকাÐ। পাক আমলেও অবস্থা ভালো ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিভতে শুরু করেছিল এর আলো, সেই ধারা ক্রমশ ঘনীভ‚ত হচ্ছে। স্বাধীনতা আমাদের অনেক কিছু হরণ করেছে বললে কী অপরাধ হবে? বাঙালি জানে না, যে সংস্কৃতির মধ্যেই তার জাতির আসল পরিচয়, রাজনীতিতে নয়, অশিক্ষায় নয়, স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে নয়, সা¤প্রদায়িক চেতনার মধ্যেও নয়। বাঙালি জানে না, সে আসলেই বাঙালি কিনা? লেখক : কথাসাহিত্যিক ও রবীন্দ্রগবেষক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]