• প্রচ্ছদ » » জননন্দিত, জননায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ভাষণের দিন হয়ে উঠেছিলেন রাষ্ট্রনায়ক


জননন্দিত, জননায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ভাষণের দিন হয়ে উঠেছিলেন রাষ্ট্রনায়ক

আমাদের নতুন সময় : 07/03/2021

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিলো ১৮ মিনিট ৩১ সেকেন্ডের। ভাষণটি তার জীবনের সংক্ষিপ্ততম কিন্তু শ্রেষ্ঠতম। কারণ এই ভাষণের মধ্যদিয়েই জাতি ক্রান্তিকালে একটি দিকনির্দেশনা পেয়েছিলো। ৭ মার্চের আগেই বাঙালির মনে অনেক দ্বিধা ও দ্ব›দ্ব ছিলো। এই দ্বিধা এবং দ্ব›দ্ব ভবিষ্যৎ নিয়ে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে তাদের করণীয় কী সে ব্যাপারে দিকনির্দেশনার প্রয়োজন ছিলো। সেই দিকনির্দেশনাটাই এসেছিলো ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যদিয়েই।
৭ মার্চের ভাষণটি দেওয়ার জন্য যখন বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠছিলেন তখন সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজার কাছ থেকে একটি বার্তা এসেছিলো। সেই বার্তায় বলা হয়েছিলো, বঙ্গবন্ধু যদি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তাহলে পাকিস্তানের কামান, গোলাবারুদ ও যুদ্ধবিমান তৈরি রয়েছে, যা ব্যবহার হবে। অর্থাৎ সরাসরি হুমকি দেওয়া হলো বঙ্গবন্ধুকে। এর আগে ৬ মার্চ ইয়াহিয়া খান ফোনে বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতা ঘোষণা না করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। স্বাধীনতা ঘোষণা করা হবে এমন একটা গুজব ছিলো বাতাসে। আর সেই সময় চার ছাত্রনেতা, যারা চার খলিফা নামে অভিহিত ছিলেন, তাদেরও একটা চাপ ছিলো যেন বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাদের প্রচÐ চাপের মুখে বঙ্গবন্ধু একসময় তাদের ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘যে দেখ, তোরা বেশি চাপাচাপি করবি না। শেখ মুজিব জানে কখন কী বলতে হবে, কখন কী করতে হবে।’ এরপর থেকে আর চার ছাত্রনেতা এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর ওপর কোনো চাপ প্রয়োগ করেননি।
৭ মার্চ ভাষণের জন্য বেশ কয়েকটি খসড়াও তৈরি করা হয়েছিলো। বঙ্গবন্ধু শেষ মুহূর্তে বেগম মুজিবের কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তিনি কী বলবেন? বেগম মুজিব উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তোমার পেছনে বন্দুক, সামনে জনতাÑ কাজেই তুমি বিবেচনা করে দেখবে, কী বলা উচিত।’ অর্থ্যাৎ চারদিক থেকে নানাবিধ চাপের মধ্যে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু যখন তিনি ভাষণ দিলেন, দেখা গেলো তার কথাগুলো তৎকালীন পরিস্থিতিতে এর চেয়ে উন্নততর কোনো ভাষণ হতে পারে না।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণে দুটি অংশ ছিলোÑ প্রথম অংশে তিনি পাকিস্তানের নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে গণতান্ত্রিক নিয়মনীতির মধ্যে থেকেই কথা বলেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, (বোঝা যায় তার ভাষণ থেকে) যে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক সংকট নিরসন হোক। এ জন্যই তিনি চারটি শর্ত উল্লেখ করেছিলেন। [১] যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের ব্যাপারে বিচারবিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। [২] সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে। [৩] সামরিক শাসন প্রত্যাহার করতে হবে। [৪] নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা দিতে হবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু জানতেন যে, পাকিস্তানি সামরিক চক্র বা ইয়াহিয়া খান এই শর্তগুলো মানবে না। সে কারণেই তিনি বাঙালিদের করণীয় কী তা নির্ধারণ করে দিলেন ভাষণের দ্বিতীয় অংশে। দ্বিতীয় অংশের একটি কেন্দ্রীয় বক্তব্য আমরা উদ্ধৃত করি সবসময়। সেটা হলোÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ লক্ষ্যণীয়Ñ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার আগে মুক্তির কথা বলেছিলেন এবং মুক্তির কথা আরও দুবার উচ্চারণ করেছেন তিনি। যেমন তিনি বলেছেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, আরও রক্ত দেবো, তবুও এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশা আল্লাহ।’ আরেকটি জায়গায় তিনি বললেন, ‘বাংলার মানুষ তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি চায়।’ সুতরাং বুঝতে অসুবিধা হয় নাÑ শুধু স্বাধীনতা নয়, বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির স্বপ্নই দেখেছিলেন। স্বাধীনতা মুক্তির মধ্যে নিহিত থাকে, কিন্তু মুক্তি স্বাধীনতার চেয়েও অনেক বড় ব্যাপার।
স্বাধীনতা অনেকটা তাৎক্ষণিক বিদেশি শাসনমুক্ত হলেই একটি ভ‚খÐ স্বাধীন হতে পারে, কিন্তু মুক্ত না-ও হতে পারে। মুক্তির সংগ্রাম তাই অনিঃশেষ। যেমন বাংলাদেশ এখনো মুক্তির স্বাদ পরিপূর্ণভাবে পায়নি, স্বাধীন ঠিকই হয়েছে। এই যে তিনি স্বাধীনতার কথা বললেন, তা অর্জিত হবে একটি সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই সে কথাও স্পষ্ট করলেন এবং সেই সংগ্রামটি হবে গেরিলা পদ্ধতিতে, তাও বলা হলো। উপরন্তু তিনি যেন দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছিলেন, যে চ‚ড়ান্ত মুহূর্তে তিনি হয়তো উপস্থিত থাকবেন না যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবে এবং হয়েছিলোও তাই। যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো ২৫ মার্চ রাত থেকেই তখন তিনি প্রায় অনুপস্থিত, কারণ তিনি গ্রেপ্তার হয়ে যাচ্ছিলেন। এবং সে জন্যই তিনি ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি, তাহলে তোমরা সবকিছু বন্ধ করে দিবে’। ২৫ মার্চ রাতে শেষ প্রহরে গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই তিনি স্বাধীনতার বাণীটি রেকর্ড করেছিলেন, যা ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে এম এ হান্নানের কণ্ঠে সম্প্রচারিত হয়েছিলো সারদিন। সেই বাণীতে তিনি বলেছিলেন, ‘সম্ভবত এটাই আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’ লক্ষ্যণীয়Ñ ৭ মার্চ পরোক্ষভাবে তিনি ইংগিতময় ভাষায় স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সরাসরি স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করেননি, যা ছিলো অত্যন্ত কৌশলগত এবং বিচক্ষণতার পরিচায়ক। যার মধ্যে দূরদৃষ্টিও ছিলো বটে। কারণ তিনি যদি ওই মুহূর্তে স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন, তাহলে অনিবার্যবশত নেমে আসতো পাকিস্তানিদের বোমাবর্ষণ আর গুলিবর্ষণ। রেসকোর্সে রক্তস্রোত বয়ে যেতো। অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতো আমাদের স্বাধীনতার প্রয়াস। কাজেই বঙ্গবন্ধু তার বাচনিকশৈলীর মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিলেন চমৎকারভাবে, বিচক্ষণতার সঙ্গে। কিন্তু যখন বাঙালি আক্রান্ত হলো সেই সময় তিনি সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলে তা হতো বিচ্ছিন্নতাবাদ। কারণ আন্তর্জাতিক আইনে এমন ঘোষণাকে বলা হয়, একপক্ষীয় স্বাধীনতা ঘোষণা। এমন ঘোষণা হলে গোটা বিশ্ব জনমত বাঙালিদের বিরুদ্ধে চলে যেতো। বঙ্গবন্ধু চিহ্নিত হতেন বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে। কিন্তু তিনি ভাষণের মধ্য দিয়ে এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে গেলেন, যার ফলে সেই সময় মনে হয়েছিলো যে, আমরা যা শুনতে চেয়েছিলাম, বাঙালি যা প্রত্যাশা করেছিল তা পেয়েছে বা শুনেছে। পাকিস্তানও অনেকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল যে, স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়নি। তার ফলে জননন্দিত, জননায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন হয়ে উঠেছিলেন রাষ্ট্রনায়ক। মনে রাখতে হবে, ভাষণটি ছিলো স্বতঃস্ফ‚র্ত, যার পূর্বপ্রস্তুত কোনো খসড়া ছিল না। সম্পূর্ণ অবলীলাক্রমে ১৮ মিনিট ৩১ সেকেন্ডের মধ্যে বলে গিয়েছিলেন তিনি। বাঙালির জন্য যা ছিলো অনুকরণীয় দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ। পরিচিতি : ইতিাহসবিদ।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]