• প্রচ্ছদ » » জাতির জনকের সাত মার্চের ভাষণ রাজনীতির মহাকাব্য


জাতির জনকের সাত মার্চের ভাষণ রাজনীতির মহাকাব্য

আমাদের নতুন সময় : 07/03/2021

ড. আতিউর রহমান

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আসলে রাজনীতির এক মহাকাব্য। এটি বঙ্গবন্ধুর এক অনবদ্য ও নান্দনিক সৃষ্টি। এই ভাষণের মধ্যে নন্দনতত্ত¡ যেমন আছে, সাহিত্যিক রস আছে, নান্দনিক বিচক্ষণতা আছে এবং একইসঙ্গে গণমানুষের জন্য তার যে অঙ্গীকার, সবকিছুই আছে। সে কারণে এই ভাষণটি বাঙালির এক ঐতিহ্যের ক্ষণ। পুরো জাতিকে এখনো এই ভাষণটি মুক্তির স্বপ্নে জাগিয়ে রেখেছে। সেদিনের সেই ভাষণটি আমাদের চিরদিনের সম্পদ। এখনো সমান প্রাসঙ্গিক। কারণ এর মধ্যে যে মুক্তির কথা আছে সেই মুক্তিটা শুধু রাজনৈকি স্বাধীনতা নয়। এখানে মানুষের চিরদিনের বহুমাত্রিক যে ম্ুিক্তর আকাক্সক্ষা সেটা প্রতিফলিত হয়েছে। শুধু আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের ম্ুিক্ত নয়, পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা প্রকাশ পেয়েছে এই ভাষণে। এই ভাষণটি আসলে বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রামের অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে যে স্বপ্ন জেগেছে সেই স্বপ্নটি একটি মাত্র আধার থেকে সেদিন প্রস্ফুটিত হয়েছিলো ৭ মার্চের এই ভাষণ থেকে। আমরা যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হতে যাচ্ছি সেটি গঠনের প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করেছিলো এই ভাষণ। একটি আগাম বার্তা দিয়েছিলো বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন দেশের অভ্যুদয় হতে যাচ্ছে। যদিও খুবই কায়দা করে তিনি একথাগুলো বলেছিলেন। কিন্তু জনগণ ঠিকই বুঝেছিলেন বাংলাদেশ স্বাধীন হতে যাচ্ছে। শত্রæরা বুঝতে পারছিলো না। কারণ তিনি কথাগুলো স্পষ্ট করে ওইভাবে বলেননি। খুব কৌশলে বঙ্গবন্ধু কথাগুলো বলে ফেলেছিলেন এবং এই ভাষণে তিনি ১৮ বার বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ এই শব্দ তিনটি উচ্চারণ করেছিলেন। এর থেকেই বোঝা যায় যে তিনি কী বলেছিলেন? কী চাচ্ছিলেন? এই ভাষণটি একটি রাজনৈতিক সাহিত্য একারণে যে এই ভাষণের বাক্যগঠন, বাক্যবিন্যাস, এখানে প্রমিত এবং প্রাকৃত শব্দগুলো মিলেমিশে যেভাবে একাকার হয়ে গেছে, যেভাবে শব্দের উচ্চারণ করেছেন, সেই উচ্চারণের যে ওঠানাামা, বিশেষ করে কোনো কোনো শব্দের ওপরে বাড়তি জোর এগুলোর মাধ্যমে ভাষণটি শুধু শ্রæতিমধুর হয়েছে তাই নয়, এটা আবেগঘন হয়েছে। এরকম ভাষণ আর কেউ দিতে পেরেছেন কিনা আমার সন্দেহ। একইসঙ্গে ভাষণটি ছিলো খুবই গতিময়। এর মধ্যে দ্রোহের আগুন যেমন ছড়াচ্ছিলো তেমনি মনে হচ্ছিলো কবিতার পঙতিমালা উচ্চারিত হচ্ছিলো। ভাষণে তথ্য ছিলো, উক্তি ছিলো, প্রশ্ন ছিলো, ছেদ ছিলো, বিষণœতা ছিলো, ন্যায়নিষ্ঠতা ছিলো, সংযম ছিলো এবং হুঁশিয়ারি উচ্চারণ ছিলো। একইসঙ্গে এতোগুলো বৈশিষ্ট্য একটি কবিতায় জায়গা করে নেওয়া বেশ কঠিন। কিন্তু এই রাজনৈতিক কবিতায় এতোগুলো বৈশিষ্ট্য আমরা দেখতে পাচ্ছি। একইসঙ্গে এই কবিতা পাঠের সময় তিনি যে তার দেহভঙ্গি, তর্জনী হেলনী, যেভাবে চারদিকে তাকানো, যেভাবে চশমাটা খুলে রাখা সবমিলিয়ে একটা নান্দনিক ব্যক্তিত্বের অভিব্যক্তি আমরা সেদিন দেখতে পেরেছিলাম।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন আজীবন গণতান্ত্রিক। সেজন্য তিনি বলতে পেরেছিলেন যদি একজন সদস্য এসে পাল্টা য্ুিক্ত দেয়, আমরা তার যুক্তি শুনবো। এই যে গণতান্ত্রিক মানসিকতা, সেই কারণে সারাবিশ^ তার ভাষণটিকে এতোটা গুরুত্ব দেয়। গণতন্ত্রের একেবারে সর্বোচ্চ প্রকাশ এই ভাষণে তিনি প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি বিরোধী যারা তাদেরও সম্মান করে কথা বলতেন। তিনি জানতেন ইয়াহিয়া খান, ভুট্টো এবং পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে এবং বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু তাদেরও তিনি সম্মানের সঙ্গে কথা বলেছেন। ইয়াহিয়া খান সাহেব, ভুট্টো সাহেব এসব কথা তিনি উচ্চারণ করেছেন। একইসঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে না জানিয়ে যখন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বন্ধ করে দিলেন তাতে যে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন সেটাও তিনি প্রকাশ করেছেন। প্রশ্ন করেছেন কী করে এটা সম্ভব হলো? আমরা কী অন্যায় করেছিলাম, কী পেলাম আমরা? এইভাবে তিনি প্রশ্ন করেছেন। ভুট্টো সাহেবের কথা রেখেছেন মেজরিটি পার্টিকে না জানিয়ে ইয়াহিয়া খান যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটাও যে গণতান্ত্রিক নয়, সেই প্রশ্নও তিনি করেছেন। তিনি অল্প সময়ের ভাষণে ২৩ বছরের বঞ্চনা ও অবিচারের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন এবং ৫২, ৫৪, ৫৮, ৬৬, ৬৯ এবং৭০Ñ প্রত্যেকটা মাইলস্টোনেকে স্পর্শ করেছেন। এই মাইলফলকগুলো স্পর্শ করে তিনি ১৯৭০ পর্যন্ত এসেছেন। ইতিহসের এতো সব অধ্যায় একটানে বলে ফেলে তারপরে তিনি বিশ্ববাসী ও জনগণকে বললেন, বাঙালির স্বাধীনতাই মূল লক্ষ্য। সেটা তিনি এভাবে বললেন, আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, দেশের মানুষের অধিকার চাই। এই অধিকার আসলে স্বাধীনতারই সমার্থক। তিনি আরও বললেন, ইয়াহিয়া খান বেঈমানি করে গোলটেবিল বৈঠক ডেকেছেন সেখানে তিনি যেতে পারেন না। শহীদের রক্তের ওপর পারা দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান আরটিসিতে যেতে পারে না। এই কথাটি জানিয়ে দিলেন। এর থেকেও বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পক্ষেই ছিলেন।
৭ মার্চে তিনি একটি অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একদিকে লাখ লাখ মানুষ তার সামনে যাদের গগণচুম্বী প্রত্যাশা। তারা যেকোনো মুহূর্তে স্বাধীনতা ঘোষণা আশা করছিলেন তার কাছ থেকে। বিশেষ করে তরুণরা মুহূর্মুহূ ¯েøাগান দিচ্ছিলো স্বাধীনতার পক্ষে। অন্যদিকে তারই পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলো পাকিস্তান সৈন্যরা। আকাশে ঘুরছিলো জঙ্গি বিমান। এমন পরিস্থিতিতে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা মাথা ঠাÐা রেখে এক ডিলে দুই পাখি মারতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রতিপক্ষ জানলো একরতফা স্বাধীনতা তিনি ঘোষণা করেননি। আর জনতা জানলো স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনো কিছুই তিনি মানবেন না। তাই সবাই খুশি। খুবই কৌশলের সঙ্গে তিনি চারটি শর্তজুড়ে দিয়েছিলেন সেদিন। যেমন, সামরিক আইনের প্রত্যাহার, সামরিক ব্যক্তিদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, নিরীহ মানুষকে হত্যার তদন্ত করা, জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এগুলো করলেই আমি বিচার করে দেখবো আমরা অধিবেশনে যাবো কী যাবো না। একেবারে স্পষ্ট করে বলেননি আমি যাবো। সুতরাং কথার মারপেচে শত্রæদের একেবারে ধরাশায়ী করেছিলেন। এরকম করে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইংগিত দিয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্যে আমাদের যে ইস্পাত কঠিন ঐক্য দরকার সেটা তিনি প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ৭ মার্চের পরে কীভাবে দেশ চলবে সেটার দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। আগামী দিনে যে মুক্তির সংগ্রাম আসছে সেখানে জনগণকেই যে মুখ্য ভ‚মিকা পালন করতে হবে তিনি তা পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন। গেরিলা যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন। বলেছিনে যে ঘরে ঘরে দূর্ঘ গড়ে তুলো। তার মানে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বললেন। বললেন গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে। কেননা তিনি শত্রæকে ভাতে মারবো, পানিতে মারবো এমন শব্দ চয়ন করলেন। যেটা জনমানুষের মুক্তিযুদ্ধের কথায় বা গেরিলা যুদ্ধে বলে।
তিনি গরিবের বন্ধু ছিলেন। তাই তিনি সেদিন বলেছিলেন যে হরতাল আমরা করছি সে হরতালে গরিবের যাতে কষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তিনি সেদিন বলেছিলেন গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে সেজন্য অন্যান্য যে সমস্ত জিনিসগুলো আছে সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, গরুর গাড়ি, রেল ও লঞ্চ চলবে। গরিব কর্মচারীরা ২৮ তারিখে যেয়ে বেতন তুলে নিয়ে আসবেন। একইসঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করবেন। এর থেকে ঝো যায় তিনি কতো বিচক্ষণ এবং সুদূরপ্রসারী নেতা ছিলেন। সেদিন জনতার মঞ্চ জনতার আদালতে পরিণত হয়েছিলো। জনতার কাছেই তিনি প্রশ্ন করছিলেন। জনতার কাছ থেকেই উত্তর নিচ্ছিলেন। আবার কখনো কখনো জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে প্রধান সেনানায়কের মতো তিনি জনগণকে হঠাৎ করেই তিনি তোমাদের পর্যায়ে নিয়ে এসেছিলেন, আপনাদের না বলে। মুর্হূমুর্হূ ¯েøাগানে তখন জনতা লাঠি দুলিয়ে সারা দিচ্ছিলেন। বলেছিলেন, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমরা যে যেখানে আছো, যে যেভাবে পারো, তোমরা যুদ্ধে নেমে পরবে। একজন সেনানায়কের মতো তখন তিনি বলছিলেন। মুক্তি এবং স্বাধীনতা শব্দ দুটিকে যেভাবে গায়ে গায়ে লাগিয়ে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন তাতেই বোঝা যায় তার অবস্থানটা কোথায়?
বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ভাষণের ওপর একটি লেখা লিখেছেন। লেখাটির নাম ছিলো ভাইয়েরা আমার। সেখানে তিনি বলেছেন, স্বাধীনতা শব্দটি বুকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধু যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন তা দেশের মানুষ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে বিজয় অর্জন করেছিলেন। শোষণ বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিলো। শোষণ বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার যে আকাক্সক্ষা তিনি সেদিন প্রজ্জ্বলিত করেছিলেন আমাদের সৌভাগ্য বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে সেই আকাক্সক্ষা আমরা এখন পূরণ করছি। আজকে শুধু আমরা মুজিববর্ষ পালন করছি তাই না। আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি। বঙ্গবন্ধুকন্যার হাত ধরে বাংলাদেশে অভাবনীয় সব পরিবর্তন এসে গেছে। আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়ন করছি, এটা চালিয়ে যাবো কারণ ৭ মার্চ আমাদেরকে যে রাষ্ট্র গঠন করতে বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই গরিব মানুষের রাষ্ট্র, সাধারণ মানুষের কল্যানের রাষ্ট্র, সেটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তারই কন্যা। এই প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখতে হবে। এটিই হবে ৭ মার্চের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক। সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখাটি লিখেছেন আমিরুল ইসলাম




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]