• প্রচ্ছদ » » সাত মার্চ, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার আগাম ভাষণ


সাত মার্চ, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার আগাম ভাষণ

আমাদের নতুন সময় : 07/03/2021

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : আজ ইতিহাসের মহান দিবস, যেদিন স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, সংগঠক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওর্দী উদান) লাখ লাখ জনতার উদ্দেশ্যে এমন এক ভাষণ প্রদান করলেন, যা ২৩ বছরে তার লালিত স্বপ্নের প্রকাশ ঘটান, ১৯ মিনিটের কালজয়ী ভাষণের মাধ্যামে। ভাষণটি শুধু সম্মুখের লাখ লাখ মানুষকেই নয় গোঠা সাড়ে সাত কোটি উজ্জীবিত জনতাকে তাদের স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে করণীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। গোটা জাতি তখন একজন নেতার মুখ থেকে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে পাওয়ার কথা শোনার অপেক্ষায় ছিলো। বিশেষ ১ মার্চ তারিখে ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বন্ধের যে ঘোষণা দিয়েছিলেন তার প্রতিক্রিয়ায় গোটা জাতি একদফা তথা স্বাধীনতার বাইরে আর কিছুতেই পাকিস্তানের সঙ্গে থাকার কথা ত্যাগ করে। বঙ্গবন্ধু সেদিন জনগণের অনুভ‚তি বুঝতে মোটেও ভুল করেননি। তিনি তো এমনই একটি জাতিগত ঐক্যের প্রতিক্ষায় ছিলেন, সেই ঐক্য গড়ার রাজনৈতিক ক্ষেত্র তিনি স্বাধীনতার নেতা হিসেবে র্দীঘদিন থেকে গড়ে তুলে ছিলেন। ১ মার্চ তিনি আন্দোলন সংগ্রামকে চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে নেওয়ার জন্য প্রতিদিনের কর্ম সূচি ঘোষণা করলেন, যা জনগণকে স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুতি গ্রহণের শর্ত পূরণ করে। ওই দিনে তিনি চ‚ড়ান্ত কথা বলার জন্য ৭ মার্চ তারিখে রেসকোর্স ময়দানে জনগণকে উপস্থিত থাকার আহবান জানান। ৭ মার্চের আগ পর্যন্ত ঢাকা এবং সমগ্র পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক হরতাল পালিত হলো, জনগণ রাস্তায় স্বাধীনতার পক্ষে ¯েøাগানে ¯েøাগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিলো, তৈরি করা হলো স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটি পতাকা, উত্তলনও করা হলো তাতে মানুষ সমর্থন জানাতে থাকলো আর একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ডাকে অহসহোযোগ আন্দোলন স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে প্রদেশব্যাপী পালিত হতে থাকলো। পূর্বাঞ্চলের প্রশাসন, ব্যাংক আর্থিক কর্মকাÐ বেতার-টিভি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সবই চলছিলো বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা মোতাবেক।
পাকিস্তান কার্যত এই প্রদেশে অচল হয়ে গেলো। পাকিস্তানের শাসক শ্রেণি ও অনুগত সেনা এবং দু’একটি রাজনৈতিক দল পরিস্থিতিকে বল প্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার গোপন ষড়যন্ত্র করতে থাকে। সেই পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুকে ৭ মার্চ এমন কিছু বলতে হবে, করতে হবে যা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়েও স্বাধীনতার নিকটবর্তী প্রস্তুতিও ঘোষণা হিসেবে জনগণের কাছে প্রতিভাত হবে। কিন্তু কোনো অবস্থাতে পাকিস্তানিদের পাতা ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না, যার অজুহাত দেখিয়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী তাৎক্ষনিকভাবে ট্যাংক, কামান, বন্দুক নিয়ে নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাপিয়ে পড়তে না পারে। একইসঙ্গে আন্দোলনকে বিচ্ছন্নতাবাদী হিসেবে অবিহিত করে বিশ^জনমত নেতা শেখ মুজিবকে অভিযুক্ত না করতে পারে। রাষ্ট্র, রাজনীতির এমন এক সন্ধ্যিক্ষণে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণটি শুরু করলেন সেটি ছিলো তার দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রজ্ঞা থেকে লব্দ অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ ইতিহাসের পরম সত্য কথা যা উপস্থিত জনতা মুহূর্মুহুর শব্দে সমর্থন জানাতে থাকলো, আবার পিনপতন নিরবতায় মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে থাকলো। অবশেষে স্বাধীনতার ইতিহাস গড়ার নেতা সু-কৌশলে বলে গেলেন কী করতে হবে, কী করা যাবে না, আবার ভাষণের ভাজে ভাজে দুবার উচ্চারণ করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তি সংগ্রাম, এবারে সংগ্রাম- স্বাধীনতার সংগ্রাম’।
আরও বললেন, ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রæর মোকাবেলা করতে হবে।’ প্রথম বক্তব্যটি শোনার সঙ্গে সঙ্গেই রেসকোর্স ময়দান উদ্বেলিত হয়ে ওঠলো, পরদিন বেতারে ভাষণটি সম্প্রচারিত হওয়ার সময় সাড়ে সাত কোটি মানুষ একইভাবে যার যার জায়গা থেকে সমর্থন জানিয়ে জয় বাংলা ¯েøাগান দিয়ে রাস্তায় নেমে পরে। উদ্বৃতির দ্বিতীয় অংশটি শুনে সবাই বুঝতে পেরেছিলো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার কিংবা হত্যা করার মতো বর্বোরচিত সিদ্ধান্তও হয়তো নিতে পারে। বঙ্গবন্ধু এমন পরিস্থিতিতেও জনগণকে তার ঘোষণার অপেক্ষায় না থেকে চ‚ড়ান্ত লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর এমন ঘোষণা স্বাধীনতার আগাম ঘোষণারই নামান্তর। আবার এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যেকোনো চরমপন্থাই গ্রহণ করুক না কেন, জনগণ যেন তাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে লড়াই করতে দেরী না করে। বস্তুত বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণে জনগণের মনের সব কথাই যেন স্পষ্ট করে বললেন। পাকিস্তানিদের জন্যও তিনি চারটি শর্ত এই ভাষণে উল্লেখ করে দিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নির্বাচিত নেতা হিসেবে তখন তার এমন কথা বলারই অধিকার ছিলো। সেই অধিকার ও দায়িত্ব তিনি ভাষণে প্রদর্শন করলেন। আমরা সকলেই জানি ইয়াহিয়া এবং ভুট্টো পরিস্থিতিকে এতোটাই নাজুক অবস্থায় এ দিন পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে এসেছিলেন যেখান থেকে তারা পেছনের দিকে ১ মার্চ পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাবেন কিনা সেই রাস্তা বঙ্গবন্ধু তাদের দেখিয়েদিলেন। তবে বঙ্গবন্ধু ভিশনারি-মিশনারি নেতা হিসেবে গভীরভাবে উপলব্ধী করতে পেরেছিলেন তারা সেই পথে হয়তো ফিরে যাবেন না কিন্তু দুনিয়া বলতে পারে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তো সেই দায়িত্বের তাদের এই রেসকোর্স ময়দানে তার উত্থাপিত চার দফার মধ্যেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং তাকে তো আর কোনো অবস্থাতেই ক্ষমতা গ্রহণের ব্যাপারে অনাগ্রহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা যায় না। কিন্তু যে তিনটি শর্ত দিয়েছিলেন সেগুলো তো সামরিক শাসকদের পক্ষে হজম করা মোটেও সহজ ছিলো না। এই পরিস্থিতিতে ঘটানা সম্মুখের দিকেই এগুবে, পেছনের দিকে নয়। ১০ মার্চ এর গোলটেবিল বৈঠক বাতিল হয়ে গেলো পাকিস্তান থেকে সব নেতারা ঢাকায় ছুটে এলেন কিন্তু সমাধান কেউ দিতে পারলেন না। কারণ সেটি ছিলো ইয়াহিয় ও ভুট্টোর কার্পেটের নিচে, যা ২৫ মার্চ রাতে বের করা হলো অপরাশেন সার্সলাইট নামে। কিন্তু ৭ মার্চ বঙ্গন্ধুর দেওয়া ঘোষণা অনুযায়ী জনগণ যার যা ছিলো তাই নিয়ে শত্রæর মোকাবিলায় নেমে পড়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার আগাম ভাষণ- ইতিহাসের এই সত্য কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। অনুলেখক : আব্দুল্লাহ মামুন




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]