মামুনুল এবং বৈপরীত্য

আমাদের নতুন সময় : 08/04/2021

নাসির উদ্দিন : অনুজ খায়ের। গত হয়েছে তিনমাস ছুঁই ছুঁই। কমবয়সী স্ত্রী ও তিন শিশুসন্তান তার। অল্পবয়সে বিধবা হওয়ায় পরিবার, জ্ঞাতি ও সমাজের সমবেদনা ‘আহা এই বয়সে মেয়েটা স্বামী হারালো, বাকি জীবন কি করে কাটবে’? ‘এই শিশুদের নিয়ে কিভাবে চলবে জীবন’? কিন্তু এই মানুষদের চাওয়া হচ্ছে জীবন যৌবন বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের নিয়েই থাকতে হবে স্ত্রীকে। এতেই তার নিজের এবং পরিবারের মানসম্মান ও সমাজের মঙ্গল। তাকে বুঝানো হচ্ছে ‘তুমি একজন মা, এই শিশুদের দিকে তাকিয়ে তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে’। কেউ কেউ তাকে বাড়ির বাইরে যেতে দিতেও নারাজ। পাছে যদি সে অসামাজিক(!) হয়ে পরে। কিন্তু ঘটনাটা উল্টো হলে, এতদিনে খায়েরের বিয়ে নিয়ে তোড়জোড় শুরু হতো। এই মানুষগুলোই বলতো, এ না হলে এই শিশুদের দেখভাল ও সংসার কীভাবে চলবে? এই বৈপরীত্যকে আমরা সভ্যতা ও মূল্যবোধ মেনে নিয়ে চলছি। এই সভ্যতা ভারত উপমহাদেশজুড়ে। এই সভ্যতার গোড়াপত্তন প্রাচীন ভারতীয় সনাতন সমাজে।
প্রাচীন হিন্দু সমাজে বিধবা বিয়ে নিষিদ্ধ ছিল। তখন ৭/৮ বছর বয়সেই অধিকাংশ বিয়ে হতো। ফলে ওই বয়সেই অনেকে বাল্য বৈধব্য বরণ করতে হতো। সন্তান থাক না থাক, সমাজ তাকে শিক্ষা দিত, নারীদের বিয়ে একবারই হয়। নারীর উচিত স্বামীর স্মৃতি বুকে নিয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়া। সদা সাদা কাপড়ে থাকা, সাজগোছ না করা, হাতের বালা চুরি ফেলে দেয়া, ঘোমটায় পর্দা করে চলা, মাথার চুল খুলে না রাখা, কপালে টিপ না দেওয়া, মাছ মাংস পরিহারসহ জীবনের সকল শখ স্বাদ আহ্লাদ ত্যাগ করা। এটাই ছিলো হিন্দু সমাজের নারীর নিয়তি। এতেই নারীর পাপমোচন ও মুক্তি।
বিধবা হলেই পিতা, ভাই বা শ্বশুর শ্বাশুড়ির সংসারে আত্মমর্যাদাহীন আসবাবপত্রের মতো নির্লিপ্ত জীবন মেনে নিতে হতো নারীকে। শরীরে প্রাণের অস্তিত্ব থাকলেও তাকে থাকতে হতো লাশের মতো। এই জীবন্মৃত নারীদের আমরা এখনো দেখি আমাদের সভ্য সমাজে। বিধবা বিয়ে এখন হিন্দু সমাজে আইনসিদ্ধ। যদিও প্রাচীন হিন্দু সমাজের সেই রীতি থেকে আমরা বেরোতে পারিনি। এতদঞ্চলের বড় অংশের মানুষ আমরা যারা হিন্দু ধর্ম থেকে বের হয়ে মুসলমান হয়েছি তারা এখনো হিন্দুদের সেই সভ্যতাকেই আঁকড়ে আছি।
হিন্দু সমাজের প্রথানুযায়ী বিয়ে মানেই দুজন নর নারীর শরীর বৃত্তীয় ব্যাপার। বিয়ে মানেই দুজন নর নারীর এক দেহ, এক প্রাণ হয়ে আমৃত্যু বেঁচে থাকা। এই দর্শনের ভাবনা হচ্ছে, ভালবাসা কখনও ভাগ হয় না। সত্যিকারের ভালবাসায় এক পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকা অসম্ভব। এজন্য একসময় সহমরণ বা সতীদাহ প্রথারও প্রচলন ছিল। এখনো অনেক সমাজে স্বামীর অপূর্ণতা দুর্ঘটনা মৃত্যুর জন্য স্ত্রীকে অপয়া মনে করা হয়।
কিন্তু ইসলামের পিতৃভূমি আরব সমাজে বিয়ের ধারনা ছিলো এর বিপরীত। সেখানে বিয়ে মানে সামাজিক বন্ধন। বিয়ে মানে অভিভাবকত্ব, নিশ্চয়তা। নারী ও শিশুদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। এজন্য আরব সমাজে নারী পুরুষ একে অপরের সাথে ঘর বাঁধতে বয়স বাধা হয়না। বয়সে বড় কিংবা ছোট, সধবা কিংবা বিধবা, কোনটাই বিয়ের ক্ষেত্রে সমস্যা বলে মনে করা হয় না।
নারী বিধবা হলে যে কোনো পুরুষ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারে। বরং যে নারীর বেশি বিয়ে হয় মধ্যপ্রাচ্যে সেই পাত্রীর কদর বেশি। কারণ সেখানকার সমাজের ধারণা হচ্ছে, যে নারীর বেশি বিয়ে হয় সেই নারীর হয়তো বিশেষ গুণ রয়েছে। যে কারণে বেশি পুরুষ তাকে পছন্দ করেছে। নারীরাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ধনাঢ্য পুরুষকেই বেশি পছন্দ করে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা নেই এমন পাত্রকে কেউ পছন্দ করে না। আবার পিতার অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিয়ে সেখানে পাত্রকে বিবেচনা করা হয় না। বিয়ের মাধ্যমে সেখানকার সমাজ কার্যত একইসাথে একজন স্বামী এবং অভিভাবকও বাছাই করে থাকে। আর সন্তান থাকলে সেই সন্তানও পেয়ে যায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও অভিভাবকত্ব। ইসলামের বহু পূর্ব থেকেই সেখানে পুরুষদের বহু বিবাহের সমাজ ছিলো। যা এখনও বিদ্যমান। সমাজের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিত্তবানরা ১৫/২০ টা বিয়েও করে থাকে। মেয়েরাও ভালবাসা নয় বিত্তকেই জীবনের বড়ো প্রাপ্তি বলে মনে করে। আর বিত্তহীন কিংবা যাদের সামর্থ নেই তাদের ভাগ্যে বিয়েই জুটে না। ফলে সেসব দেশে লক্ষ লক্ষ যুবক ও তরুণী সারাজীবন অবিবাহিতই থেকে যায়। এজন্যই আমাদের দেশের নারীকর্মীরা সেসব দেশে গিয়ে অকাতরে যৌন নির্যাতনের কবলে পরে।
আমাদের ধর্মে বহু বিবাহ ও অন্যান্য নানাধরণের বিয়ের প্রথা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ ও পরিবারসমূহ হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে বহু বিবাহ মেনে নেয় না। বহু বিবাহের কথা উঠলেই সকলে নাক সিটকায়। একাধিক বিয়ে করা ব্যক্তির সমাজে কোনো মর্যাদা থাকেনা। সামাজিক দরবারে বিচার আচারে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তি আর গুরুত্ব পায় না, বরং অবজ্ঞা করা হয়। অর্থাৎ তার সামাজিক মর্যাদা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে যায়, এমনকি সন্তান ও পরিবারের কাছেও তার মর্যাদা নষ্ট হয়। বহুবিবাহকে মনে করা হয় এক ধরনের বৈধ লাম্পট্য।
আবার পাশ্চাত্য সভ্যতায় একাধিক বা বহুবিবাহের কোনো সুযোগ নেই। সেই সভ্যতায় একজন পুরুষ বা একজন নারী একজনের সাথেই বিবাহবন্ধনে বা সম্পর্কের বন্ধনে থাকে। একজনের সাথে সম্পর্ক থাকা অবস্থায় অন্যের সাথে সম্পর্ক করেনা। পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কের অবনমন হলে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে। ফলে তাদের মধ্যে অপ্রকাশ্য বা গোপন সম্পর্ক নিয়ে আমাদের মতো এতো টানাটানি দেখা যায় না। নরনারী স্বামীস্ত্রী সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিংবা জীবনের কোন না কোন সময় আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এমন প্রকাশ্য কিংবা গোপন অভিযোগ খুঁজে পাওয়া যাবে। আমরা আমাদের আশেপাশেও হরহামেশাই পরনারী, পরপুরুষ, পরকীয়া চর্চার আওয়াজ শুনে থাকি।
এই কথাগুলো বলার কারণ হচ্ছে আমরা কোথায় আছি সেটা বুঝার জন্য। আর বুঝে নিতে চাই মামুনূল হকের সত্যমিথ্যা নিয়ে মানুষের অবস্থানকেও। আমার মধ্যেও আমি দুটি ভিন্ন মানুষের বসবাস দেখি সর্বদা। যেখানে বসবাস আমার নিজস্ব একটা স্বত্ত¡া, আবার আমার বিশ্বাসের স্বত্ত¡া। এ দুই স্বত্ত¡ার নিরন্তর দ্ব›েদ্ব আমি আমার স্বকীয়তাকে হারিয়ে ফেলি বিশ্বাসের স্বত্ত¡ার কাছে। বিশ্বাসের এই স্বত্ত¡া আমাকে সত্য চিনতে এবং অনুধাবন করতে দেয় না। বরং মিথ্যাকেই আমি ধারণ করি। ফলে আমি প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে অভিন্ন নই। আমার এই অন্ধ বিশ্বাস কিংবা রাজনৈতিক বিশ্বাস আমাকে নিরন্তর মিথ্যাবাদী কিংবা আপেক্ষিক মিথ্যাবাদী করে ফেলে। আর পৃথিবীর ইতিহাস স্বাক্ষ, মানুষ কখনোই সত্যকে সহজে বিশ্বাস করে না। বরং পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষ সকল সময় মিথ্যাকেই সত্য জ্ঞান করে সত্যকে দুরে ঠেলেছে।
দেশে এখন মামুনুলের ইস্যুটি সবচেয়ে চর্চিত বিষয়। এর পক্ষ বিপক্ষে কিছু বলার নেই। সমস্যা হচ্ছে বিশ্বাসের জায়গায়। আমরা যারা ইসলামের কথা বলি কিন্তু হিন্দু সমাজের প্রাচীন প্রথাকে আঁকড়ে আছি, তারা ৫ হাজার বছরের প্রাচীন প্রথা ভেঙে সমাজে বহুবিবাহের চর্চাকে নিরঙ্কুশ করবেন কিনা এই সিদ্ধান্ত তারা নেবেন। কিন্তু এ নিয়ে সমাজে পুরুষদের বিদ্রোহ নেই। বরং অপচর্চা ও গোপন অসভ্যতা রয়েছে। ইসলাম কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের মতো বহুবিবাহ প্রথা এদেশে বহুল প্রচলন হলে বরং এদেশে নারী বিদ্রোহের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। এদেশের নারীরা বিশ্বাসী হলেও দ্বিতীয় তৃতীয় কিংবা চতুর্থ বিয়ের পারমিশন দেয়ার মতো উদারতা দেখাবেন তেমনটি মনে করার কারণ নেই।
একথা বলতে হয় যে, সোনারগাঁওয়ের কুখ্যাত রয়েল রিসোর্টে মামুনুলকে যারা হেনস্তা করেছে তারা অতি উৎসাহী ছিল। এক্ষেত্রে হেনস্তাকারীদের রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে। তারা মামুনুলকে শিক্ষা দিতেই এ কাজটি করেছে। তবে রয়েল রিসোর্টটি এ ধরনের অপকর্মের জন্য বিখ্যাত। এই ব্যবসার জন্য রিসোর্টটির সুনাম রয়েছে অবাধ যৌনাচারে বিশ্বাসীদের কাছে। ঘটনার নায়ক নায়িকা দুজনেই প্রাপ্তবয়স্ক। তারা নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে যৌনতা করতেই পারেন। এক্ষেত্রে অন্যদের আপত্তি অভিযোগের সুযোগ নেই। কিন্তু মামুনুলরাই-তো বরং এদেশে অবাধ মেলামেশার চরম বিরোধী এবং ফতোয়া দানকারী। শুধু তাই নয় একমাত্র চোখ ছাড়া হিজাব বোরখায় পুরো অঙ্গ ঢেকে মেয়েদের চলাফেরা নিশ্চিত করতে চায় তারা। মেয়েদের ক্লাশ ফোর ফাইভ পর্যন্ত পড়াশোনাই যথেষ্ট বলেও তারাই ফতোয়া দেয়। অথচ মামুনুলের মতো একজন স্বীকৃত আলেমকে এখন নিজের কর্মের ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে। ঘটনা ঢাকতে নতুন ঘটনা তৈরি করতে হচ্ছে। অথচ কোনো সাধারণ মানুষ যদি এমন ঘটনা ঘটাতো আর মামুনুল এর বিচারকের দায়িত্ব পেতো তখন ফতোয়া হতো তাৎক্ষণিক বিয়ে আর মেয়েকে হাজার দোররা। আর পুলিশের হাতে সাধারণ কোনো মানুষ আটক হলে ২৯০ ধারায় (পাবলিক নুইসেন্স এক্টে) মামলা হতো। এক্ষেত্রে একজন বিখ্যাত আলেম এবং একজন নেতা হওয়ায় রাষ্ট্রও তাকে অনুকম্পা করেছে। কিন্তু এই ঘটনার অন্তর্নিহিত সমস্যা হচ্ছে, সমাজ ও দেশের মানুষের কাছে মামুনুলরা পূজনীয়। মানুষের বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার মানুষরা যখন এমন অবিশ্বাসী কাজ করে তখন সমাজে অস্থিরতা ও অবিশ্বাস বাড়ে। ঘটনার যে ব্যাখ্যাই মামুনুল দিক, আমি নিশ্চিত মামুনুল এবং তার পরিবারের জন্য এই লজ্জার বোঝা অনেক বেশি। এরচেয়ে বড় শাস্তি আর নেই। যদিও রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে যার যার বিশ্বাস ও ব্যাখ্যার ধরণ আলাদা দেখা যাচ্ছে। ভাগ্যিস মামুনুলের সাইনবোর্ডের নাম আওয়ামী লীগ নয়। তাহলে এদেশে এতোক্ষণে ভ‚মিকম্প হতো। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]