নারীবাদ এবং ভিকটিমহুড কার্ড

আমাদের নতুন সময় : 20/12/2018

ইসরাত জাহান উর্মী

 

দ্যাখেন ভিকটিমহুড কার্ড খেলার যে নারীবাদ তারে আমি প্রথমেই ঘৃণা জানায়ে রাখতে চাই। বা একটু নরম করে বলি, ভিকটিমহুড কার্ড খেলা নারীবাদে আমার আপত্তি আছে। আমাকে এবং আমার মতো আরও কয়েকজনকে লোকে পছন্দ করে না। বেয়াদবের মতো বাঁকা বাঁকা কথা বলি। আমরা সুন্দর করে প্রেসনোটীয় অফিসিয়াল ভাষায় কথা বলতে পারি না। কিংবা সুন্দর করে কথা বলার দক্ষতা আমার নাই। আমার প্রফেশন জার্নালিজম, একটা নারীবাদ বিষয়ক শো করি, ফলে সেই দক্ষতা হওয়া উচিত ছিল। সেইখানে যতটুকু করার আমি আমার সততা এবং পরিশ্রম দিয়ে উতরানোর চেষ্টা করি। কতটুকু পারি সেইটা লোকে দ্যাখে।

এইখানে আমার কথা বলার প্লাটফর্মে আমি মেপে কথা বলতে অস্বীকার করি। এইসব কথা আপনার কাছে তিতা লাগতে পারে, লাগলে একমুঠ গুড় খায়ে নিয়েন, কিন্তু অযৌক্তিক লাগলে আওয়াজ দিয়েন। অথবা আমার বোঝার ভুল হইলে ধরায়ে দেন। ‘ভুল আমি কিছুতেই করি না, আমি কোন ভুল করিই না’- এই রকম ভাবনা ভাবাটা পুরুষতান্ত্রিক আচরণ। আমি সচেতনভাবে পুরুষতান্ত্রিক আচরণ থেকে নিজেরে মুক্ত রাখতে পেরেছি। তাই আমি সবসময় নিজের ভুল অকুন্ঠচিত্তে স্বীকার করি। আমাদের অশিক্ষিত, অভব্য এবং ব্যাডাগিরি দ্যাখানো সমাজ এই ভুল স্বীকাররে সবসময়ই দুর্বলতা ভাবে-কিন্তু তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি জানি আমি কি করছি।

যাই হোক যা বলছিলাম। ভিকটিমহুড কার্ড খেলা নারীবাদ। আচ্ছা আপুরা, দিভাইরা, আপ্পি সমাজ, মেয়েদের আন্টিরা- আপনারা বলেন তো, বুকে হাত দিয়ে বলেন, আপনারা সমতার মানে বোঝেন? আপনারা পূর্ণ স্বাধীনতা চান? আমি নিজেরেও প্রশ্ন করি, আমি কি চাই? পূর্ণ স্বাধীনতা? পুরুষের মতো আমারও হাত পা চোখ কান মেধা দক্ষতা যোগ্যতা ইত্যাদি ইত্যাদি আছে তাই আমি তার সমান-এই পপ্যুলিস্ট এবং পুরোন ভাবনা আমরা ভাবি বটে। কখনও কখনও চর্চাও করি। কিন্তু সেটা যতক্ষন আমরা আমাদের সুবিধাটুকু আই রিপিট সুবিধাটুকু আদায় করতে পারি ততক্ষন চর্চা করি। তারপর আর না।

একটা ঘটনা বলি এইখানে। উইম্যান চ্যাপ্টার পোর্টালটির শুরুর দিককার ঘটনা। ক্রিকেটার রুবেলের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ আনলেন হ্যাপি নামের একজন অভিনেত্রী। হ্যাপীকে যাচ্ছে তাই ভাষায় গালাগালি করা শুরু হলো। পুরুষতন্ত্রের অতি পরিচিত এবং ব্যবহৃত ‘বেশ্যা’ শব্দটি তার জন্য বরাদ্দ হলো সগৌরবে। রুবেল পাইলো বিরাট বীরের খেতাব। রুবেল খুব ভালো ‘প্লেয়ার’, ‘মাঠটারে খাট বানায়ে খেলে অথবা খাটটারে মাঠ’ ইত্যাদি রসিলা আলোচনায় সেসময়কার ফেসবুক মুখর। আর এদিকে হ্যাপি যথারীতি বেশ্যা। তো সেসময় উইম্যান চ্যাপ্টার তার লেখকদের কাছে লেখা চাইলো এই বিষয়ে। বা মতামত ধরনের কিছু একটা চাইলো। সবাই দিয়েছিল মতামত। আমিও। আমি দেখলাম সকলেই হ্যাপির প্রতি সিমপ্যাথির বন্যায় ভেসে গেলেন। যতদূর মনে পড়ে। সকলেই ‘হ্যাপির কি দোষ’, ‘হ্যাপী কি তার সাথে ঘটা অপরাধের কথা বলতে পারবে না?’ ‘এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কি হ্যাপির কথা শুনবে না’- এইরকম সব আবেগমথিত মতামত দিলেন। আমার স্মৃতি যদি ভুল না করে থাকে তবে এইরকমই ছিল প্রত্যেকটা লেখা।

তো আমার একটু অন্যরকম মনে হইলো। মনে হইলো, আচ্ছা, হ্যাপী কি শুধুই রুবেলকে ভালোবেসে রুবেলের কাছে গিয়েছিল? ভালোবাসা আসলে কি? প্রেমে প্রতারণাই বা কি? নারী-পুরুষ একে অপরের কি দেখে ভালোবাসে? রুবেল এমন কি রসগোল�া যে হ্যাপী তাকেই ভালোবাসলো? তাদের কি মনে মন মিলেছিল? তার নেম-ফেইম-মানী-এইসব হ্যাপী দেখে নাই তো? আমার মনে হয়, দেখেছিল। সেজন্যই রুবেল যখন বান্ধবী পাল্টালো বা হ্যাপিকে বিয়ে করতে চাইলো না-হ্যাপির মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়লো। মাথায় হিজাব পেঁচিয়ে সে মামলা করতে চলে গেল। দুজনে পারষ্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে একটা সম্পর্কে গিয়েছে-সেই সম্পর্ক ভেঙে গেলে আপনি কাঁদতে পারেন, অপমানিত হতে পারেন, অভিমান করতে পারেন, একান্তে এমনকি প্রেমিকের সাথে মারামারিও করতে পারেন-কিন্তু তাকে জোর করে বিয়ে করতে পারেন না। ‘বিয়ে’ তো একজন পূর্ণ স্বাধীন এবং সৎ নারীর ট্রাম্পকার্ড হইতে পারে না। বিয়ে করলে একজন নারীর কি উদ্ধার হয়? যদি জোর করে বিয়ে করেনও সেই বিয়ে আপনাকে কি দেবে হ্যাপি? আপনি ঠিক কি সম্মান পাবেন তার কাছ থেকে? না কি আপনি রুবেলের নেইম-ফেইম-মানি চান? আপনি নিজে একজন অভিনেত্রী- মন দিয়ে কাজ করলে এই নেইম ফেইম-মানি তো আপনিও কামাতে পারেন। তবে কেন বিয়ের জন্য বা প্রতারণার অভিযোগ এনে ‘আর কোন মেয়ের সঙ্গে যেন এমন না ঘটে’ এই দায়িত্ব আপনি নিচ্ছেন? আমি এরকম লিখেছিলাম। আমি লিখেছিলাম, আপনাকে বেশ্যা বলে গালি দেয়ার প্রতিবাদ আমি করি (যদিও এখন আমি মনে করি, বেশ্যা কোন গালি না) কিন্তু আপনার সাথে প্রতারণার যে ঘটনা ঘটছে সেইটা অর্ধসত্য এইটা আমি জোরগলায় বলতে চাই।

এখন বলেন, আমি কি রুবেলের পক্ষে গেলাম? রুবেল যে বিরাট হিরো হইলো সেইটারে আমি সাপোর্ট দিলাম? আর রুবেল কি আসলে একা হিরো হইলো? হিরো কি একা একা হওয়া যায়? না কি সমাজ তারে হিরো বানায়? আমাদের মনস্বত্ত্ব আসলে কি বলে? আমরা দুইজন মানুষের একান্ত বিষয়রে জাজ করার বাটখারা নিয়ে বসার আসলে কে?

এইটা হলো ভিকটিমহুড কার্ড খেলা। ‘ওগো তুমি আমার সাথে শুয়েচো তবে কেন আমাকে এখন ছেড়ে যাচ্ছো? নারীবাদের কারণে আমি জেনেছি শুইলেই আমার শরীর অশুচী হয় না কিন্তু তারপরও আমার কি হবে গো? তুমি তো বান্ধবী পাল্টাতে পারছো, আমি তো তোমাকে ভুলতে পারছি না।’

যাবতীয় হ্যাপী আপাগন, আপনি সৎ মানুষ ধরে নিলাম। আপনার প্রেম অমর প্রেম ঠিক আছে। আপনি পা ছড়ায়ে কাঁদেন অসুবিধা নাই কিন্তু প্লিজ যে যেতে চায় তারে জোর করে প্রেম দেবেন না, তারে পাবলিক শেমিং করে আল্টিমেটলি আপনার লাভের লাভ কিচ্ছু হবে না। আমি হইলে আমার যে চরিত্রহীন, বান্ধবী পাল্টানো বয়ফ্রেন্ড আমার সাথে থাকতে চায় না তারে একটা গাঢ় হাগ দিয়ে বলতাম, বাই বাই ভালো থাকো। বা তা না বলতে পারলে, গভীর অভিমান আর বেদনা নিয়ে একা একা শ্রিমঙ্গল বা নীলগিরি যায়া আঙুরের চোখের জল খায়া, কেঁদেকেটে, কাছের লোকেদের যথেষ্ট পরিমান যন্ত্রণা দিয়ে একসময় থামতাম। দেন নতুন প্রেমিক খুঁজতাম। কিন্তু কিছুতেই মামলা করতাম না অথবা এই প্রেমরে কাজে লাগায়ে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য অন্যকোন প্লট তৈরি করতাম না। কারণ আমার শয়তান প্রেমিক যতটুকু মানুষ আমিও ঠিক ততটুকুই মানুষ। আমি তার থেকে কোন অংশেই কম নই। আমি নিজেরে শিকার মনে করতাম না, আমি মানুষ-শিকারীর বন্দুকের তলের ঘাই হরীনি আপনি আমারে বানাইতে পারবেন না। পারবেন না।

ভিকটিমহুড কার্ড খেলার এই নারীবাদ থেকে আমরা বের হতে না পারলে চিরকাল ‘অবলা নারীদের পাশে দাঁড়ান ভাইয়েরা-বোনেরা’ টাইপ অবমাননাকর ম্যাসেজ লোকের ইনবক্সে ইনবক্সে আপনারে পাঠায়ে যাইতেই হবে। নিজেরে শিকার মনে করার অভ্যাসটা ছাড়তে শেখেন প্লিজ। আস্তে আস্তে শিখেন অসুবিধা নাই কিন্তু শিখেন।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]