দ্যা ‘কঠোর লকডাউন’ সাগা

আমাদের নতুন সময় : 14/04/2021

নিসার আহমেদ : দেশের অবস্থা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। লকডাউনটা কেন? করোনা? না হেফাজত? পাবলিক তার নিজের দল অনুযায়ী ভেবে নিচ্ছে। এবং সেটাই বিশ্বাস করছে। তা করুক। এই মুহূর্তের মিলিওন ডলার কোয়েসচেন হচ্ছে, হোয়াট’স নেক্সট। হেফাজত কি আবার উঠে দাঁড়াবে? না মামুনুলের সাথে সাথে এটা ‘হেফাজত সাগা’রও ইতি? হেফাজতের অন্যতম স্ট্রেন্থ হচ্ছে জুম্মার নামাজ পড়তে জরো হওয়া বিশাল মুসল্লির সমাবেশ। এই সময়ে আসা বিপুল সংখ্যক নামাজিকে কাজে লাগিয়ে তারা যেকোন অবস্থা তৈরি করতে পারে। বিএনপির মিছিল বা সমাবেশকে ডিএমপি দিয়ে যত সহজে ঘায়েল করা যায়, এটা সেভাবে পারা যায় না। এটা আটকাবার একটা রাস্তা হচ্ছে ফ্রন্টাল অ্যাটাক আর অন্যটা হচ্ছে ব্রাইব করা।
শাপলা ক্র্যাকডাউন থেকে সরকার ঐ পথে আর হাঁটেনি। কারণ এভাবে যুদ্ধ জিতলেও সিমপ্যাথি চলে যায় অন্যপক্ষের ঝোলাতে। অনেকদিন পরে আবারও একই ঘটনা ঘটল। বলাই বাহুল্য, এবারও তাই হয়েছে। যুদ্ধ জিতলেও, সতেরটা প্রাণ খুব সহজে আওয়ামী লীগের পিছু ছাড়বে বলে মনে হয় না। সবাই ভেবেছিল এরপরে আসছে, দ্যা ওল্ড ট্রাস্টেড সলিউশান, ‘রেলের জমি দান’ অর ব্রাইবারি। বাট দ্যা স্টোরি টুক অ্যা হোল নিউ টার্ন। এবার অন্য আরেকটা পথ বেছে নিয়েছে সরকার। ইনডিভিজুয়াল নেতাকে সাইজ করা। পরিক্ষিত ফর্মুলা। বিএনপিকে এভাবেই সাইজ করা গেছে। হেফাজতের ব্যাপারে এটা কাজ করবে কি না, সে নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ ছিল। নাশকতার মামলা, কিংবা বাসায় মদ পাওয়া, এধরনের কাহিনীতে হেফাজত ঘায়েল হবে কি না, সে নিয়ে সন্দেহ ছিল। বিশেষ করে শাপলা ইন্সিডেন্টের পরে যেভাবে রেলের জমি দান করে ব্যাপারটার একটা রফা হয়েছিল, তাতে মনে হয়েছিল, তেমনই কিছু একটা ঘটবে। খুব দ্রæত না হলেও, অদূর ভবিষ্যতে।
খুব বেশি অপেক্ষা করতে হল না। শফি সাহেবের হেফাজতের জন্য যে সলিউশান প্ল্যান করা হয়েছিল, তার রিপিটেশান হল না। মামুনুলের হেফাজতের জন্য অন্য সলিউশান অপেক্ষা করছিল। দারুণ মুখরোচক এই সলিউশান দিয়ে হেফাজতকে রীতিমত হতভম্ভ করে দেয়া হয়। আর সেই সাথে প্রমানিত হয়, ইনডিভিজুয়াল নেতাকে ঘায়েল করার পুরনো ফর্মুলায় হেফাজতকেও ঘায়েল করা সম্ভব।
এবার কাহিনীর অন্যদিকটার দিকে একটু তাকানো যাক। ‘মোদী আন্দোলন’টা নো ডাউট, বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। শুরুতে বেশ সফল আন্দোলনও মনে হয়েছিল। শুধু তা ই না, হেফাজতের কর্মকাÐে, সরকারকে অসহায় মনে হয়েছিল। যদিও হেফাজত কার জন্য আন্দোলনটা করল, সেটা আমার কাছে পরিষ্কার না। কারণ বাংলাদেশে অ্যান্টি মোদী আন্দোলন মানেই পশ্চিম বাংলায় গিয়ে মোদী সেটাকে অ্যান্টি মুসলিম সেন্টিমেন্ট জাগাতে ইউজ করবেন। আর সেটা করতে পারলেই মোদীর ভোটে আসবে জোয়ার। এই সমীকরণটা হেফাজতও যেমন জানত, সরকারও সেটা জানত। তাই, ব্যাপারটা যে মোদীকে হেল্প করার জন্য, এনিয়ে তেমন কোন সন্দেহ নেই।
এনিওয়ে, হেফাজতকর্মীরা যে আন্দোলনকে সফল আন্দোলন ভাবছিল, সেটা যে আসলে তাদের দিয়ে করানো হল, এটা বোঝার মত নেতা ওদের নেই। আর নেই বলেই ধরতে পারেনি মোদী আন্দোলনের এন্ডিং কি হতে যাচ্ছে। বুঝতে পারেনি কাহিনীতে একটা টুইস্ট আসন্ন। আসলে হেফাজত বাহিনীকে এই কাজের জন্য শাস্তি না দিলে, ব্যাপারটায় সরকারের সম্মতি প্রমাণিত হয়ে যায়। তাই দরকার ছিল হেফাজতকে মৃদু টাইট দেয়া। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা থাকলে কিংবা হেফাজতে বুদ্ধিমান কোন পরামর্শ দাতা থাকলে, আগেই আঁচ করতে পারত, আঘাত আসবে। আর মামুনুলের ঘটে কিছু গ্রে ম্যাটার থাকলে বুঝতে পারত, ধর্মীয় একটা ফিগার হয়ে এমন গোপন লাইফ লিড করা শুধু রিস্কি না, সুইসাইডালও। বিশেষ করে অপনেন্ট যখন আওয়ামী লীগ। তাদের নেতাদের আরও অনেক সাবধানে পা ফেলতে হত।
আগামী কিছুদিনের ভেতরেই আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। রিসোর্ট কাÐে টার্গেট কি শুধু মামুনুল ছিলেন, না উনার মাধ্যমে পুরো হেফাজত? এই প্রশ্নে হেফাজত সম্ভবতঃ পরের অপশানটা বিশ্বাস করছে। তাই, প্রাণপণে চাইছে মামুনুলকে বাঁচাতে। চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছে বুঝেও মামুনুলকে ডিফেন্ড করছে। তারা ভাবছে, মামুনুল শেষ মানে হেফাজত শেষ। জানি না শেষ পর্যন্ত হেফাজত কি সিদ্ধান্ত নেবে। মামুনুল যে এখন একটা লায়াবিলিটি, এটা হেফাজত যত দ্রæত বুঝবে, ততোই হেফাজতের জন্য মঙ্গল। যদি হেফাজতকে উঠে দাঁড়াতে হয়, তবে প্রথম যে কাজটা করতে হবে, তা হচ্ছে একজন স্বচ্ছ নেতা খুঁজে বের করতে হবে। মামুনুলের লসকে এই মুহূর্তে বড় মনে হলেও, সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু যদি, এই আঘাত হেফাজতের ওপর আঘাত ভেবে এখনো মামুনুলকে আঁকড়ে ধরতে চায়, তবে বেস্ট অফ লাক টু দেম।
ব্যক্তি স্বাধীনতা, ষড়যন্ত্র আর শরিয়ত সম্মত বলে করা প্রতিবাদ করে খুব লাভ হচ্ছে না। এধরনের যুক্তি সুশীল বাহিনীর মুখে যতটা মানায়, হেফাজতের মুখে ততোটাই হাস্যকর শোনায়। আর একই অবস্থায় অন্য কেউ থাকলে সুশীলরা যে ভাষায় কথা বলত, হেফাজতের জন্য সুশীল গং সে ভাষায় কথা বলবে না। মিডিয়া থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী বাহিনী, নাকে খত দিয়ে হলেও অ্যান্টি হেফাজত স্ট্যান্ড নেবে। আর কাদায় পড়লে মশাওতো সো, মামুনুল প্রশ্নে যে সুশীল বাহিনী যে ছেড়ে কথা বলবে না, এটা হেফাজত যত দ্রæত বুঝবে ততোই ওদের জন্য মঙ্গল।
প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পরে সম্ভবতঃ ওরা সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে আলোচনায় বসে। সম্ভবতঃ কেউ তাঁদের বোঝাতে সক্ষম হয়, যখন তুমি আবিষ্কার করবে, যে তুমি গর্তে আছো, তখন বুদ্ধিমানের কাজ হবে, গর্ত খোঁড়া বন্ধ করা। মামুনুলকে ডিফেন্ড করতে গেলেই, গর্ত গভীর হতে থাকবে, আর ততোই গর্ত থেকে বেরিয়ে আসবার সম্ভাবনা কমতে থাকবে। এই মুহূর্তে পিছিয়ে এসে সঠিক সুযোগের জন্য অপেক্ষা করাই বেস্ট অপশান। কিন্তু লোহা এখনো গরম। মামুনুল ইস্যুতে এভাবে পরাজয় মেনে নিতে অনেক হেফাজত কর্মীই চাইছে না। তাই হয়তো…
দ্যা সো কলড ‘কঠোর লকডাউন’। অনেকের ধারণা, এটা হেফাজত ঠেকানোর জন্য। আর সরকারের বক্তব্য, এটা ছাড়া করোনা আটকাবার উপায় নাই।
আপাততঃ কাহিনীতে পজ আসলেও, এটা এন্ডিং না। হেফাজত ফাইট ব্যাক করবেই। এখন, না পরে, অন্য কোন ইস্যুতে, সেটাই দেখার অপেক্ষা। আপাততঃ কি সিদ্ধান্ত, হেফাজত গং কি করবে, সেটা সেটা হয়তো আর কিছুদিনের ভেতরেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। মামুনুলের ব্যাপারেও অচিরেই একটা সিদ্ধান্ত তাদের নিতে হবে। উনি মাইনাস হচ্ছে কি না, আন্দোলন জোরদার হবে কি না, কিংবা আরেকজন নেতার মামুনুল পরিণতি হচ্ছে কি না, সেটা দেখা যাগে কাহিনীর নেক্সট এপিসোডে। আর তখন হয়তো তাঁদের আরও একটা প্রশ্নের উত্তর, যে প্রশ্নটা নিবু নিবু করে হলেও এখনো অনেকের মনে উঁকি দিচ্ছে, সেটার উত্তর পাওয়া যাবে। মামুনুলকে, এবং সেই সঙ্গে হেফাজতকে কি আপাততঃ বোতলে ঢোকানো গেছে? না যায়নি? তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কি হতে চায় তারা। একটি আসল বিরোধী দল? না, আরেকটা জাতীয় পার্টি?




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]