• প্রচ্ছদ » » করোনাভাইরাস ও আমার জীবনযাত্রা


করোনাভাইরাস ও আমার জীবনযাত্রা

আমাদের নতুন সময় : 17/04/2021

শামীম আহমেদ : আমি যেই বিল্ডিংটাতে থাকি, সেটা ২০ তলা। এর মুখোমুখি আরেকটা ২০ তলা বিল্ডিং। এই দুই বিল্ডিং ইউনিভার্সিটি অফ টরোন্টোর। এই দুই বিল্ডিংয়ে মোটামুটি ৬০০ পরিবার থাকে, যাদের অন্তত একজন সদস্য ইউনিভার্সিটি অফ টরোন্টোতে মাস্টার্স অথবা পিএইচডি করছে। প্রাদেশিক সরকারের হিসাব মতে, আমরা যেই এলাকায় থাকি তাকে হটস্পট ঘোষণা করা হয়েছে, অর্থাৎ এখানে করোনা আক্রান্তের হার স্বাভাবিকের চাইতে বেশি, আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তাই বেশি। আমাদের এই দুই ভবনের বাসিন্দাদের একটা ফেসবুক গ্রæপ আছে। সেখানে নানা আলাপ হয়, তার মধ্যে একটা আলাপ হচ্ছে ভ্যাক্সিন পাওয়া নিয়ে। করোনা আক্রান্তের ভয়াবহতা বেড়ে যাওয়ায় যেসব এলাকা হটস্পট হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে বয়সের বাধা তুলে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ হটস্পট এলাকাগুলোতে ১৮ বছরের বেশি যে কেউ ভ্যাক্সিন নেবার জন্য আবেদন করতে পারবেন। আমি প্রতিদিনই দেখি ইউনিভার্সিটি অফ টরোন্টোর শিক্ষার্থী যারা এই দুই ভবনে বসবাস করেন, তারা চাতক পাখির মতো ভ্যাক্সিন এপয়েন্টমেন্টের জন্য বসে আছেন। রাত ১২টাতেও তারা ওয়েবসাইটে ঢোকেন, কিন্তু এপয়েন্টমেন্ট নেই। আমাদের এলাকায় ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সীদের হয় ফাইজার অথবা মডার্নার ভ্যাক্সিন দেওয়া হচ্ছে। আমার প্রথম পছন্দ ফাইজার, মডার্না হলেও আপত্তি নেই। কিন্তু এপয়েন্টমেন্টের তেমন কোনো চেষ্টা আমি এখনো করছি না। এর পেছনে কয়েকটা কারণ আছে।
[১] গত একবছর ধরে কানাডা সরকারের নিয়ম মেনে আমি প্রতিদিনই ঘর থেকে বেরিয়েছি এবং প্রায় ১০ কিলোমিটার করে হেঁটেছি। প্রায় প্রতিদিন। গত বছর যখন লকডাউনে মানুষ আতঙ্কিত তখনও। সুতরাং আমার ধারণা হয় এর মধ্যে আমার করোনা হয়ে গেছে, অথবা আমার হবার সম্ভাবনা কম। [২] আমি ফোন যেমন ধরি না, মানুষের সাথেও কম মিশি। হাতেগোনা ৫-৬ জন মানুষের সাথে আমার নিয়মিত দেখা হয়। [৩] আমি যখন রাস্তায় বের হই, বা পার্কে যাই হাঁটতে, চেষ্টা করি সবার সাথে ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে। ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে পারলে অনেক সময় মাস্ক পরি না। ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে পারলে মাস্ক পরা জরুরি না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। আর যদি ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে না পারি, তাহলে মাস্ক পরি। [৪] প্রচুর ঘাম ঝরাই, ওজন কমিয়েছি। নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করে কো-মর্বিডিটিজের ঝুঁকি কমিয়েছি। প্রতিদিন ১০০০ সিসি ভিটামিন সি খাই। আরও এক গাদা ভিটামিন খাই, যা ডাক্তার পরামর্শ দেন। বাইরের খাবার খাই না বললেই চলে। গত একবছর ধরে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করি, অর্থাৎ প্রতিদিন অন্তত টানা ১৬ ঘণ্টা কিছু খাই না, মূলত রাত ১১টা থেকে পরের দিন ৩টা আমি গত একবছর ধরে এই ফাস্টিং করে আসছি। চর্বি গলাচ্ছি। [৫] আমি অযোক্তিকভাবে কিছু করি না। যেমন মানুষ হাত ধুতে ধুতে চামড়া তুলে ফেলছে। আমি বাসায় ফিরে একবার হাত ধুই। বাইরে গেলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখি সাথে। কিছু স্পর্শ করতে হলে তারপর একটু স্যানিটাইজ করে নিই। না স্পর্শ করতে হলে অকারণে সেটা করি না।
[৬] করোনা সংক্রান্ত অহেতুক তথ্য দিয়ে নিজেকে ভারাক্রান্ত করি না। জনস্বাস্থ্যের ছাত্র ও গবেষক হিসেবে যতোটুকু পড়ালেখা করা দরকার, তা করি। কিন্তু ‘রোজা রাখলে করোনা হয় না’ বা ‘দক্ষিণ আফ্রিকার স্ট্রেইনের গতি-প্রকৃতিতে আমাদের করণীয়’ জাতীয় ফালতু জিনিস এড়িয়ে চলি। পৃথিবীর শীর্ষ বিজ্ঞানীরা এখনও জানে না যে দক্ষিণ আফ্রিকার স্ট্রেইন কীভাবে ঠেকাতে হয়, সেখানে এই বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় টক-শো দেখা, বা আর্টিকেল পড়া অহেতুক মনে করি।
[৭] আমি আরও কিছুদিন পর ভ্যাক্সিন নিতে চাই। যেহেতু ভাইরাস এখনও তার চেহারা পাল্টাচ্ছে, তাই আমার ধারণা ৩-৪ মাস পরে ভ্যাক্সিন আরেকটু আপডেটেড হবে। যেহেতু আমাকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলা যায়, সুতরাং আরও ৩-৪ মাস অপেক্ষা করার ঝুঁকি আমি নিতে পারি। কিন্তু সাধারণ মানুষের তা ঠিক হবে না। আপনার উচিত আজ নয়, পারলে ‘গতকাল’ ভ্যাক্সিন নেয়া। [৮] করোনার উৎপত্তির কোনো পরিষ্কার ধারণা এখনও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। অনেকে সব নিয়ম মেনে, ভ্যাক্সিন নিয়ে বাজেভাবে অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছেন, কেউ কেউ তাইরে নাইরে করতে করতে কিছু না মেনেই দিব্যি আছেন। সুতরাং মৃত্যু যেকোনো সময় আসতে পারে, প্রস্তুত আছি। আজকে আমার প্রদেশে (পুরো ক্যানাডায় নয়) ৪০০০ এর বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। আমার প্রদেশে আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করছেন এই মুহূর্তে ৭০০ মানুষ। প্রায় ৬ বছর ধরে চলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মারা গিয়েছিল প্রায় ৮ কোটি মানুষ। সেই যুদ্ধেও মানুষ এক সময় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। আমিও বোধহয় করোনায় খানিকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমার আব্বার এক চাচাত ভাই ও আম্মার এক চাচাত ভাই করোনায় মারা গেছেন। আপনারা ভালো থাকবেন। লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]