• প্রচ্ছদ » » শিক্ষার যারা নেতৃত্ব দেন তারা কি বুঝতে পারছেন, আপনাদের নিষ্ক্রিয়তা কোথায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে একটা রাষ্ট্রকে? এই নিষ্ক্রিয়তার মূল্য কতো?


শিক্ষার যারা নেতৃত্ব দেন তারা কি বুঝতে পারছেন, আপনাদের নিষ্ক্রিয়তা কোথায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে একটা রাষ্ট্রকে? এই নিষ্ক্রিয়তার মূল্য কতো?

আমাদের নতুন সময় : 03/05/2021

আর রাজী : আরও একটা মাস চলে গেলো। গত বছরের মার্চে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ হয়েছিল, তের মাস চলে গেলো! কবে খুলবে, জানা নেই। পড়ালেখার কথা বাদ দিলাম। ঘরে বসে আছে যে ছেলেমেয়েগুলো, নানান সীমাবদ্ধতায় ভোগা পরিবারগুলোকে দূর থেকে সহায়তা করত যে সন্তানগুলো তারা ঘরবন্দী, অসহায় মা-বাবা-ছোট ভাই-বোনদের সামনে আরও অসহায় নিষ্ক্রিয় হয়ে অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে তাদের। তাদের মানসিক অবস্থা কেমন আছে? বন্ধু-বান্ধবহীন, প্রতিদিনের সংগ্রামহীন, অসহায়-নিষ্ক্রিয়-অনিশ্চিত জীবন কেমন চাপ তৈরি করছে তাদের ওপরে। আমি কল্পনা করতে ভয় পাই।
আমার পুত্র-কন্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, পরিবারের বয়স্ক মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবে ঘর থেকে বের হয় না তারা, শহরের ছোট্টবাসায়, ততোধিক ছোট্ট ছোট্ট ঘরে এভাবে বন্দী থেকে থেকে কতোখানি বদলে যাচ্ছে তারা? আমার যে কন্যা উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে, ও জানে না পরীক্ষা হবে কিনা, হলে কবে নাগাদ হবে? এই কিশোরীর মনের খোরাক, বেঁচে থাকার খোরাক কোথায়? নেটের একঘেঁয়ে কৃত্রিম দুনিয়া কতোক্ষণ, কতোদিন সুস্থ রাখতে পারে স্বাভাবিক মানুষকে?
আমার বউ একটা কলেজে পড়ান, অনলাইন ক্লাস নেন অনেক অনেক, অতি অতি নগণ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী হাজির থাকেন সেসব ক্লাসে। শ্রোতাশূন্য সেই আয়োজন কতোদিন চালাতে পারেন একজন শিক্ষক? মাঝে মাঝে তাঁর শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের সাথে টেলিফোন-কথোপকথনের কিছু কানে আসে, কলেজের বেতন পরিশোধের মতো অবস্থা নাই অনেকের। শহরের বাজারে, বড় মার্কেটের সামনে যে ছোট্ট ঘড়ি সারাইয়ের দোকানের আয়ে চলত তাদের সংসার, ক্রেতা কমে যাওয়ায় সে দোকান বন্ধ করে দিতে হয়েছে সেই কবে! বাবা বাসাভাড়া দিতে পারছিল না বলে পরিবারকে ঢাকা শহর ছেড়ে দিতে হয়েছে গত বছর। যার পড়ালেখা হবে কী হবে না এরই নিশ্চয়তা নাই তার আবার বেতন পরিশোধ। ঘুরে ফিরে একই গল্প।
আমিও পড়াই। আমি লেখক নই, গবেষক নই, রাজনৈতিক অভিলাষ আমার নাই। পড়ানো ছাড়া আর কিচ্ছুটি করি না আমি। কেবল পড়াতে ভালোবাসি বলেই এই চাকরিটা করে যাওয়া। খুব সামান্য কিছু পড়াই, তাও একই কোর্স দুজন ভাগাভাগি করে নেই। আমার সহকর্মীরা একাই পড়িয়ে ফেলেন সবটা। আমি অনেক ক্ষেত্রে একই বিষয়ে আবার বক্তৃতা দিই। চেষ্টা করি নিত্যনতুন কিছু খুঁজে পেতে শিক্ষার্থীদের জানাতে। তাতে অনাবিল এক প্রশান্তি কাজ করে। আর কিছু ব্যবহারিক ক্লাস করাই। সেটিই আমার মূল কাজ। কিন্তু মহামারি সেসব থেকে দূরে ছুড়ে ফেলেছে আমাকে। একঘেঁয়ে ক্লান্তিকর ঘরে বসে থাকা অসহনীয় হয়ে উঠছে দিনকে দিন। আমার মতো বয়স্ক মানুষের যদি এমন হয় তাহলে আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীদের পরিস্থিতি কতো সঙ্কটপূর্ণ তা অনুভব করতে পারি। মনবিষণœ হয়। অনলাইনে ক্লাস কিন্তু পরীক্ষার কোনো আয়োজন নাই, এক বর্ষ থেকে আরেক বর্ষে উত্তীর্ণ হওয়ার গল্পও নেই, শিক্ষকরা বাড়ির কাজ দেন, কিন্তু বই নেই, গ্রন্থাগারে যাওয়া নেই, কেবল একজন আরেকজনেরটা কপি করে দেওয়া। হায় শিক্ষা। হায় শিক্ষকতা।
আশা তৈরি হয়েছিলো মে মাসে খুলে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। সে আশার গুড়ে এরই মধ্যে বালি মিশে গেছে। আমরা জানি, হলে আবাসনের সংকট আছে, জানি পরিবহনের সংকট আছে। এই পরিস্থিতি বদলাবে না সহসাই। কিন্তু (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাদে) সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আড়াই লাখ শিক্ষার্থী মাত্র, তাদের যদি দুই ডোজ টিকা দিয়ে দেওয়া যেতো তাহলেই তো হতো! মাত্র পাঁচ লাখ ডোজ টিকা! আগে থেকে কেনার উদ্যোগ নিলে ২৫ কোটি টাকাও তো লাগতো না। শিক্ষার্থীরা টিকা পেলে অনেকটাই নির্ভয়ে খুলে দেওয়া যেতো অন্তত উচ্চ-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো।
বোকার মতো আমি ভেবেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনগুলো নিশ্চয়ই নিজেদের মতো করে সেসব দেনদরবার, আয়োজন সেরে রেখেছেন। আমার কথা শুনেই টিকার জন্য অনলাইনে নিবন্ধন করে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া আমার পুত্র-কন্যা। কিন্তু হায়, টিকা কোথায়। আবাসন বা পরিবহন হয়তো অনেক টাকার ব্যাপার কিন্তু এই মহামারিতে সামাজিক-দূরত্ব রক্ষা করে শ্রেণিকক্ষে বসার আসন যেমন বৃদ্ধি করা দরকার, দরকার ব্যবহার অনুপোযুক্ত বাথরুম-টয়লেটগুলো কাজের করে তোলা, তেমনি দরকার হাত ধোয়ার অনেক অনেক আয়োজন। এই সামান্যটুকুও যে হলো না অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার জন্য অবকাঠামোও হলো না, কোনো নীতিমালা হলো না। আজতক শুনিনি যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলে অনলাইনে পড়ানো-পরীক্ষা নেওয়া ইত্যাদি নিয়ে কোনো নীতিমালা তৈরি হয়েছে, যথাযথ পর্ষদে পাস হয়েছে সেসব। অথচ আমাদের সন্তানদের জীবন থেকে ঝরে যাচ্ছে মাসের পর মাস। একটা বছর চলে গেলো। হাল ছেড়ে, হাত তুলে বসে থেকে হয়তো চলে যাবে আরও একটা বছর। এ দেশে কেউ কি আছেন, যাকে বললে কাজ হবে? আমাদের শিক্ষার যারা নেতৃত্ব দেন তাঁরা কি বুঝতে পারছেন, আপনাদের নিষ্ক্রিয়তা কোথায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে একটা রাষ্ট্রকে? ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]