আমার শুরু সত্যজিৎ রায়

আমাদের নতুন সময় : 05/05/2021

আনিস আলমগীর : ১৯৯২ সালে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শেষ বর্ষের প্রায় ৪০ জন ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষা সফরে গিয়েছিলাম কলকাতা-মাদ্রাজ-কোভালাম-কোচিন-কন্যাকুমারী। এসব জায়গায় আমরা টানা একমাস থেকেছি। আমাদের যাওয়ার কথা ছিলো মালদ্বীপেও কিন্তু জলদস্যুরা তখন মালদ্বীপ দখল করে নেওয়ার এক ঘটনার কারণে দিনভর ত্রিবান্দম এয়ারপোর্ট অপেক্ষা করেও আমরা যাওয়ার অনুমতি পাইনি। ভ্রমণে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন গোলাম রহমান, শাহেদ কামাল, শুব্রত শংকর ধর এবং মিশুক মুনীর। সে এক আজীবন মনে রাখার স্মৃতি আমাদের সবার। কলকাতায় আমাদের থাকার জায়গা ছিল সল্টলেক স্টেডিয়ামের যুব কমপ্লেক্সে। আমরা যেদিন যাই তার পরদিন আনন্দবাজার খবর করে, কলকাতায় ঢাকার পকেটমার বৃদ্ধি। আমরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, আমাদের ৪০ জনের টিম নিয়ে কিনা। পড়ে দেখি নিউমার্কেট এলাকায় ঢাকাইয়া পকেটমারদের উৎপাত নিয়ে রিপোর্ট। তখন কলকাতায় দুটি খবর ভারতীয় পত্রিকায় প্রথম পাতায় গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। বিশেষ করে সত্যজিৎ রায় অস্কার পুরস্কার পাচ্ছেন তার সমগ্র কর্মের জন্য, যেটি তাকে হাসপাতালের বিছানায় হস্তান্তর করে অস্কার কর্তৃপক্ষ। অন্যটি হচ্ছে তিনবিঘা কোরিডোর নিয়ে নরসীমা রাও এবং খালেদা জিয়ার চুক্তির বিরোধিতা করে ফরোয়ার্ড বøকের নেতা এবং বামফ্রন্ট মন্ত্রী কমল গুহের হৈচৈ।
ছাত্র হলেও আমি তখন আজকের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার এবং সেটি আমার দ্বিতীয় দৈনিকের চাকরি। ঢাকা থেকে মতিউর রহমান চৌধুরীর রেফারেন্সে দেখা করেছিলাম আনন্দবাজারের সিনিয়র সাংবাদিক, পরবর্তীকালে চিফ রিপোর্টার সঞ্জয় সিকদারের সঙ্গে। তখন তাদের চিফ রিপোর্টার ছিলেন শ্যামল চক্রবর্তী। বড় অমায়িক মানুষ ছিলেন (’৯৭ সালে মারা যান)। পরিচয় হয় একদল তরুণতুর্কির সঙ্গে। কেউ ডেস্কের, কেউ রিপোর্টিং বিভাগের মেধাবী সদস্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা একজন তরুণীও ছিলো রিপোর্টিং টিমে, নাম মনে পড়ছে না। যে জিনিসটা আমার তাদের নিউজ রুমে ভালো লেগেছে, সেটা হচ্ছে কাজের প্রতি সিরিয়াসনেস। কাজ শেষে আড্ডা। তাদের বই পড়ার অভ্যাস। আমাকে প্রথম বিদেশি মদ্যপান করানোর দায়ও তাদের। তাদের অফিসের পাশে এলফিন বার অ্যাান্ড রেস্টুরেন্টে আডডা দিতেন সঞ্জয়দা-সুপর্ণদার টিম। পুরো টিম আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন- তাদের নিউজ রুমে বসে প্রতিদিন সংবাদ তৈরিতে। সঞ্জয়দার গেস্ট আর শ্যামলদার স্নেহ আমাকে তাদের সবার সঙ্গে তখন একটা মধুর সম্পর্ক তৈরিতে সহায়তা করেছিল, যা এখনো অনেকের সঙ্গে বহাল আছে। আমি দিনভর তাদের গাড়ি, তাদের অফিস, ফোন ব্যবহার করে রিপোর্ট তৈরি করে ফ্যাক্স করতাম। আর রাতে শ্যামলদা আমাকে তাদের অফিসের গাড়িতে করে নামিয়ে দিতেন সল্ট লেকের আস্তানায়। দাদার বাড়ির রাস্তাও ছিলো আবার সেটি। সত্যজিৎ রায়ের অসুস্থতার ফেলোআপ খবর আর কমল গুহের ইন্টারভিউ করেছিলাম- এই সফরের দুই দফায় কলকাতা এসে। তবে সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যু আমি কলকাতায় থাকতে ঘটেনি, দেশে আসার পরপরই ঘটে। আজকের কাগজের জন্য সে খবরও আমি লিখি এবং সাপ্তাহিক খবরের কাগজে কাভার স্টোরি করি। মজার বিষয় হচ্ছে, আমি যখন তাকে নিয়ে স্টোরি করি তখন পর্যন্ত আমি তার একটা ছবি দেখারও চান্স পাইনি। তবে তার প্রতি আমার ভালোবাসা জমেছিল অনেক আগে থেকে। বাংলাদেশে রায়ের পৈতৃক বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি শহরে। তখন আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র। আমার সাইকোলজির শিক্ষিকা আফিফা ম্যাডাম অকারণে আমাকে বেশি ভালোবাসেন। তার বাবা ‘আসিয়া’ সিনেমার নায়ক কাজী খালেক। তার এক কাজিন কানাডিয়ান রিচার্স টিমে কাজ করতেন। কানাডা সরকার বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নে কিছু কর্সমূচির জন্য উপজেলা পর্যায়ে অর্থ সাহার্য করতো। সে অর্থ আদো কোনো কাজে আসছে কিনা- সেটা ইন্সপেকশন করতে একটা টিমকে সারা দেশের নির্বাচিত কিছু এলাকায় পাঠানো হয়েছিল। আমি ম্যাডামের বদৌলতে একেবারে কনিষ্ঠতম সদস্য হিসেবে টিমে স্থান পাই। আর সবাই অনেক সিনিয়র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন সংস্থার বড় ভাই। আমার এলাকা পড়েছিল দুর্গম মিঠামইন (সে নিয়ে আরেক দিন লিখবো।) কাজ শেষে আমার পথে আমার করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, কটিয়াদি উপজেলায় সফর করি। সচিত্র বাংলাদেশে তখন উপজেলা পরিচিত ছাপা হত প্রতি সংখ্যায়।
ভালো টাকা দিন। কটিয়াদি নিয়ে লিখতে গেলেই সত্যজিৎ রায় আসে সবার আগে। তাই তার বাড়ি যাওয়া, ছবি তোলা। সম্ভ্রান্ত বাড়ি, বাড়ির সামনে একটু পুকুর ঘাট আর বা পাশে একটি বড় মাঠ- এগুলো সম্মণে পড়ছে। সব স্মৃতি স্পষ্ট না এখন। রায় আমার জন্য বিশেষ স্মরণীয় কারণ তাকে দিয়ে আমার প্রথম বিদেশি ডেটলাইন শুরু। তিনি অনেক লাকি ছিলেন আমার জন্য সে কারণে হয়তো পরবর্তী সময়ে প্রায় ২০/২৫টি ইন্টারন্যাশনাল ইভেন্ট কাভার করার সুযোগ হয়েছিল আমার। ঘুরতে পেরেছি ২৫টি দেশে। কোথায় কোথাও একাদিকবার। তবে একটা দুঃখও রেয়ে গেছে, আমাদের পুরো টিম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালসহ কলকাতার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যখন ঘুরেছে, তখন আমি আনন্দবাজার টিমের সঙ্গে খবরের সন্ধানে। কারও হয়তো বিশ্বাস হবে না, আজও আমি কলকাতা শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখতে পারিনি, সব সময় দৌঁড়ের ওপর থাকায়। অবশ্য আমি বিল্ডিং,পুরাকীর্তি দেখার চাইতে যেকোনো এলাকার মানুষ দেখতে বেশি ভালোবাসি। বাংলা চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে আজও সত্যজিৎকে কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। হয়তো যাবেন। কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস যতোদিন থাকবে তাকে স্মরণ করতেই হবে। বাঙালিদের গর্ব চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের শততম জন্মবার্ষিকী গেলো। রায়ের জন্মদিনে বাংলার রায় এলো বাঙালিদের পক্ষে, মমতা ব্যানার্জি হতে যাচ্ছেন তৃতীয়বারের মতো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। জন্মশতবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা জগৎখ্যাত মানুষটির জন্য। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]