• প্রচ্ছদ » » গণতন্ত্র, রাজনীতি এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ স্বপ্ন


গণতন্ত্র, রাজনীতি এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ স্বপ্ন

আমাদের নতুন সময় : 09/05/2021

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাসের কোনো সময়ই ভালো ছিলো না। কারণ বাংলার ওপর বাইরে আঘাত-প্রতিঘাত, আক্রমণ সবসময়ই এসেছে। কারণ বাংলার সম্পদ। করোনাকালে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যে কষ্ট লক্ষ্য করছি, সরকারের প্রণোদনার নামে যে ধরনের প্রহসনমূলক কর্মকাণ্ড চলছে, আমি প্রান্তিক মানুষকেই যথার্থ মানুষ মনে করি। সমাজের উপরতলার মানুষ নানান ফন্দিফিকির করে উপরতলায় উঠেছে। তাদের খুব ভালো মানুষ মনে করি না। মানুষ বলতে আমি আমার অভাজন যারা, তাদের মনে করি। তারা তো ভালো মনে করি।
বাংলাদেশের মানুষ ভালো নেই। কারণ সামাজিক অপরাধ বিস্ফোরণ ঘটেছে। দুর্নীতির যে বিস্ফোরণ ঘটেছে, পৃথিবীতে এতোটা দেখা যায় না। সবকিছুর মূলে রয়েছে সুশাসনের অভাব। বাংলাদেশে শাসক অনেক আছেন, শাসন নেই। নেতা আছেন, নেতৃত্ব নেই। আর করোনা এসেছে মরার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের মানুষ যে ভালো আছে, তা আমি বলতে পারি না।
৫০ বছরের হিসাব ধরলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন সূচকে এগিয়ে আছে, কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে যাচ্ছি প্রতিদিনই। অর্থনীতি এগোচ্ছে, রাজনীতি অনুন্নত হচ্ছে। এই যে বৈপরীত্য তা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক অর্জন ম্লান করে দেবে, যার দৃষ্টান্ত ভারত। ভারতে যেমন এখন ধর্মভিত্তিক রাজনীতি রমরমা, যার ফলে ভারত বাংলাদেশেরও পেছনে পরে গেছে।
বাংলাদেশের গ্রামের মানুষের ভাগ্য খুব একটা ফেরেনি। তবে তথাকথিত প্রবৃদ্ধির ছিটেফোটা কিছুটা তাদের গায়ে লেগেছে। পথঘাট কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ গেছে। তুলনামূলকভাবে নাগরিক জীবনের যে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা তা তারা পেতে শুরু করেছে। তার অর্থ এই নয় যে, সমাজ এগিয়েছে। সমাজ বরং পেছনে চলে গেছে।
গণতন্ত্র এগোয়নি। গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার করে স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিলো। আমরা অত্যন্ত ভালো একটি সংবিধান আমরা পেয়েছিলাম। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই। যা আছে, তা ডেমোক্লেরোসিস। ডেমোক্রেসি যোগ ক্লেরোসিস। ক্লেলোসিস একটা রোগ, যাতে শরীরের ধমনী শুকিয়ে যায়। রক্ত প্রবাহিত হয় না। যার ফলে মানুষ অস্তিত্ব রাখে, কিন্তু সজীব-সচল কিংবা সক্রিয় থাকতে পারে না। আমাদের সংবিধানে গণতন্ত্র আছে, সরকারের মুখে মুখে গণতন্ত্র আছে, বিরোধীদলের মুখে গণতন্ত্র নেই। আমি বাস্তব সত্য উচ্চারণ করছি।
রাজনীতিতে সংকট হচ্ছে বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কোনো রাজনীতি নেই। আছে ক্ষমতা নীতি। যারা ক্ষমতায় থাকেন, তারা ক্ষমতায় থাকাকে দীর্ঘায়িত করতে চান। আর যারা ক্ষমতা থেকে বিচ্যুত তারা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যেতে চায়। পলিটিকস থেকে বাংলা করা হয়েছে রাজনীতি। যে সময় করা হয়েছিলো তখন রাজারা ছিলেন, রাজার নীতি ছিলো, সেটাকেই পণ্ডিতেরা রাজনীতি বলেছিলেন। আমি বলি পলিটিকস মানে জননীতি। কারণ এখন তো রাজা নেই। জননীতিতে জনগণই সবচেয়ে বড় উপাদান হবে, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তথাকথিত রাজনীতিতে জনগণ কিছুই নয়! জনগণ কিছুই পাচ্ছে না।
রাজনীতি চলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণে। বাংলাদেশে তো বিরোধীদল নেই। এজন্য সরকার যতোটুকু দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী বিরোধীদল বিএনপি। কারণ তাদের এখন নেতৃত্ব নেই। সংগঠন নেই। টেলিভিশন ও পত্রিকা আছে বলেই মনে হয় বিএনপি নামক একটি রাজনৈতিক দল আছে। আর বিএনপি ও জাতীয় পার্টি অবৈধ দল। সেনা ছাউনিতে তাদের জন্ম। দুটি অবৈধ দল কীভাবে বৈধতা পায়, তা আমার বোধগম্য নয়।
মুজিবনগর সরকারের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রে ১০ এপ্রিল বলে দিয়েছিলো তিনটি লক্ষ্যের কথা। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও আর সামাজিক ন্যায়বিচার। এর কোনোটিই ৫০ বছরের বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলতে পারছি না। এর স্বপক্ষে কোনো তথ্য প্রমাণ নেই। বিগত ১২ বছরে বৈষম্য বেড়েছে ৬০-৭০ ভাগ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্টোরেলসহ অনেক কিছুই হচ্ছে, কিন্তু আয় বৈষম্য বেড়েছে। বাজেটে বৈষম্য কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই। বাংলাদেশে সামাজিক অর্থনীতি পিছিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিও পিছিয়ে যাচ্ছে। আমাদের চোখের সামনে কিছু চটকদার প্রবৃদ্ধি আছে। তাতে করে আমি সন্তুষ্ট হতে পারছি না।
বাংলাদেশের অস্তিত্বের সংকট ছিলো শুরুতেই। আমরা যে টিকে আছে, সেটাই ৫০ বছরে সবচেয়ে বড় অর্জন। প্রবৃদ্ধির দিক থেকে বিশে^র আমরা নজর কেড়েছি, উন্নয়নের দিক থেকে নয়। আর কোনো খাতই ভালো নেই বাংলাদেশে। শিক্ষা শেষ, প্রশাসন শেষ, কোনো প্রতিষ্ঠানের গণতন্ত্রায়ন হয়নি। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ। প্রায় সবকিছুর দিক থেকে আমরা ধসে গেছি। তবুও আমরা টিকে আছি, এটা সারা বিশে^র কাছে বিস্ময়। তার সঙ্গে কিছুটা অর্জন আছে। আশার সবচেয়ে বড় জায়গা হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। আমি ইতিহাসের মানুষ। আমি জানি বাংলাদেশের মানুষই ইতিহাসের বড় বড় বাকবদল ঘটিয়েছে। নেতৃত্বের ভূমিকা অনিস্বীকার্য। পরিচিতি : ইতিহাসবিদ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]