• প্রচ্ছদ » » কোভিডকালে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস : ভয় নেই, তবে সতর্ক থাকুন


কোভিডকালে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস : ভয় নেই, তবে সতর্ক থাকুন

আমাদের নতুন সময় : 27/05/2021

ড. শোয়েব সাঈদ : আমরা যারা বিজ্ঞানের জটিল বিষয়ে সহজবোধ্য উপস্থাপনায় জনসচেতনতা বা জনস্বার্থে লিখি, খুব সতর্কতার সাথে লিখতে হয় যাতে অন্য কোনো হিসেবের গ্যাঁড়াকলে তথ্যটি ব্যবহৃত না হয় এবং কী বলতে চাচ্ছি তার মর্ম যেন ব্যহত না হয়। দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারতে কোভিড চিকিৎসায় গোবরের ব্যবহার তো বৈশ্বিক সংবাদ শিরোনাম, ভারতের পত্রপত্রিকাতেই এই বিষয়ে প্রচুর হুঁশিয়ারি। বø্যাক ফাঙ্গাস বিস্তারে গোবর একটি উৎস, এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। আমাকে তো এই তথ্যটি কোনো না কোনোভাবে দিতে হবে। তাই অনেক কারণের ফাঁকে এটি বলতে হচ্ছে এবং সতর্কও থাকতে হচ্ছে, যাতে কোনো ধর্ম বা রাষ্ট্রকে আঘাত না করা হয়।
গোবর দিয়ে ঘুটে বানানো পাক-ভারত উপমহাদেশের কালচার, যুগ যুগের ইতিহাস। কম্পোস্টিং কিংবা প্রক্রিয়াজাত গোবর নাড়াচাড়ায় এক পরিণতি, আর ভয়ানক সব আণুবীক্ষণিক প্যাথোজেন সমৃদ্ধ কাঁচা গোবর নাকে মুখে চোখে মেখে বসে থাকার তো আরেক পরিণতি।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা-সহ অসংখ্য ভারতীয় পত্রপত্রিকায় অণুজীব বিশেষজ্ঞ আর ডাক্তারদের বরাত দিয়ে বারবার সতর্ক করা হয়েছে যে গোবর কোভিড চিকিৎসা বা কোভিড থেকে রক্ষায় কোনো কাজেই আসেনা বরং বø্যাক ফাঙ্গাসসহ অনেক ভয়ানক অণুজৈবিক রোগ বিস্তার উসকে দিয়ে মরণ বা অঙ্গহানি ডেকে আনতে পারে। ২০২১ সালের মে মাসে ভারতে বø্যাক ফাঙ্গাসের এই বিস্তৃতির কাহিনিটুকুর একটি ছোট অংশ হচ্ছে গোবর বিষয়ে হুঁশিয়ারি। শরীরের দুর্বল প্রতিরক্ষা অবস্থা হচ্ছে মূল চিন্তার কারণ। ভারতে ২০২১ সালের মার্চ মাস থেকে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে দৈনিক লাখ লাখ লোকের করোনা সংক্রমণের অধিকাংশের শারীরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল অবস্থায় পতিত হয়েছে।
কোভিড চিকিৎসা ব্যবস্থায় স্টেরয়েডের যথেচ্ছ ব্যবহার দেহকে আরও দুর্বল করে দেয় এবং ইন্ধন যুগিয়েছে বø্যাক ফাঙ্গাস সংক্রমণে। স্টেরয়েড দেওয়ার সময় ডাক্তার অনেক সময় সতর্ক করে দেয় ডায়াবেটিস বাড়তে পারে। ভারতের হাসপাতালগুলোর ডাটা বলছে, রক্তে উচ্চ শর্করা আর বø্যাক ফাঙ্গাস সংক্রমণের নিবিড় যোগসূত্রের। রক্তে সুগার বেড়ে যাওয়া মানে আপনার শরীরে লুকিয়ে থাকা অণুজৈবিক শত্রæদের মহানন্দ অনুক‚ল পরিবেশ পেয়ে আপনাকে কাবু করার জন্যে। ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন সুগার বেড়ে যাওয়ার নিত্য নৈমিত্তিক ভোগান্তি হচ্ছে খোসপাঁচড়া, ঘা না শুকানোর মতো জটিলতা।
আমাদের দেহে অনেক ধরনের ফাঙ্গাসের বসবাস। আর্দ্র আর গরমের সময়ে দেখবেন এদের উপদ্রব বাড়ে। আণুবীক্ষণিক দলে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ইস্ট থেকে গঠনে ফাঙ্গাস একটু শক্তপোক্ত ধরণের। বø্যাক ফাঙ্গাসকে রোগবিস্তারে বলা হয় সুবিধেবাদী ধরনের অর্থাৎ শক্তের ভক্ত, নরমের যম। সবল শরীরে ক্ষতির কারণ হয়না, পেয়ে বসে রোগে অভাব-অনটনে বিধ্বস্ত শরীরকে। একটু ভিন্ন উদাহরণ দিই। আমাদের পাকস্থলির লাইনিং এর ভেতর বসবাস করে হ্যালিকোব্যাক্টর পাইলোরি নামক ব্যাকটেরিয়া, এমনিতে কোনো উপদ্রব করে না, কিন্তু সুযোগ বুঝে প্রদাহ থেকে আলসার হয়ে ক্যান্সার পর্যন্ত ধরিয়ে দেয়। এই তথ্যের উদ্ভাবন এবং এর দমন ব্যবস্থা কিন্তু নোবেল পুরস্কারে ভ‚ষিত।
ভারতে কোভিড আক্রান্ত এবং কোভিডের আগ্রাসী চিকিৎসায় ইমিউনিটির দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অনেকের ক্ষেত্রে সুযোগ বুঝে বø্যাক ফাঙ্গাস পেয়ে বসেছে অর্থাৎ কপাল দোষে হতভাগ্যরা বø্যাক ফাঙ্গাসের মত বিরল রোগের সংকটে মৃত্যু কিংবা অঙ্গহানিকে আলিঙ্গন করছে। বø্যাক ফাঙ্গাসের যুদ্ধ ক্ষেত্র হচ্ছে নাক, মুখ, চোখ, সাইনাস, ফুসফুস,ব্রেইন। সংক্রমণে নাক, মুখ কালো হয়ে যাওয়া থেকে ছত্রাকটির সাথে বø্যাক শব্দটির ব্যবহার। বø্যাক ফাঙ্গাস মানুষ থেকে মানুষে বা জীবজন্তুর মাধ্যমে ছড়ায় না। কোভিডাক্রান্ত বিশ্ব বিশেষ করে ভারতের জন্য ছত্রাকের এই চরিত্রটি একটি সুখবর বটে, নতুবা এই কোভিডকালে ভয়ঙ্কর এক অবস্থা তৈরি হতো।
বø্যাক ফাঙ্গাসের স্পোর (সহজ অর্থে বীজ) বাতাসে বা পরিবেশে থাকে ফলে বø্যাক ফাঙ্গাস জন্মাতে পারে এরকম পরিবেশ দুর্বল ইমিউনিটির মানুষজনের জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ। বø্যাক ফাঙ্গাস স্পোরের মাধ্যমে তিনভাবে ছড়ায়, বাতাসে থাকা স্পোর শ্বাসের মাধ্যমে, খাবার বা ওষুধের মাধ্যমে, শরীরে ক্ষত বা ঘা দিয়ে প্রবেশ। কাঁচা গোবর মেখে বসে থাকলে গায়ে শুকিয়ে যাওয়া গোবর থেকে বø্যাক ফাঙ্গাসের স্পোর উড়ে গিয়ে কোভিডে দুর্বল হয়ে যাওয়া কাউকে উপরোক্ত তিনভাবেই সংক্রমিত করতে পারে। পর্যাপ্ত অক্সিজেন, খোলামেলা পরিবেশ, পরিষ্কার পরিচ্ছনতা বø্যাক ফাঙ্গাস প্রতিরোধে মূল অস্ত্র।
হঠাৎ করে এই সংক্রমণের আপাত বিবেচ্য কারণগুলো যেমন কোভিড ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ইনফেকশন, স্টেরয়েডের যথেচ্ছ ব্যবহার, দুর্বল ইমিউনিটি, অক্সিজেনের স্বল্পতা, কাঁচা গোবরের ব্যবহার, রক্তে অধিক চিনি, অধিক আয়রন, অপরিচ্ছন্নতা এরকম নানাবিধ কারণের মধ্যে মূল কারণগুলো সংক্রামক রোগ গবেষকরা নিশ্চিতভাবেই চিহ্নিত করবেন। বাংলাদেশে বø্যাক ফাঙ্গাস পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ অবশ্যই সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে, তবে ভীত হওয়ার কারণ নেই। বরং ভারত থেকে করোনা সংক্রমণ বাংলাদেশে নিয়ে আসা ঠেকানোর জন্যে সীমান্তবর্তী এলাকায় কঠোর ব্যবস্থাপনা অতীব জরুরি। বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি ভারতের মতো বিপর্যয়কর না হলে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা আর আক্রান্ত জনগণের ইমিউনিটি ভারতের মতো ভোগান্তিকর পর্যায়ে না গেলে ভীত হওয়ার কারণ নেই। বø্যাক ফাঙ্গাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে সামাজিক রীতিনীতির পার্থক্যও বাংলাদেশের অনুক‚লে একটি বড় প্রতিরোধক। লেখক : কলামিস্ট এবং অণুজীব বিজ্ঞানী




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]