• প্রচ্ছদ » » তবুও কাজী নজরুল ইসলামÑ‘আজ আমি শতবার ক’রে তব প্রিয় নাম চুমি’


তবুও কাজী নজরুল ইসলামÑ‘আজ আমি শতবার ক’রে তব প্রিয় নাম চুমি’

আমাদের নতুন সময় : 27/05/2021

মারুফ রসূল : চুরুলিয়া থেকে কলকাতা ফেরার পথে একবার এক কাÐ করলেন কাজী নজরুল ইসলাম। বর্ধমানে নেমে সেখানকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে সাব রেজিস্টার পদে চাকরির জন্য একটি দরখাস্ত করে দিয়ে এলেন। ইন্টারভিউ কার্ড এলো কোলকাতায়, মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসের ঠিকানায়। কিন্তু মুজফফর আহমদসহ আরও কিছু বন্ধুর পরামর্শে কাজী নজরুল ইসলাম আর ইন্টারভিউতে উপস্থিত হননি। বন্ধুরা তাঁকে বোঝালেনÑ সাব রেজিস্টারের চাকরি পেলে তাঁকে গ্রামে গ্রামে ঘুরতে হবে এবং এতে সাহিত্যিক প্রতিভার অপমৃত্যু ঘটার সম্ভাবনা আছে। আজকের দিনে এমন বন্ধুদের লোকে ‘অসৎসঙ্গ’ বলে পরিত্যাগ করতেন।
মলাট থেকে মলাটে যিনি বিদ্রোহী, প্রেমিক কিংবা বাঁধনহারা; চাকরির মতো জনপদবধূর হাতছানিতে তিনি সাড়া দিয়েছিলেন কেন? এও এক আলাদারকম দৃষ্টিপাত; সুধীন দত্ত যাকে বলেছিলেনÑ ‘শ্লথনীবি যৌবন তোমার’। চাকরি তো তিনি করেওছিলেনÑ ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনের সৈনিক ১৯১৭ সাল— এও আজ নজরুল-বীক্ষণে নথিভুক্ত। কেননা সৈনিকের হাতে থাকে গোলা-বারুদের পরিচয়পত্র; অথচ কাজী নজরুল ইসলামের হাতে ছিলো ‘দিওয়ান-ই-হাফিজ’। এখন বুঝি, কাজী নজরুল ইসলাম সৈনিকের চাকরি না করলে কোথায় পেতাম হাফিজের রুবাইয়াতের অনুবাদ, কিংবা ‘রিক্তের বেদন’। আরবসাগরের বিজন বেলায় তো অনেকেই বসেন, কজনই বা লিখতে পারেন ‘মেহের-নেগার’ বা ‘সাঁজের তারা’। কে আর এখন লিখবেন ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনি’Ñ বঙ্গবাসীর জীবনে এখন বাউন্ডুলে কোথায়? সবাই এখন কেতাদুরস্ত হিসেবী। পরীক্ষার খাতায় প্রিয় কবি হিসেবে কাজী নজরুল ইসলাম ঠিক আছেন, কিন্তু জীবনে নজরুল। যাপনে, বিশ্বাসে। এ হয় নাকি!
বাঙালি নজরুলকে ধারণ করলে চোগলখুরি করবে কে? ঘটি আর বাঙালের তরকারি চেখে বদনাম করবে কে? লাল পিঁপড়া কালো পিঁপড়ার গল্প ফাঁদবে কে? ‘আমরা’ ‘ওরা’র দল পাকাবে কে? কৈশোরের মননে সা¤প্রদায়িকতার একদলা পিক ফেলে কে এসে শয়তানি বুলি আওড়াবেÑ ‘জানিস! রবীন্দ্রনাথ নজরুলের নোবেলটা মেরে দিয়েছে’।
আজকাল বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল মানে হিন্দু আর মুসলমান। একটু ভদ্রস্থ যারা, মানে ওই উঁচু ক্লাসে পড়েছেন-টড়েছেন কিংবা পড়ান-টড়ান, তাদের কাছে ব্যাপারটা আবাহনী-মোহামেডান বা ইস্ট বেঙ্গল-মোহনবাগানের মতো। মেজাজে একটা শ্রদ্ধা শ্রদ্ধা ভাব রাখেন কিন্তু মননে বিরাট সা¤প্রদায়িকতা। রবীন্দ্র বা নজরুল জয়ন্তীতে তারা প্রবন্ধ লেখেনÑ হিন্দু-মুসলমানের পেটে কী করিয়া মোচড় পড়িয়াছিলো। জায়গা বুঝে বঙ্গবাসী এখন রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের চেয়ার বদল করে। দেশভেদে তাদের একজন মেইনস্ট্রিম তো একজন প্রান্তিকÑ আদতে খÐিত। এই খÐ-বিখÐের দোলাচলেও পঁচিশে বৈশাখ আসে, আসে এগারোই জ্যৈষ্ঠ; পঞ্জিকার নিয়মের বাইশে শ্রাবণ কিংবা বারোই ভাদ্রÑ কে আটকাবে? কিন্তু কোথায় কাজী নজরুল ইসলাম ‘এ-তুমি আজ সে-তুমি তো নহ’। কিংবা আমরা তো খুঁজিইনি তাঁকে, আত্মস্থ করা তো দূরের কথা— ‘নিশীথ-রাতের স্বপন হেন, পেয়েও তারে পাইনে যেন’।
এখন সাজানো তথ্যের তোড়ায় নজরুল সম্পর্কে যে তথ্য পাই, তাতে একপক্ষ ইচ্ছে করেই শ্যামাসঙ্গীতটা বাদ দেয়, অন্যপক্ষ সন্তর্পনে সরে আসে তাঁর গজলের চমক থেকে। অথচ তিনি লিখতে গিয়ে কেমন মিলেমিশে ছিলেন, কেমন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন জগতের কার্নিশখানি। আমরা ছোট হয়ে গেছি, আটকে গেছি গÐির গুন্ডামিতে। নাহলে মহররম তো আসে যায়, কই শুনি না তো— ‘ফিরে এলো আজ সেই মোহররম মাহিনা, ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না!’। শুনবো কী করে! আমরা তো ‘বিরাট মুসলমান’ হয়েছি, তাজিয়া মিছিল ঘিরে পুলিশি বেষ্টনী না থাকলে আমরা ওতে বোমা মারি। নজরুল ইসলাম বুঝতে পেরেছিলেন একদিন মহররম মানে হবে হোসনি দালানের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ‘মোল্লার ইসলাম’ সম্পর্কে তিনি তাই সচেতন করেছিলেন।
তবুও আমরা নজরুলকে পাইÑ হয়তো এর চেয়ে বেশি পেতে হলে ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিতে হয়। সাহিত্য যে চ‚ড়ান্তভাবে রাজনৈতিক তা বাংলাদেশ ও ভারতের লেন্সে নজরুল আর রবীন্দ্রনাথকে দেখলেই বোঝা যায়। কতোগুলো বিশেষণের আড়ালে তাঁদের সত্যরূপটা চাপা দিতে না পারলে রাজনীতির ফায়দা কোথায়? শাদা চোখে দেখতে গেলেই তলব আসে— পাঠ্য বইয়ে আছে তো, পড়ে নাও। ওটা কাঠ না কামঠ তা জানার জন্য কুমিরের লেজ তোলার দরকার কী?
তা হবে! কুমিরের লেজ যদি কেউ তুলতে চান, তবে নিজ দায়িত্বেই তোলা উচিত। এখন ব্যক্তি হিসেবে আমরা কি নজরুলকে খুঁজে বের করার যোগ্যতা রাখি? আমি নিজেকে দিয়ে বুঝি, রাখি না। আজকাল কলম খুঁজতে যে জাতিকে কলম্বাস হতে হয়Ñ নজরুলকে খুঁজতে গেলে তার ঢাকীসহ বিসর্জন হবার সম্ভাবনা প্রকট। তাহলে উপায় কী? এই যে বাইরে অমন ঝড়ো হাওয়া দিচ্ছে, গোটাটাই ছেড়ে দেবো ইউটিউব বা স্পোটিফাইয়ের হাতে! মনের মধ্যে নিজের বলে কিচ্ছু নেই! একবারও আওড়াবো না ‘চিত্তনামা’র চরণÑ‘বাজে আনন্দ-মৃদং-গগনে, তড়িৎ-কুমারী নাচে’। ঝুম বরষায় এই যে ‘ট্যাগোর ফর রেইনি ডে’ লিখে গুগল করি, সে তো নজরুলকে জানি না বলে। রবিঠাকুরকেও জানি না। গীতবিতানের কুড়ি-পঁচিশটা গানে আমাদের আবেগ পেন্ডুলামের মতো দোল খায়। রবীন্দ্র আর নজরুল রচনাবলী কিনতে হয় ফেসবুকে গোটা দশেক ছবি দেওয়ার জন্যÑ ও খুলে পড়ার জিনিস নাকি! বাঙালির অতো সময় কোথায়? অনভ্যাসে চন্দনের ফোঁটাও যে চড়চড় করে। ভাগ্যিস তারা জন্মেছিলেন আবার কালের নিয়মে তাঁদের শারীরিক মৃত্যুও হয়েছিলÑ না হলে উদ্যাপনের জন্য এ দুটো দিনই বা পেতাম কোথায়? আমাদের মনোটোনাস ক্যালেন্ডারে এই তো একটু দৃশ্যের মিছিল, খানিকটা শ্রæতির শ্লোগান। নজরুল লিখেছিলেন নাÑ ‘চির-পরিচিতা তুমি, জন্ম জন্ম ধরে মোর অনাদৃতা সীতা!’। তিনি আসলে নিজের জাতির কণ্ঠে নিজের পরিচয়টি তুলে দিয়ে গেছেন। ভাগের মায়ের কপালে তো গঙ্গা নেইÑ কথাটি বাঙলা মায়ের ক্ষেত্রে একটু অন্যরকম। বঙ্গজননী এককালে এতো বেশি রতœ-প্রসব করেছেন যে, রতœগর্ভার গৌরবে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এখন তিনি মিডিওকার প্রসব করে চলেছেন। ফলে তাঁর রতœ-ভাÐার চেনার লোক আর রইলো না। তবুও এগারোই জ্যৈষ্ঠ, তবুও কাজী নজরুল ইসলামÑ‘আজ আমি শতবার ক’রে তব প্রিয় নাম চুমি’। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]