• প্রচ্ছদ » আমাদের বাংলাদেশ » পৃথিবীতে যদি একটি দেশ এবং একটি রাজধানী হতো, সমস্ত কিছু বিবেচনায় পৃথিবীর সবচেয়ে কাক্সিক্ষত শহর হতো ‘ঢাকা’


পৃথিবীতে যদি একটি দেশ এবং একটি রাজধানী হতো, সমস্ত কিছু বিবেচনায় পৃথিবীর সবচেয়ে কাক্সিক্ষত শহর হতো ‘ঢাকা’

আমাদের নতুন সময় : 17/06/2021

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন : পৃথিবীর বড় বড় শহরগুলোর যেটি যেখানে সেটি সেখানে না হয়ে অন্য কোথাও হলো না কেন? কোন একটি জায়গাকে শহর হিসেবে বেছে নেওয়ার অনেকগুলো কারণের অন্যতম হলো নদী। প্রাচীনকাল থেকে সাধারণত নদীর পাশেই গড়ে উঠে একটি শহর। ইংল্যান্ডের রাজধানী বিখ্যাত লন্ডন শহরে অবস্থিত টেমস নদীর পারে। বর্তমান পৃথিবীর রাজধানীখ্যাত নিউ ইয়র্ক শহর হুডসন নদীর পারে অবস্থিত। রাশিয়ার সবচেয়ে বড় শহর হলো মস্কো এটি গড়ংশাধ জরাবৎ-এর পারে অবস্থিত। রাশিয়ার দ্বিতীয়, ইনফ্যাক্ট সবচেয়ে বিখ্যাত শহর হলো সেইন্ট পিটারসবার্গ। এটি নেভা নদীর পাড়ে অবস্থিত। চীনের বেইজিং শহর ইনডিং নদীর পাড়ে অবস্থিত।
কেন প্রায় ৪০০ বছর আগে মুঘল আমলে ঢাকাকে এই এলাকার রাজধানী হিসেবে বেছে নেয়। বেছে নেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ, ঢাকাই পৃথিবীতে একমাত্র শহর যার চারপাশে অন্তত চার চারটি নদী আছে এবং অসংখ্য খাল ছিলো। এতোগুলো নদী এবং এতো খাল বেষ্টিত পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কোনো শহর নেই।
পৃথিবীতে যদি একটি মাত্র দেশ থাকতো তাহলে সেই দেশের রাজধানী যৌক্তিকভাবে কোথায় হতো? যদি পৃথিবীর সকল মানুষের অবস্থানের গড় নিই, তাহলে সেই অবস্থানটি হয় দক্ষিণ এশিয়ায়। এটাই হতো অপটিমাম অবস্থান যেখানে আমরা সবাই থাকতে চাইতাম। আরও নির্দিষ্ট করে যদি বলতে চাই তাহলে সেই শহরটি কোথায় হতো? সমুদ্র, নদী মিনারেল নেভিগ্যাবল অবস্থান ইত্যাদি সবকিছু বিবেচনায় নিলে ঃযব ংরহমষব নবংঃ ঢ়ষধপব ভড়ৎ ধ পরঃু ড়হ ঊধৎঃয হতো আমাদের বাংলাদেশের রাজধানী ‘ঢাকা’। শুনে আশ্চর্য হলেন? পৃথিবীতে আরেকটি দেশের রাজধানী বা শহরের নাম বলতে পারবেন না যার চারপাশে চার থেকে পাঁচটি বড় নদী আছে? যার ভেতরে শতশত খাল ছিলো? কল্পনা করা যায়? এরকম একটি শহর যদি ইউরোপের কোনো দেশে থাকতো বা আমেরিকার থাকতো কিংবা জাপান বা চীনের থাকতো কী বানাতো তারা!
আর এরকম একটি শহরকে আমরা পৃথিবীর নরক বানিয়েছি। ঢাকা শহর এখন বসবাসের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে অবাসযোগ্য শহর। মানে যেই শহর হওয়া উচিত ছিলো পৃথিবীর সেরা শহর সেই শহর সবচেয়ে অবাসযোগ্য খারাপ শহর। শুধু তাই না। দিন যতো যাচ্ছে উন্নয়নের নামে এটিকে আরও বেশি করে হত্যা করা হচ্ছে। এটি হতে পারতো প্রাকৃতিকভাবেই ভেনিস শহর। আমরা ভেনিসের মতো ওয়াটার বোট দিয়ে শহরের নানান প্রান্তে যেতে পারতাম। শুধু তাই নয়, সারাদেশের সঙ্গে নদী পথে কানেক্টিভিটি তৈরি করতে পারতাম। বাংলাদেশ তো নদীমাতৃক দেশ ছিলো। শত শত নদী মাকড়সার জালের মতো সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিলো। ঢাকার মতো একটি শহর যদি পৃথিবীর সবচেয়ে অবাসযোগ্য হয়, তাহলে এর দায় কার? এর দায় হলো যারা এই দেশকে শাসন করেছে। তারা জানেই না কোন সৌভাগ্যে তারা ঢাকার মতো একটি শহরকে রাজধানী হিসেবে পেয়েছে। ঢাকা হলো বাংলাদেশের একদম সেন্টারে। ঢাকা কারও দয়ায় ঢাকা হয়ে ওঠেনি।
রুয়ান্ডার নাম আমরা কমবেশি সবাই শুনেছি। রুয়ান্ডায় তিনটি গ্রুপ বিদ্যমান ঐঁঃঁ, ঞঁঃংর ধহফ ঞধি! ৯-এর দশকে ঐঁঃঁ এবং ঞঁঃংর এই দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। ফলে ওখানে মবহড়পরফব ঘটে। যেই সময়টায় এসব ঘটছিলো সেসময়টা বাংলাদেশে কেবল স্বৈরাচার সরকারকে হটিয়ে তথাকথিত গণতন্ত্র এসেছিলো। সেখান থেকে আজ রুয়ান্ডা কোথায় আর আমরা কোথায়। সেই উত্তাল সময় পারি দিয়ে রুয়ান্ডার রাজধানী আজ আফ্রিকার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন রাজধানীতে রূপান্তরিত হয়েছে। আর আমাদের দেশ বা আমাদের রাজধানী? দিন যতোই যাচ্ছে ততোই আরো অধঃপতনের দিকে এগোচ্ছি।
আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশটি, যার জনসংখ্যা ঘনত্বের দিক থেকে আমাদের দেশের মতোই তারপরও কীভাবে তারা এই অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করলো? এসবের কৃতিত্ব সেখানকার সরকারের। আমাদের সরকারও যদি চায় অতি অল্প সময়ে বদলে দিতে পারে এই দেশকে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সরকার যদি তার দলের সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে একটি সুদূরপ্রসারী চিন্তা নিয়ে এগোয় পরিবর্তন কোন ব্যাপারই না। রুয়ান্ডায় পলিথিন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ভোর পাঁচটার মধ্যে শহরকে একবার পরিষ্কার করা হয় আবার সারাদিন ধরে এই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নের কাজটি বজায় রাখা হয়। আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশটি যদি পারে, আমরা কেন পারবো না?
রুয়ান্ডা মনে করে, শিক্ষাই উন্নতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সেই জন্য তারা ২০১২ থেকে ক্রমাগতভাবে শিক্ষায় বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়েই যাচ্ছে। ২০১২ সালে মোট বাজেটের ১৭ শতাংশ ছিলো শিক্ষায় ২০১৮ সালে সেটা হয় ২২ শতাংশ! আর আমরা শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ কেবল কমাচ্ছি! শিক্ষা খাতে রুয়ান্ডা তাদের জিডিপির ৩.৫ থেকে ৫.৫ শতাংশ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। আর আমরা ২ শতাংশের আশেপাশে। এই দুঃখ কোথায় রাখি! বলদামি আর কারে কয়? অথচ আমাদের জনসংখ্যা, তাদের মান ইত্যাদি বিবেচনায় নিলে তাদেরকে উন্নত মানসিকতার তৈরি করতে হলে পথ একটাই। সেটি হলো মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত করা।
ঢাকা শহরের আজকের এই অবস্থাই প্রমাণ করে আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের যথাযোগ্য রোল প্লে করতে পারছে না। আমাদের সরকার যেখানে তার খোদ রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম না সেখানে বাকি আরো বড় বড় সমস্যা কীভাবে সমাধান করবে? এসবই জাস্টিফাই করে কেন শিক্ষাখাতে আমাদের আরও অনেক বিনিয়োগ করে সেই বিনিয়োগকে যথাযোগ্যভাবে কাজে লাগানো যায়। পৃথিবী দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষের কায়িক পরিশ্রম করে উপার্জনের দিন শেষ হতে যাচ্ছে। এক সময় রোবটই সকল কাজ করবে। মানুষ কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক কাজই করবে। সেই সময়ের জন্য কী আমরা তৈরি হচ্ছি, প্রশ্ন রেখে গেলাম। আগামী প্রজন্মের জন্য এখনি যদি কিছু না করি তারা আমাদের ক্ষমা করবে না।
লেখক : শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]