প্রকাশিত: Thu, Nov 9, 2023 11:02 PM
আপডেট: Thu, Jul 25, 2024 7:14 AM

[১]আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসএম.এ. লতিফ,

আদালত প্রতিবেদক: [২] শ্রম আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ও নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন ‘শ্রম আইন লঙ্ঘন করেই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে মামলা করা হয়েছে যা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ তাই অভিযোগ অস্বীকার করে বাদীর দায়ের করা মামলা ক্ষতিপূরণসহ খারিজ করার জন্য বিজ্ঞ আদালতে প্রার্থনা করেন। এসময় মামলা খারিজ করে আসামিদের অব্যাহতি দেয়ার আবেদন করেন তিনি।

[৩] বৃহস্পতিবার (৯ নভেম্বর) দুপুর ১২টার পর শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে করা মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আদালতে যান তিনি। তৃতীয় শ্রম আদালতের জেলা ও দায়রা জজ শেখ মেরিনা সুলতানার এজলাস কক্ষে দুপুর ১টা ১০ মিনিটে শুনানি শুরু হয়। এরপর আদালতের এজলাস কক্ষে ড. মুহাম্মদ ইউনুসসহ গ্রামীণ টেলিকমের এমডি মো. আশরাফুল হাসান, পরিচালক নুরজাহান বেগম এবং মো. শাহজাহানও কাঠগড়ায় দাঁড়ান।

[৪] পরে শারীরিক অসুস্থতা ও বয়স বিবেচনায় আইনজীবীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারক ৪ বিবাদীকেই কক্ষের ভেতরে বেঞ্চে বসে শুনানি কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেন। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্য আসামীদের আত্মপক্ষ সমর্থন করে লিখিত বক্তব্য পড়েন তাদের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন।

[৫] পরে গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ তিনজনের বিরুদ্ধে করা শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আগামী ১৬ নভেম্বর নির্ধারণ করেছেন ঢাকার ৩য় শ্রম আদালতের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ শেখ মেরিনা সুলতানা ।

 [৬] মামলাটিতে এরই মধ্যে চারজনের সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর মামলার বাদী এবং প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে গত ৬ নভেম্বর চতুর্থ সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হয়েছে বলে জানান ড. ইউনূসের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

[৭] কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শক আরিফুজ্জামান ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে বাদী হয়ে ড. ইউনূসসহ চারজনের বিরুদ্ধে শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে নির্দিষ্ট লভ্যাংশ জমা না দেয়া, শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী না করা, গণছুটি নগদায়ন না করায় শ্রম আইনের ৪-এর ৭, ৮, ১১৭ ও ২৩৪ ধারায় এ মামলা করেন। অপর আসামিরা হলেন- গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশরাফুল হাসান এবং দুই পরিচালক নুরজাহান বেগম ও মো. শাহজাহান।

[৮] এ মামলায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী সৈয়দ হায়দার আলী ও মো. খুরশীদ আলম খান। ড. ইউনূসসহ চারজনের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন ও ব্যারিস্টার খাজা তানভীর আহমেদ।

[৯] নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ড. ইউনূসের আইনজীবী ব্যরিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন বিচারকের সামনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। বক্তব্যে অভিযোগের বিষয়ে বলা হয়, প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ও অন্য ৩ জন বিবাদী পরিচালনা বোর্ড এর সদস্য হিসেবে নিয়েজিত রয়েছেন। গ্রামীণ টেলিকম কোম্পানী আইনে রেজিস্ট্রিকৃত ২৮ ধারায় সৃষ্ট একটি ‘নট ফর প্রফিট’ কোম্পানি, যার লভ্যাংশ বিতরণযোগ্য নয়। এ লভ্যাংশের অর্থ সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। সে কারণে এই কোম্পানিতে প্রতিষ্ঠানের কোনো মালিকানা বা শেয়ারহোল্ডার নেই। এমনকি বিবাদীদের কেউই শেয়ার হোল্ডার নন।

[১০] তাছাড়া বিবাদীরা শুধুমাত্র সম্মানজনক পদে থেকে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সহায়তা করছেন। তাছাড়া কোম্পানি আইনের ২৮ ধারায় গ্রামীণ টেলিকম প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের মুনাফা প্রদান নিষিদ্ধ করা আছে।

[১১] যেহেতু গ্রামীণ টেলিকমের কোনো স্থায়ী কার্যক্রম নেই সেহেতু এর মূল কাজ হচ্ছে চুক্তির মাধ্যমে পল্লী ফোন কার্যক্রম এবং নকিয়া মোবাইল হ্যান্ডসেটের বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান। পল্লীফোন কার্যক্রম গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং প্রতি ৩ (তিন) বছর পর পর তা নবায়ন করা হয়। পল্লীফোন গ্রামীণ টেলিকমের একটি প্রকল্প যা গ্রামীণফোনের নির্দেশে চুক্তির ভিত্তিতে গ্রামীণ টেলিকমের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করে। যার বিনিময়ে গ্রামীণ টেলিকম গ্রামীণফোন হতে ১০ শতাংশ রেভিনিউ শেয়ার পায়।

[১২] অনুরূপভাবে ফিনল্যান্ডের নকিয়া মোবাইল কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে গ্রামীণ টেলিকম বাংলাদেশের সকল ক্রেতাদেরকে নকিয়া হ্যান্ডসেটের বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান করে থাকে। যার বিনিময়ে বৈদেশিক মুদ্রায় ৫ শতাংশ (ডলার) গ্রামীণ টেলিকম আয় করে থাকে। এই চুক্তির মেয়াদও ৩ বছর। চুক্তিটি প্রতি ৩ বছর পর পর নবায়ন করা হয়।

[১৩] উভয় চুক্তির আওতায় গ্রামীণ টেলিকম আইন অনুযায়ী এর নিয়োগ পাওয়া কর্মচারী ও কর্মকর্তাদেরকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে থাকে। ফলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত সকল শ্রমিক কর্মচারী-কর্মকর্তা স্থায়ী শ্রমিকের ন্যায় সকল সুযোগ-সুবিধা যেমন-পদোন্নতি, নিয়মিত হওয়া, পে-স্কেল, গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, অর্জিত ছুটি, মেডিকেল ভাতা পেয়ে থাকেন।

[১৪] তবে গ্রামীণ টেলিকম কোম্পানি আইনের ২৮ ধারায় সৃষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান (নট ফর প্রফিট কোম্পানি) হওয়ায় কোম্পানি আইন অনুযায়ী লভ্যাংশ বিতরণযোগ্য নয়। সেজন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও নীট মুনাফার ৫ শতাংশ প্রদান করার কোনো সুযোগ নেই।

[১৫] উল্লেখ্য, বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত থেকে ২০ বছর ধরে গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীরা চাকরিতে থাকাবস্থায় এবং রিটায়ারমেন্টে (অবসরে) যাওয়ার পরও তারা কখনো মুনাফা দাবি করেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যারা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার সামাজিক ব্যবসার অগ্রগতি পছন্দ করে না এমন বিশেষ মহলের প্ররোচণায় বিভ্রান্ত হয়ে মুনাফা এর সুবিধা আদায়ের জন্য গ্রামীণ টেলিকমের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী ২০১৭ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ সিভিল বিধানের অধীন ২১১ ধারায় ৩য় শ্রম আদালতে অনেকগুলো সিভিল বি.এল.এ (আই,আর) মামলা এবং সিবিএ কর্তৃক শিল্প বিরোধ মোকদ্দমা দায়ের করে।

[১৬] কিন্তু সরকারের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর গ্রামীণ টেলিকমের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অযৌক্তিক ও আইন বহির্ভূত দাবি দাওয়া থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরত রাখার পরিবর্তে ইচ্ছাকৃত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে গ্রামীণ টেলিকম সম্পর্কে ভুল ও মিথ্যা তথ্যের রসায়নে গ্রামীন টেলিকমের অবৈতনিক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসহ চার জন পরিচালক বিবাদীর বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা করেন। সম্পাদনা: ইকবাল খান