প্রকাশিত: Wed, Feb 7, 2024 1:26 AM
আপডেট: Thu, Feb 22, 2024 4:13 PM

মিয়ানমারের ঘটনা সম্পর্কে আমাদের গণমাধ্যম খুব একটা তথ্য সংগ্রহ করছে না

ইমতিয়াজ মাহমুদ:  [১] আমাদের পাশের দেশ মায়ানমার-এর আগের নাম ছিল বার্মা। সেখানে এখন একটা কঠিন অবস্থা চলছে, যুদ্ধ করছে মায়ানমারের নানা জাতির বিদ্রোহী বাহিনীগুলি আর ওদের সরকারী বাহিনী। মায়ানমারের মোট জনসংখ্যার মধ্যে নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছে। ওদের সংখ্যাগুরু হচ্ছে বামার জনগোষ্ঠী- শতকরা ষাট বা পঁয়ষট্টি ভাগের মতো হচ্ছে এরা। এর পরের দুইটা বড় জনগোষ্ঠী হচ্ছে শান আর কারেন জনগোষ্ঠী। এরা দুই গ্রুপ মিলে শতকরা বিশ ভাগের চেয়ে একটু কম। বার্মার পরিসংখ্যান ইত্যাদি খুব বেশী পাওয়া যায় না, যাও পাওয়া যায় সেগুলিও পুরনো বা অনির্ভরযোগ্য। 

যে তিনটা জনগোষ্ঠীর কথা বললাম, ওরা ছাড়াও ছোট বড় অসংখ্য জাতি গোষ্ঠী আছে। চীনা বংশোদ্ভূতরা আছে, চিন জনগোষ্ঠী আছে (ওরা অনেকটা আমাদের বম আর ভারতের মিজোদের মতো), ইন্ডিয়ান তামিলরা আছে, রাখাইনরা আর কাচিনরাও আছে। ওদের মধ্যে তামিল, রাখাইন কাচিন এরা একেকটা জনগোষ্ঠী হয়তো এক দেড় বা দুই শতাংশ করে হবে। শতকরা হিসাবে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্র অংশ- এক পারসেন্টও হবে না। এই যে হিসাবটা বললাম, এটা খুব সঠিক বা নির্ভরযোগ্য নয় বটে, তবে মোটামুটি চিত্রটা এরকমই। ধর্মীয় হিসাবে বৌদ্ধরা বেশী, খৃস্টান ও হিন্দুও আছে। 

মায়ানমারে মুসলিমরাও কম না। রোহিঙ্গারা যে মুসলিম সেকথা তো আমরা জানি। ভারতীয় বার্মিজ যারা ওরা মূলত তামিল, তামিলদের মধ্যে অনেক মুসলমান আছে। আমার মনে আছে আমি যেবার মায়ানমারে বেড়াতে যাই, সেবার আমার জন্যে মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ ট্রাভেল এরেঞ্জমেন্ট করেছিল যে ট্রাভেল এজেন্ট সে ছিল এইরকম একজন তামিল মুসলিম। সময়টা ছিল রোজার মাস, ইফতারের পর পর আমার হোটেল রুমে এসে যখন দেখে যে আমি এমন একটা পানীয় নিয়ে বসেছি যেটা ঠিক ইফতারের সাথে যায়না, বেচারার তো ভীমটি খাওয়ার মতো অবস্থা। 

[২] রেঙ্গুনে বাঙালি হিন্দু কমিউনিটিও বেশ প্রাণবন্ত। রেঙ্গুনে স্কট মার্কেটের কাছাকাছি বেশ জমজমাট একটা কালীবাড়ি দেখেছি। সেখান থেকে একটু দূরে পাশাপাশি দুইটা বিশাল মসজিদ- একটা বাঙালি সুন্নি মসজিদ আরেকটা বাঙালি শিয়া মসজিদ। বাঙালি সুন্নি মসজিদের অভ্যন্তরে গিয়েছি। ওরা বাঙালি বটে, কিন্তু দৈনন্দিন কথাবার্তায় বাংলা ব্যবহার করে না। স্থানীয় ভাষার বাইরে উর্দু বলে, আমি যখন কয়েকজনে জিজ্ঞাসা করলাম বাংলা বুঝে কিনা, বলল বটে যে বাংলা বুঝে কিন্তু কথাবার্তা বলতে গিয়ে বলতেও পারে না, বুঝেও না। বাহাদুর শাহের মাজারের খাদেম তিনিও বাঙালি, তিনিও বাংলা বলেন না। 

আলাপটা ভিন্ন দিকে চলে যাচ্ছে। বলছিলাম বহু জাতিসত্ত্বার কথা। এই বিদ্রোহী গ্রুপগুলি, ওদের বেশিরভাগই এইরকম একেকটা জাতিসত্ত্বার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মিলিটারি গ্রুপ। বড় বড় কয়েকটা গ্রুপের নাম আমরা জানি, কিন্তু এই বড় গ্রুপগুলি ছাড়াও অনেক ছোট ছোট সামরিক গ্রুপ আছে যাদের নামও আমরা জানি না। এইসব গ্রুপ সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে যেমন লড়ছিল, আবার নিজেদের মধ্যেও মাঝে মাঝেই যুদ্ধে লেগে যেতো। সম্প্রতি ওদের এইসব আঞ্চলিক বিদ্রোহী সামরিক গ্রুপগুলি মিলে একটা জোট করেছে, থ্রি ব্রাদারহুড এলায়েন্স নাম দিয়ে। সব বিদ্রোহী গ্রুপ এই জোটে আসেনি, তবে বড় বড় গ্রুপগুলি সবাই আছে। 

এই জোটটা করার পর মায়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহীরা বেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেছে। থাইল্যান্ড, চীন, ভারত ও বাংলাদেশের সাথে মায়ানমারের যে সীমানা, সেই সীমানাগুলি বরাবর অনেকখানি ভূখণ্ড এখন বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। ঠিক কতখানি এখন বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে সেটা স্পষ্ট জানা যাচ্ছে না। একটি সূত্র থেকে বলা হয়েছে যে ৭০% এর মতো এলাকা বিদ্রোহীদের দখলে- তবে এই দাবীটি যারা করেছেন ওরা মায়ানমারে থাকে না, পশ্চিমে প্রবাসী। তবে ৭০% না হলেও একটা বড় এলাকা বিদ্রোহীরা দখলে নিয়েছে। 

[৩] এখন যে আমরা যুদ্ধটা দেখছি আমাদের সীমান্ত ঘেঁষে, সেটা হচ্ছে ঐ বিদ্রোহী জোটের সমন্বিত আক্রমণেরই অংশ। এই অংশে যুদ্ধটা চালাচ্ছে মূলত আরাকান আর্মি। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে এইখানেও মায়ানমারের সরকারী বাহিনী দৃশ্যত মার খাচ্ছে। ওদের সীমান্তরক্ষীরা বর্ডার পোস্ট ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। থাইল্যান্ডভিত্তিক কিছু সংবাদসূত্র আছে, ওদের অনুমান হচ্ছে যে এই যাত্রায় আরাকান আর্মি একদম আকিয়াব বন্দর পর্যন্ত দখল করে ফেলবে। এইরকম অনুমান কতোটা বস্তুনিষ্ঠ সেটা নিশ্চিত করে জানার কোন উপায় নাই। 

আমাদের হয়েছে মুশকিল। আমরা স্পষ্ট করে সব তথ্যও জানি না। আমাদের খবরের কাগজ আর টেলিভিশন চ্যানেলগুলি নিজেদের উদ্যোগে মায়ানমার থেকে খুব বেশী যে কোন তথ্য সংগ্রহ করছে সেরকম কোন নমুনা দেখি না। পাশের দেশে চলছে এতবড় ঘটনা, প্রতিদিন প্রতিবেলা তথ্য সংগ্রহ করা কি আমাদের জন্যে খুব কঠিন কিছু? না, যুদ্ধ যেখানে চলছে সেখানে কাউকে যেতে বলছি না। কিন্তু মায়ানমারের রাজধানীতে বা গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলিতে তো যেতে পারে ওরা। তাছাড়া তথ্য দিতে পারে এরকম স্থানীয় লোকজনের সাথে সংযোগ স্থাপন করা তো কোন কঠিন কাজ নয়। আমরা কোন খবরই জানি না।

চীন তো মনে হয় সামরিক শাসক আর বিদ্রোহী দুই পক্ষের সাথেই যোগাযোগ রাখে। পশ্চিমারা বিদ্রোহীদের পক্ষে- মায়ানমারের একটা প্রবাসী সরকার আছে ইউরোপে, ওরা সেই সরকারটিকে সমর্থন করে। ভারত ঘাপটি মেরে আছে। আমাদের মুশকিল হয়েছে যে আমাদের ঘরে আশ্রিত আছে এগারো লক্ষ রোহিঙ্গা, অথচ এই চলমান সংঘাতের প্রশ্নে আমাদের দৃশ্যমান কোন নীতি নাই, কৌশল নাই। না, আমারা কোন যুদ্ধে জড়াতে চাই না। যুদ্ধ কোন সমাধান নয়, যুদ্ধ কখনো কাম্য নয়। কিন্তু এই পরিস্থিতির তো একটা মিলিটারি দিক আছে- সেটা তো আমরা উপেক্ষাও করতে পারি না। 

[৪] এ এক দিকভ্রান্ত অবস্থা। নাগরিক হিসাবে অসহায় বোধ করি। ফেসবুক